নতুন জীবনবোধ, নতুন শপথ।
পায়ের তলায় মাটি কাঁপছে, মাথার ওপরে কাঁপছে আকাশ। আকাশে বাতাসে ঝড় ভূমিকম্পের সংকেত, বজ্র-বিদ্যুতের আগ্নেয় সূচনা। অসম্ভব, এ সহ্য করা যায় না। বিকেলের ছায়া নিবিড় হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে, অন্ধকার আসছে। আর সেই অন্ধকারের জন্যে প্রতীক্ষা করে আছে লোকনাথ সাহা, ফজল আলি, বৃন্দাবন পাল আর নুর মামুদ।
রঘুরামের হাতের তাক কখনো ভুল হয় না।
বিকেল কেটে গেল, সন্ধ্যা নামল। দিঘির পাড়ে এখনও মিটিং চলছে। মশালের আলো জ্বলছে। রহমান, কান্তলাল, যদু প্রামাণিক, মইনুদ্দিন বলে যাচ্ছে একের-পর-একজন। একই কথা, পুরোনো কথা—জান দেব, ধান দেব না।
কিন্তু কোথায় রঘুরাম? রঘুনাথের মতোই অব্যর্থসন্ধানী রঘুরাম। তার হাতের তাক কখনো ব্যর্থ হবে না। বাঁশের ঝাড়ের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে মাত্র একটা গুলি ছুড়বে সে—বুকে হাত চেপে পড়ে যাবে রহমান। একটি ঘায়েই বিষদাঁত উপড়ে যাবে কালকেউটের। কিন্তু সে কখন? কোন শুভলগ্নে?
লোকনাথ সাহা, ফজল আলি, বৃন্দাবন পাল আর নুর মামুদ অধৈর্য হয়ে উঠছে। আর কত দেরি করবে রঘুরাম? সময় চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে অতি মূল্যবান অতি দুর্লভ সুযোগ। সভা ভেঙে গেলেই রহমানকে আর সহজে পাওয়া যাবে না। কোথা থেকে কোথায় যে ঘুরে বেড়ায় লোকটা তার কোনো ঠিকঠিকানাই নেই। আজ হয়তো এখানেই আছে, দেখতে দেখতে কাল সকালে একেবারে হাওয়া হয়ে যাবে, চলে যাবে দূরে—অন্যান্য গ্রামে গিয়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে চেষ্টা করবে। লোকটা এ গাঁয়েরও নয়, কোথা থেকে যে শনির মতো আমদানি হয়েছে ভগবানই জানেন। চাল নেই, চুলো নেই, গাঁয়ে গাঁয়ে চাষা প্রজা খ্যাপানো ছাড়া আর কোনো কাজই নেই তার।
কিন্তু এত দেরি করছে কেন রঘুরাম, কেন এমনভাবে নষ্ট করে দিচ্ছে এই দুর্মূল্য মহার্ঘ সময়? একটা বন্দুকের শব্দ শোনা দরকার, শোনা দরকার সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে এই আন্দোলনটার মৃত্যুযন্ত্রণার মতো একটা ভয়াবহ আর্তনাদ। একটা অস্বস্তিকর অধৈর্য পাথরের মতো গুরুভার হয়ে চেপে বসছে লোকনাথ সাহা, নুর মামুদ, ফজল আলি আর বৃন্দাবন পালের বুকের ওপর। মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে, ইচ্ছে করছে নিজেদের হাতগুলো কামড়ে রক্তাক্ত করে দিতে। কেন দেরি করছে? কেন এমন অশুভভাবে বিলম্ব করছে রঘুরাম?
অবশেষে পরমাশ্চর্য যা, তাই ঘটল। মিটিং শেষ হয়ে গেল নিরাপদে, একান্ত নির্বিবাদে। কালকেউটের বিষদাঁত ভাঙল না, বরং আরও বেশি বিষ সঞ্চয় করে নিলে সে। আরও বেশি করে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠল আকাশে বাতাসে ঝড়-বৃষ্টি-ভূমিকম্পের সংকেতময়তা।
কী হল রঘুরামের?
ছুটতে ছুটতে এল ফজল আলি, নুর মামুদ, বৃন্দাবন পাল।
কী হল রঘুরামের?
তাই তো, ব্যাটা করল কী শেষপর্যন্ত?
সভয়ে লোকনাথ বললে, কাল সন্ধে বেলায় ব্যাটা আমার বন্দুকটা নিয়ে গেল।
অ্যাঁ! তিন জনেই চমকে উঠল।
ফজল আলি বললে, সে কী! তোমার বন্দুক নিয়েছে? আমার কাছ থেকেও তো বন্দুক চেয়ে নিয়ে গেল, বললে তোমার বন্দুকটা নাকি খারাপ হয়ে গেছে তাই…
নুর মামুদ আর বৃন্দাবন পাল আর্তনাদ করে উঠল, কী সর্বনাশ! ওই একই কথা বলে ব্যাটা তো আমাদেরও বন্দুক চেয়ে নিয়ে এসেছে।
ঘরের ভেতরে যেন বাজ পড়ল। কারও মুখ দিয়ে আর একটাও কথা ফুটছে না। একটা নয়, দুটো নয়, চার-চারটে বন্দুক সংগ্রহ করেছে রঘুরাম। কিন্তু কেন? একটা এক গুলির শিকারের জন্যে সে চারটে বন্দুক নিয়ে কী করবে?
হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে শেষপর্যন্ত রঘুরামকে পাওয়া গেল চাঁড়াল পাড়াতে। গাঁজা আর তাড়ির নেশায় তার তখন তুরীয় অবস্থা। একদল চাঁড়াল মেয়ে-পুরুষের একটা উন্মত্ত অশোভন বৈঠকে বসে সে প্রাণখুলে অশ্লীল গান ধরেছে।
ফজল আলি চিৎকার করে উঠল, এই হারামির বাচ্ছা, আমাদের বন্দুক কই?
নেশারক্ত চোখ দুটো মেলে তাকাল রঘুরাম। তারপর এলোমেলো বিশৃঙ্খল দাঁতগুলো বার করে পরম কৌতুকে হো-হো করে হাসতে শুরু করে দিলে।
হাসছিস যে শালা? বন্দুক কোথায়?
একমুহূর্তের জন্যে হাসি বন্ধ করে রঘুরাম বললে, রহমানকে দিয়েছি।
রহমানকে!!!
আকাশ বিদীর্ণ করে বাজ পড়ল না আকাশটাই যেন ধসে পড়ল মাটিতে। একমুহূর্তে থ্যাঁতলা হয়ে, চ্যাপটা হয়ে, গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে গেল লোকনাথ সাহা, ফজল আলি, বৃন্দাবন পাল, আর নুর মামুদ।
রহমানকে!!!
তা ছাড়া আবার কী? এবার রঘুরাম আর হাসল না। পাকা ব্যবসায়ীর মতো গম্ভীর বুদ্ধিমানের গলায় জবাব দিলে, ওরা বেশি ধান পেলে আমার তাড়িও বেশি বিক্রি হবে, এটা কেন বুঝতে পারছ না?
বল্টুদার উৎসাহলাভ
আমি বরাবর দেখেছি, আমাদের বল্টুদার যখন তেজ এসে যায়, তখন তাকে ঠেকানো ভারি মুস্কিল।
রবিবার সকালে দিব্যি চাটুজ্যেদের রকে বসে আছি আর একটা কাকের পালক কুড়িয়ে নিয়ে আরামে কান চুলকোচ্ছি, হঠাৎ কোত্থেকে বল্টুদা এসে হাজির। বললে, চল প্যালা–একটু বেরনো যাক।
–কোথায় যেতে হবে?
-মানে, বন্ধুবান্ধবদের একটু উৎসাহ দেওয়া দরকার। দেখছিস নে, সব কেমন মিইয়ে যাচ্ছে?
শুনে কানের ভেতর আচমকা একটা পালকের খোঁচা লেগে গেল।
–সে আবার কী? কাকে তুমি উৎসাহ দেবে?
–যাকে পাই। বুঝলি, চারদিকে সবাই যেন কী রকম দমে যাচ্ছে। এই তো সেদিন তোর বন্ধু হাবুল সেনকে বললুম, চল হাবলা, একটা অ্যাডভেঞ্চারের ফিলিম হচ্ছে-দুজনে মিলে দেখে আসি। তোর পকেটে যদি পাঁচ সিকে পয়সা থাকে, তা হলেই হয়ে যাবে এখন। বললে বিশ্বেস করবি না প্যালা, হাবুল একেবারে খ্যাঁক করে উঠল। আমার নাকের সামনে হাত নেড়ে বললে, থাউক, অত আহ্লাদ করতে হইব না। যাইতে হইলে একাই যামু-তোমারে নিমু ক্যান? শুনলি একবার কথাটা? দেশের এ কী অবস্থা হল বল দিকি?
