রঘুরাম আসবে, কিন্তু কখন?
রঘুরাম পাশি। তাল গাছ চাঁছে, তাড়ি তৈরি করে। ব্যাবসা চলে অবশ্য আবগারিকে ফাঁকি দিয়ে। একবার ধরা পড়ে দু-বছর জেল খেটেছে কিন্তু স্বভাব বদলায়নি।
রোগা শিড়িঙ্গে লোকটা। নারকেলের দড়ির মতো ছিবড়ে-পাকানো শরীর। অতিরিক্ত তাড়ি খায়, আবার গাঁজাও টানে ততোধিক উৎসাহে। বলে, রসটা তো শুকোনো চাই, হে-হে-হে। চোখের রং খ্যাপা বুনো মোষের মতো রক্তাভ, অত্যধিক নেশার ফলে স্বাভাবিক বর্ণ হারিয়ে ওই রংটাই পাকা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু এইটুকুই যথেষ্ট পরিচয় নয় রঘুরামের। কোন ছেলেবেলাতে একটা গাদাবন্দুক জোগাড় করেছিল রঘুরাম, হাত পাকিয়েছিল। তার পর থেকে তার হাতের তাক একটা প্রবাদবাক্যের মতো দাঁড়িয়ে গেছে। কার্তিক-অঘ্রান মাসে আশপাশের বিলে হাঁস পড়তে শুরু হয়। মিয়াসাহেবেরা, বাবুমশায়েরা তখন বিলে নামে শিকারের চেষ্টায়। দমাদ্দম গুলি ছোড়ে, দশটা ফায়ারে একটা পাখি নামাতে পারে না। আর তাই দেখে এলোমেলো দাঁতগুলোর দু-পাটি একেবারে পরিপূর্ণ করে মেলে দেয় রঘুরাম, হো-হো করে হাসে। বলে, কর্তাদের একটা গুলিও তো পাখিগুলোর গায়ে লাগবে না, তবে যেরকম শব্দ-সাড়া হচ্ছে তাতে দুটো-চারটে বাসায় গিয়ে মরে থাকবে।
তা হাসতে পারে বই কী রঘুরাম, বিদ্রূপ করবার অধিকারও তার আছে। তার হাতের তাগ ফসকায় না। বাবুদের বন্দুক চেয়ে নিয়ে এক ফায়ারে দশটা পাখিও সে নামিয়ে দিয়েছে। বলেছে, শুধু কি বত্রিশ ইঞ্চি বন্দুক আর বাক্স বাক্স টোটা থাকলেই শিকারি হওয়া যায়? হাওয়া বুঝতে হয়, জায়গা বাছতে হয়, জল-কাদা কাঁটাবন ভাঙতে হয়। সুখের শরীর আর কোঁচানো ধুতিটি নিয়ে বন্দুক বাগিয়ে কাক তাড়ানো যায়, কিন্তু শিকার করা যায় না।
সত্যিই রঘুরাম পাকা শিকারি আর শিকারি বলেই তাকে এমন সমাদর করে ডেকে পাঠানো হয়েছে। তবে এবার আর তার পাখি শিকার নয়, তার চাইতে ঢের বড়ো ঢের বিপজ্জনক শিকারের বন্দোবস্ত।
আর এদিক থেকেও বেশ নিরাপদ নির্ঝঞ্ঝাট লোক রঘুরাম। নীতি বলে বিবেক বলে কোনো কিছুর বালাই নেই তার। টাকা পেলে যা খুশি সে তাই করতে পারে, খামোখা গোটা তিনেক মানুষ খুন করে আনতে পারে। সকলের মাঝখানে থেকেও সে সকলের বাইরে। প্রয়োজনমতো নিজেকে কেন্দ্র করে সে একটা বৃত্তাকার পৃথিবী সৃষ্টি করে নিয়েছে। তাল গাছ চাঁছে, তাড়ি গেলে, গাঁজা টানে আর গ্রামের প্রান্তে যে ডোম পাড়া আছে সেখানে কোন একটা মেয়েমানুষকে নিয়ে সারারাত কাটিয়ে আসে। সুতরাং একাজে তার চাইতে উপযুক্ত লোক আর নেই।
দরজায় ঘা পড়ল। ঘরের ভেতরে হঠাৎ ঘুমের ঘোরে ভয় পেয়ে চমকে জেগে-ওঠা মানুষের মতো বিকৃত স্বরে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল লোকনাথ, কে?
বাতাসের শব্দের সঙ্গে একাকার হয়ে স্বর ভেসে এল, রঘুরাম।
দাঁড়াও, দোর খুলছি।
একটা লণ্ঠন জ্বালিয়ে দরজাটা খুলে দিলে লোকনাথ। বিড়ালের মতো শব্দহীন পায়ে রঘুরাম ঘরে ঢুকল।
দন্ডবৎ কত্তা। কীজন্যে অধীনকে ডেকেছেন আজ্ঞে?
বসসা বলছি।
দরজাটা আবার সাবধানে বন্ধ করে দিলে লোকনাথ। তারপর তেমনিভাবেই ভয়ংকর চাপা গলায়—যে-গলায় ফজল আলি কথা বলেছিল ঠিক তেমনিভাবেই সেই কথাগুলোই সে আবৃত্তি করে গেল। চুপ করে শুনে গেল রঘুরাম, শুনে গেল পাথুরে মূর্তির মতো।
কখন?
কাল সন্ধেয়?
কাল সন্ধেয়?
হ্যাঁ। দিঘির পাড়ে সভা করবে ওরা। বড়ো বাঁশঝাড়টার আড়াল থেকে কাজ শেষ করতে হবে।
ক-টাকে মারতে হবে?
না না, বেশি নয়। এক রহমান হলেই যথেষ্ট, ওটাকে ঘায়েল করতে পারলেই শিরদাঁড়া মটকে যাবে ওদের। এবার তোমার হাতের তাক দেখব রঘুরাম।
রঘুরাম হাসল, এলোমেলো দাঁতগুলো বার করে বিশৃঙ্খলভাবে টেনে টেনে হাসল খানিকক্ষণ। বললে, আচ্ছা, বন্দুকটা দিন।
লোকনাথ বন্দুক বার করে আনলে। বললে, খুব সাবধান। আমার প্রাণ তোমার হাতে দিয়ে দিচ্ছি রঘুরাম। কাজ শেষ হলেই ফেরত চাই, নইলে মহা গন্ডগোলে পড়ে যাব।
হ্যাঁ হ্যাঁ, কাজ শেষ হলেই ফেরত দেব বই কী। তাজা কার্তুজগুলো আর খোলা বন্দুকটাকে একটি থলির ভেতরে পুরতে পুরতে রঘুরাম বললে, কিচ্ছু ভাববেন না।
তারপর উঠেই দ্রুতগতিতে সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। লোকনাথ খোলা দরজা দিয়ে তাকিয়ে রইল নির্নিমেষ দৃষ্টিতে। গ্রামের আনন্দ-কলরোল কানের পর্দায় এসে শঙ্কর মাছের চাবুকের মতো এক-একটা করে প্রবল প্রচন্ড আঘাত বসিয়ে যাচ্ছে তাকে।
কিন্তু একটা জিনিস জানল না লোকনাথ। সেই রাত্রেই রঘুনাথ গেল ফজল আলির বাড়িতে, তারপর বৃন্দাবন পালের আড়তে, তারপর নুর মামুদের কাছারিতে। তারপর…
তার পরদিন বিকেলে জোর মিটিং বসেছে দিঘির পাড়ে। দলে দলে লোক জড়ো হয়েছে, চেঁচামেচি করছে, উচ্চারণ করছে তাদের কঠিন অপরাজেয় শপথ। উত্তেজনায় মুষ্টিবদ্ধ হাতটাকে বারে বারে আকাশের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে রহমান, ভাই সব, জান কবুল, আমরা ধান দেব না। আমরা না খেয়ে কুত্তার মতো মরব আর মহাজনের গোলা ভরে উঠবে আমাদের খুন-মাখানো ধানে, এ আমরা হতে দেব না—কিছুতেই না।
গগনভেদী সমর্থনের রোলে হারিয়ে যাচ্ছে রহমানের কণ্ঠ। এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে, সূর্যের উজ্জ্বল আলোর মতোই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে আজ আর রহমানের নিজের কথা কিছু বলবার নেই। তার কথা আর সমস্ত মানুষের কথার বন্যায় একাকার হয়ে গেছে, সমস্ত মানুষের প্রতিশোধ আর প্রতিরোধের উদ্ধত মুষ্টির সঙ্গে মিশে গেছে রহমানের উদ্যত মুষ্টিও। ব্যক্তিমানুষের সীমানা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সমষ্টিময় মানুষের বিপুল বিস্তারে। আজ শুধু রহমান বক্তা নয়, সমস্ত মানুষের বক্তব্য একসুরে মুখর হয়ে উঠেছে, জান দেব, ধান দেব না।
