অসীম হিংস্রতায় দাঁতে দাঁত চাপল মানিক সর্দার। এক বার একটুখানি দেখতে পেলে হয়। বাঘকে কিছু করতে হবে না, তার বল্লম বিঁধিয়ে দেবে বাঘের পাঁজরায়। কিন্তু বাঘও চিনে নিয়েছে তার সশস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বীকে। সুযোগ সেও দেবে না। আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে এমনিভাবেই চলতে থাকবে সঙ্গে সঙ্গে। তারপর যে মুহূর্তে দেখবে শত্ৰু এতটুকু অসতর্ক হয়েছে—তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে পড়বে তার ওপরে।
প্রায় দশ মিনিট ধরে এইভাবে চলল সুযোগের অপেক্ষা। অসহ্য মানসিক পীড়নে মাথার শিরাগুলো প্রায় ছিঁড়ে যাচ্ছে মানিক সর্দারের। সামনে প্রায় আরও দু-শো গজ জঙ্গল। এতটুকু পেরোতে পারলেই ফাঁকা মাঠ। এক বার মাঠে গিয়ে পৌঁছাতে পারলে বাঘ আর তার সামনে আসতে পারবে না। শুধু একটি বাঘ কেন, তখন সারা দুনিয়ার সমস্ত বুনো জানোয়ারের সঙ্গেই লড়বার জন্যে তৈরি হয়ে আছে মানিক সর্দার।
বাতাসটা আবার বন্ধ হয়ে গেছে। বাঘের সাড়া পেয়েই ঝিঝিরাও ডাক থামিয়েছে হয়তো। শুধু বাঘের পায়ের খসখসানি ছাড়া আর এতটুকু শব্দ নেই কোথাও, যেন সমস্ত জঙ্গলটা নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করে আছে। মানুষ আর জানোয়ারের এই যুদ্ধের ফলাফলটা তারা দেখতে চায়।
বাবা! বলাইয়ের মুমূর্ষ গলার আওয়াজ পাওয়া গেল।
চাপা গর্জনে মানিক সর্দার বললে, চুপ।
পুরোনো পেতলের মতো জ্যোৎস্নার ওপর গাছের কলঙ্ক কাঁপছে। শুধু ঝোপের ভেতরে একটা মাত্র বাঘই না, যেন সমস্ত জঙ্গলটার ওপরেই কে একটা বিশাল চিতা বাঘের চামড়া বিছিয়ে রেখেছে। দু-দিন পরে এখানে মহুয়া পাকবে, পলাশের রঙে লালে লাল হয়ে যাবে সব। দুপুরের ঝিমঝিম বরাদে এখান থেকে চলতে চলতে নেশা ধরে যাবে। কিন্তু এই মুহূর্তে এই জঙ্গলে রূপ নেই, বর্ণ নেই, গন্ধ নেই, কিছুই নেই। শুধু এক-একটা উৎকট গন্ধের ঝলকে মৃত্যু তার বীভৎস অস্তিত্বকে ঘোষণা করছে। শুধু ঝোপের ভেতরে ক্ষুধিত বাঘের চোখ নিষ্ঠুর আদিমতায় ধক ধক দপ দপ করে উঠছে।
এ প্রতীক্ষা অসহ্য। মানিক সর্দারের মাথার শিরা ছিঁড়ে যেতে লাগল। যাহোক কিছু হয়ে যাক, এই মুহূর্তেই হয়ে যাক। এক বারের জন্যে একটুখানি বেরিয়ে আসুক বাঘ। যদি সাহস থাকে মরদের মতো মুখোমুখি দাঁড়াক। তারপর প্রমাণ হয়ে যাক তার বল্লমের ধার বেশি না বাঘের দাঁতের জোর।
বাবা, আমার ভয় করছে। বলাইয়ের ফোঁপানি শোনা গেল।
মানিক সর্দারের ব্রহ্মর জ্বলে গেল দপ করে। পনেরো বছর বয়েস হল কিন্তু এখনও মানুষ হল না ছেলেটা। আজ পঞ্চাশ বছর বয়েস, অসুস্থ জীর্ণ শরীর নিয়ে যখন সে বনের সবচাইতে হিংস্র শত্রুর সামনে রুখে দাঁড়িয়েছে—তখন তার পিঠের আশ্রয়ে থেকেও একটা ছোটো মেয়ের মতো ভ্যানভ্যান করছে বলাই। মানিকের ইচ্ছে করতে লাগল একটা প্রচন্ড চড় বসিয়ে দেয় বলাইয়ের গালের ওপর।
চুপ কর, চুপ কর মেয়েমানুষ কোথাকার। তীব্র চাপা গর্জন করে উঠল মানিক।
আবার সেই বাঘকে মুখোমুখি রেখে এগিয়ে চলা। আবার সেই স্নায়ুছেঁড়া প্রতীক্ষার পালা। ঝোপের ভেতরে বাঘের সতর্ক পদসঞ্চার। দুশো গজ জঙ্গল পার হয়ে যেতে এখনও অনেক সময় লাগবে।
একটা কান্ড হল ঠিক এই সময়।
ঝোপের মধ্যেই কোথাও বাসা করে ডিম নিয়ে বসেছিল বনমুরগি। খুবসম্ভব বাঘের পা পড়ল তার বাসায়। তৎক্ষণাৎ ক্যাঁ-ক্যাঁ করে একটা উৎকট চিৎকার তুলে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল বনমুরগি। ঝটপট করে উড়ে গেল মানিক সর্দারের মাথায় পাখার ঝাপটা দিয়ে।
অদ্ভুত ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল বলাই, চমকে উঠল মানিক সর্দার। ধনুকের ছিলের মতো টান-করা স্নায়ুর অতি সতর্ক পাহারা বিভ্রান্ত হয়ে গেল মাত্র কয়েক পলকের জন্যে। বাঘ সে সুযোগ ছাড়ল না, তীব্র হুংকার করে স্তব্ধ ভয়ার্ত জঙ্গলকে থরোথরো কাঁপিয়ে সোজা লাফিয়ে পড়ল মানিকের ওপর।
কিন্তু এই বিপর্যয়ের জন্য বাঘও লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। ঠিক গায়ে পড়ল না, পড়ল পাশে। বলাইয়ের আর্ত কান্নায় আর এক বার আঁতকে উঠল জঙ্গল। আর মানিকের হাতের বল্লম বাঘের বুক ফসকে ডান কাঁধের ওপর গিয়ে বিঁধল।
আহত যন্ত্রণায় গোঙানি তুলে বাঘ লাফ মারল উলটো দিকে। বুঝল তারও হিসেবে ভুল হয়ে গেছে। সাধারণ শত্রুর সামনে সে পড়েনি, এখানে শিকার করার চাইতে শিকার হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি। তারপরে যন্ত্রণায় গর্জন করতে করতে ল্যাজ গুটিয়ে ছুটে পালাল। বহুদূর পর্যন্ত শোনা যেতে লাগল তার গর্জন আর আওয়াজ। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মানিক সর্দার। তারপর বল্লমের ফলাটা ঘুরিয়ে আনল চোখের সামনে। বাঘের কিছু রোঁয়া আর রক্ত তখনও লেগে আছে তাতে। বাঁ-হাত দিয়ে কপালের ফোঁটা ফোঁটা ঘামগুলোকে মাটিতে ঝরিয়ে দিয়ে বললে, শালা!
আহত হয়ে বাঘ পালিয়েছে। টের পেয়েছে বল্লমের স্বাদ। বুঝেছে পৃথিবীর সব জিনিসই তার খাওয়ার জন্যে তৈরি হয়নি। এর পরে মানুষের কাছে এগিয়ে আসবার আগে সে ভালো করে ভেবে নেবে।
শালা!
জঙ্গলে আবার তীব্র ঝিঝির ডাক উঠেছে। গাছের ডালে ঘুমন্ত পাখিরা জেগে উঠে ভয়ে কিচিরমিচির করছে। মানিক সর্দারের মনে হল, শতকণ্ঠে অরণ্য যেন জয়ধ্বনি তুলছে তার।
এতক্ষণে বলাইয়ের কথা খেয়াল হল। বলাই বসে আছে মাটির ওপর। গলা দিয়ে ঘরঘর করে আওয়াজ বেরুচ্ছে। যেন বোবায় ধরেছে।
