কিন্তু এ তো তা নয়। কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে শেষপর্যন্ত ফণা তুলে উঠেছে কেউটে সাপ। এ কি কখনো কল্পনাও করা যায় যে শেষপর্যন্ত এ আপদ তারই ঘাড়ে চড়ে বসতে চাইবে? তিন ভাগের দু-ভাগ ধান! তার মানে দু-মাস পরে বলবে তিন ভাগের তিন ভাগই চাই! আর শুধু ওইখানেই থামলে হয়! শেষপর্যন্ত দাবি করে বসবে ঘর দাও, বাড়ি দাও, গোরু দাও, বউ দাও…
নাঃ, অসহ্য এবং অসম্ভব। কচু গাছ কাটতে কাটতে ডাকাত হওয়ার যে অদূর সম্ভাবনা সুনিশ্চিত হয়ে আসছে, এই মুহূর্তে তার কণ্ঠরোধ করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে টু শব্দটি করবার পর্যন্ত সাহস না পায়।
সত্যিই অসহ্য। লোকনাথ সাহা কান পেতে শুনতে লাগল গ্রামের দিক থেকে কোলাহল উঠেছে। জয়ের কোলাহল, আনন্দের কলধ্বনি। ফসল কেটে নিজেদের ঘরে তুলেছে ওরা। মহাজন আর জোতদারকে বলে পাঠিয়েছে, দরকার হলে তারা যেন নিজেদের ভাগ নিজেরা এসে নিয়ে যায়। ওরা জমিতে লাঙল দিয়েছে, সার দিয়েছে, রোদে পুড়ে জলে ভিজে ফসল ফলিয়েছে এবং ফসল কেটেছে। আসলে সব ধানটাতেই ওদের দাবি। তবু জমিদার জোতদারকে একেবারে বঞ্চিত করতে চায় না, তাই ধর্মের নামে তাদের এক ভাগ ধান দিতে ওদের আপত্তি নেই। তবে বাড়ি বয়ে সে এক ভাগ ওরা দিয়ে আসতে রাজি নয়। বাবুমশায় এবং মিয়াসাহেবেরা ইচ্ছে করলে নিজেরা এসে অথবা নোক পাঠিয়ে তাঁদের পাওনা ভাগ নিয়ে যেতে পারেন।
লোকনাথ সাহা, ফজল আলি, নুর মামুদ আর বৃন্দাবন পাল চাষাদের বোঝাবার চেষ্টা করেছিল। বলেছিল, আল্লার নামে ভগবানের নামে ভেবে দ্যাখ তোরা কী করতে যাচ্ছিস!
চাষাদের পক্ষ থেকে রহমান জবাব দিয়েছিল, যা করেছি আল্লার নামে ভেবেই করেছি। গায়েগতরে একটু আঁচড় লাগায়ে না বাবু, জমির ভালো-মন্দের দিকে একবার তাকাবে না, অথচ থাবা দিয়ে অর্ধেক ধান গোলায় তুলে নেবে। নিজেরাই একবার ইমানের দিকে তাকিয়ে দ্যাখো কোনটা হক আর কোনটা বেইমানি।
ফজল আলির আর সহ্য হয়নি। গর্জে বলেছিল, খুব তো হক আর বেইমানি বোঝাচ্ছিস। ওরে, মোছলমানের বাচ্ছা হয়ে হিঁদুর ফাঁদে পা দিলি? লজ্জা হয় না?
রহমান শুধু হেসেছিল। বাধা দিয়ে বলেছিল, মোছলমান গরিব হিঁদু গরিবের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পেটের ভাতের জন্যে লড়াই করলে গুনাহ হয়, আর হিন্দু জোতদারের সঙ্গে দোস্তি করে মোছলমানের ভাত মারলে সেটাই বুঝি বড়ো ভালো কাজ হল? বোকা বুঝিয়ে না সাহেব, যাও যাও, নিজের কাজে যাও।
পিপড়ের পাখনা গজিয়েছে মরবার জন্যে, অ্যাঁ? ধৈর্যচ্যুত হয়েছিল ফজল আলি, আচ্ছা, টের পাবি! সেদিন পায়ে ধরে কাঁদলেও নাফা হবে না, এই বলে রাখলাম।
কলিজার রক্ত দিয়ে ধান রাখব, জান দিতে হয় দেব, তবু তোমাদের দোরে হাত পেতে সিন্নি চাইতে যাব না—এও জানিয়ে রাখছি।
বটে? বেশ বেশ!
আর কথা জোগায়নি ফজল আলির। কয়েক মুহূর্ত নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে ছিল রহমানের দিকে, যেন রক্তখেকো একটা বাঘের মতো ওর ঘাড়ের ওপর ঝাঁপ দিয়ে পড়বে। তারপর দাঁতের ফাঁকে একটা ভয়ংকর কটু শপথ উচ্চারণ করে ধীর পদক্ষেপে স্থানত্যাগ করেছিল। সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছিল লোকনাথ সাহা, বৃন্দাবন পাল আর নুর মামুদ।
তারপর?
তারপর থেকে এই চলছে। মানুষগুলো খেপে উঠেছে, মেতে উঠেছে জয়ের আনন্দে। এ যেন সাপের পাঁচখানা পা দেখবার আনন্দ। কিন্তু সাপের যে সত্যি সত্যিই পাঁচটা বেরোয় না, এটা ওদের বোঝানো দরকার। বুদ্ধিটা শেষপর্যন্ত বাতলে দিয়েছে ফজল আলিই। বলেছে, রঘুরামকে ডাকো।
রঘুরাম?
হ্যাঁ, রঘুরাম। সে ছাড়া আর কারও কর্ম নয়।
তারপর গলার স্বর নামিয়ে এনেছে ফজল আলি। চাপা গলায় বলেছে কতগুলো ভয়ংকর কথা। শুনে লোকনাথের অবধি শরীরটা ঝিমঝিম করে উঠেছে, হিম হয়ে গেছে হাত পাগুলো। জিভটা শুকিয়ে হঠাৎ যেন আঠার সঙ্গে আটকে গেছে তালুতে।
ক্ষীণকণ্ঠে লোকনাথ বলেছে, অতটা?
হ্যাঁ, অতটাই।
বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না?
কিচ্ছু না। শত্রুর শেষ রাখতে নেই।
কিন্তু থানা-পুলিশ?
ফজল আলি হেসেছে। বলেছে, সাধে কি তোমাদের সঙ্গে আমাদের বনিবনাও হয় না, না পাকিস্তান চাইতে হয়? আরে, অত ঘাবড়ালে চলে? তা ছাড়া থানা-পুলিশ? গূঢ়ার্থব্যঞ্জক হাসিতে মুখোনাকে উদ্ভাসিত করে তুলেছে ফজল আলি। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে পারলে ওরাও আপত্তি করবে না দেখে নিয়ো। আর একটু থেমে দু-আঙুলে টাকা বাজাবার ভঙ্গি করে বলে, ঠিক হয়ে যাবে।
তাহলে রঘুরামকে খবর দিই?
নিশ্চয়।
শুকনো ঠোঁট দুটোকে বার কয়েক লেহন করে দুর্বল অনিশ্চিত স্বরে লোকনাথ বললে, দ্যাখো ভাই, শেষতক পেছনে পেছনে থেকো। শেষে আবার সামনে ঠেলে দিয়ে সরে পোড়ো না।
খেপেছ? পিচ করে অবজ্ঞাভরে দাঁতের ফাঁক দিয়ে থুথু ছড়িয়েছে ফজল আলি, দু-বার হজ করেছি, পাঁচ অক্ত নামাজ পড়ি আমি। জীবনে একটা রোজা আমার ভাঙেনি। খাঁটি মোছলমানের বাচ্চা আমি, ইমান নষ্ট করব! কী যে বলছ, তোব তোবা!
সুতরাং ডাক পড়েছে রঘুরামের। রঘুরাম বলেছে সন্ধের পরে আসবে, দিনের আলোয় এ ব্যাপার সম্ভব নয়। গাঁয়ের লোক এমনিতেই খ্যাপা কুকুরের মতো ঘুরছে, দেখলেই সন্দেহ করবে। আর সন্দেহ করা মানেই চকচকে হাঁসুয়ার কোপে টুকরো টুকরো করে কেটে বস্তায় ভরে ভাসিয়ে দেবে করতোয়া নদীতে।
তাই সন্ধ্যার অন্ধকারে আসবে রঘুরাম। আসবে কালো রাত্রির আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে নিঃশব্দচর সরীসৃপের মতো। তারই জন্যে প্রতীক্ষা করছে লোকনাথ, পায়চারি করে বেড়াচ্ছে বন্য জন্তুর মতো। চাষিদের কোলাহলের এক-একটা দমকায় বুকের ভেতর এক-একটা করে চিড় খেয়ে যাচ্ছে তার।
