আমি বললুম, দেশের অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু তাই বলে যদি আমাকে উৎসাহ দিতে এসে থাকো, তবে সুবিধে হবে না বলে দিচ্ছি। আমার পকেটে ঠিক তিনটে নয়া পয়সা আছে। চাও তো তা থেকে একটা তোমায় দিতে পারি।
বল্টুদা নাকটাক কুঁচকে মুখটাকে মোগলাই পরোটার মত করে বললে, থাক থাক, তোকে আর দয়া করতে হবে না। তুই যে এক নম্বরের ট্যাঁক-খালি জমিদার সে কি আর আমি জানিনে? চল–আমাদের অভিলাষকে একটু উৎসাহ দিয়ে আসি।
অভিলাষের নাম শুনে আমার কান খাড়া হয়ে উঠল।
-কোন্ অভিলাষ? ওই যে সিনেমার সামনে নতুন রেস্তোরাঁ খুলেছে?
বল্টুদা বললে, আবার কে? উৎসাহ দিতে হলে ভালো-ভালো লোককেই দেওয়া উচিত আজেবাজে লোককে দেওয়া আমি পছন্দ করি না। নে–উঠে পড়
তক্ষুনি উঠে পড়লুম।
কী রকম উৎসাহ দেবে বল্টুদা?
–চল না, দেখতেই পাবি।
পরমানন্দে উঠে পড়লুম। আমার আর ভাবনা কী। পকেটে তো মোট তিনটে নয়া পয়সা। তা ছাড়া, বল্টুদার মনে যখন একবার উৎসাহ দেবার তেজ এসে গেছে তখন আর ওকে ঠেকাবে কে।
ডি-লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস– বলতে বলতে বলুদার পেছু নিলুম।
.
অভিলাষ আমাদের পাড়ার ছেলে। ওর বাবার মস্ত বড় পটোলের ব্যবসা। তাই অভিলাষকে বেশি লেখাপড়া না শিখিয়ে পটলের ব্যবসায় লাগিয়ে দিয়েছিলেন। দুবছর ধরে অভিলাষ এমন ব্যবসা করলে যে পটোলের দোকান পটল তোলে আর কি! তখন ওর বাবা রেগেমেগে ওকে কষে দুটো থাপ্পড় দিলেন। অভিলাষ তাই শেষ পর্যন্ত ওই রেস্তোরাঁ খুলেছে আর মনের দুঃখে পটোল ভাজা পর্যন্ত খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।
আমরা যখন গেলুম, তখন ওর দোকানে বিশেষ লোকজন নেই। একজন ঝাঁটাগুঁফো ভদ্রলোক তারিয়ে-তারিয়ে ডিমের পোচ খাচ্ছেন আর এক বুড়ো নাকের ডগায় খবরের কাগজটা ধরে বসে আছেন।
আমাদের দেখেই অভিলাষের হাসি কান ছাপিয়ে, নাকের ডগা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
-এই যে এসো বল্টুদা-আয় প্যালা বল্টুদা
আর আমি ততক্ষণে দুটো চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়েছি। বল্টুদা বললে, আরে আসব বই কি! তুই বললে আসব, না বললে আসব, তাড়িয়ে দিলেও ফিরে আসব।
শুনে অভিলাষ হেঁ হেঁ করল।–আরে তাড়াব কেন? তোমরা হলে খদ্দের–দোকানের লক্ষ্মী। কী খাবে বলল এখন।
বল্টুদা বললে, কী খাব না, তাই বল। তোকে উৎসাহ দেবার জন্যেই তো প্যালাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলুম। তোর কেক খাব, বিস্কুট খাব, টোস্ট খাব, ওমলেট খাব, চপ, কাটলেট, মাংস–ও, সেগুলো বুঝি এ-বেলা হয় না? আচ্ছা বেশ, চপ কাটলেটগুলো সন্ধেবেলায় এসেই খাওয়া যাবে তা হলে। এখন চা খাব, কফি খাব
আমি বললুম, যদি আরও বেশি উৎসাহ পেতে চাস, তা হলে তোর কাপ-ডিশ চামচে-কাঁটাগুলোও খেতে পারি।
অভিলাষ দারুণ খুশি হতে যাচ্ছিল, কিন্তু এবারে যেন একটু নার্ভাস হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বললে, নানা, কাপ-ডিশগুলো বরং
–তুই আপত্তি করছিস?–বল্টুদা বললে, আচ্ছা, ওগুলো তবে থাক। আর যদ্দুর মনে হচ্ছে কাপ-ডিশ খেতে খুব ভালো লাগবে না, কাঁটা-চামচ খাওয়াও বেশ শক্ত হবে। তবে প্যালার যদি খুবই ইচ্ছে হয়ে থাকে, একটা ভাঙা পেয়ালা বরং ওকে দেব–সে বসে চিবোক। আর আমার জন্যে দুখানা প্লাম কেক, চারটে টোস্ট, দুটো ডবল ডিমের ওমলেট–
আমি ভীষণ প্রতিবাদ করে বললুম, না, আমি কক্ষনো ভাঙা কাপ খাব না। আমিও কেক, টোস্ট, ওমলেট এইসবই খেতে চাই।
অভিলাষ বললে, হ্যাঁ-হাঁ, তুইও খাবি। একটু বোস–আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
প্রায় নাচতে নাচতে চলে গেল অভিলাষ। বোধ হয় ভাবছিল সকালে কার মুখ দেখেই উঠেছে আজকে। কমসে কম তিন টাকা করে ছটাকার খদ্দের। কিন্তু আমি যদি বল্টুদাকে চিনে থাকি তা হলে
এদিক বুড়ো ভদ্দরলোক উঠে যেতেই ছোঁ মেরে খবরের কাগজটা তুলে এনেছে বল্টুদা। একমনে খেলার খবর পড়ছে।
বললুম, বল্টুদা—
উঁ!
পকেটে টাকা ফাঁকা আছে তো? না তোমার পাল্লায় পড়ে ঠ্যাঙানি খাব শেষ পর্যন্ত?
বল্টুদার নাকের ডগায় একটা মাছি অনেকক্ষণ ধরে পজিশন নেবার চেষ্টা করছিল। খবরের কাগজের ঘা খেয়ে সেটা পালালে। বল্টুটুদা আমার কথা শুনে উঁচুদরের একটা হাসি হাসল বাংলায় যাকে বলে হাই ক্লাস।
-কে ঠ্যাঙাবে? অভিলাষ? না ও তেমন ছেলে নয়।
-তাই নাকি?–আমার খটকা তবুও যেতে চায় না। জিজ্ঞেস করলুম, কী করে জানলে?
–ও যখন পটোলের দোকানে বসত জানিস তো? সেই যখন দোকানের পটল তোলার জো হয়েছিল। সেই সময় একদিন ও একা দোকানে বসে রয়েছে, দুজন লোক এসে হাজির। একজন বললে, খোকন, আমায় পটলডাঙার টেনিদার বাড়িটা চিনিয়ে দিতে পারো? ও বললে, ওই তো বাটার দোকানের পাশ দিয়ে চলে যান। শুনে লোকটা বললে, আমি কলকাতায় নতুন এসেছি ভাই পথ-ঘাট কিছু চিনিনে। একটু আসবে সঙ্গে?
অভিলাষ বললে, আমি যে দোকানে একা আছি? লোকটা বললে, তাতে কী–আমার সঙ্গের বন্ধুটি তোমার দোকান পাহারা দেবে। শুনে অভিলাষ তো তাকে এগিয়ে দিতে গেল।
পটলডাঙার গলিতে ঢুকেই লোকটা একদম ভ্যানিশ। ও মশাই, কোথায় গেলেন বলে অভিলাষ একঘণ্টা ধরে চেঁচিয়ে মিথ্যে গোরু-খোঁজা করে ফিরে, ফিসে এসে দেখে, লোকটার সঙ্গীও নেই। আর নেই–
বললুম, কী নেই?
বল্টুদা বললে, এক ঝুড়ি পটোল। ভীষণ মন-খারাপ করে হিসেবের খাতায় লিখে রাখলে : সাত সের তেরো ছটাক পটোল বাকিতে লইয়া গেল। তাহার নাম-ঠিকানা কিছুই অবগত হইতে পারিলাম না। আর সেই হিসেব দেখে ওর বাবা
