দুশো-তিনশো! শিউকুমারী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। কোথায় পাওয়া যাবে এত টাকা? কুলবীরের বাক্স হাতড়ালে কুড়িটা টাকার বেশি একটি আধলাও পাওয়া যাবে না, একথা তার চাইতে ভালো করে আর কে জানে।
মহীতোষ লোভীর মতো তার দিকে হাত বাড়াল।
কিন্তু সরে দাঁড়াল শিউকুমারী। দুশো-তিনশো টাকা! বলদেও আজ সারারাত প্রতীক্ষা করে থাকবে। চিন্তাগুলো একসঙ্গে আগ্নেয়গিরির গলিত ধাতুপুঞ্জের মতো ফুটতে লাগল। মাত্র এক বার। একটি রাত্রির অশুচিতা। তারপরে যে-জীবন আসবে তার পবিত্র নির্মল স্রোতে ধুয়ে যাবে সমস্ত, মুছে যাবে সমস্ত গ্লানি আর দুঃস্বপ্নের স্মৃতি।
মহীতোষ বললে, বুকে এসো।
টাকার জোগাড় করে আনছি। ঘর থেকে মাতালের মতো বেরিয়ে গেল শিউকুমারী। চিন্তার মধ্যে আগুন জ্বলে যাচ্ছে, যেন একপাত্র চড়া মদ খেয়েছে সে। দুষ্ট ক্ষুধা বলদেওয়ের। এক রাত্রের জন্য তিনশো টাকা খরচ করবে, এমন বেহিসাবি সে নয়। প্রতিশোধ নেবার জন্যে, যতদিন শিউকুমারীর যৌবন থাকবে ততদিন তাকে দলিত মথিত করে লুটে নেবার জন্যেই বলদেওয়ের এই কৌশল। এই ফাঁদে আরও অনেকেই পড়েছে, এটা কোনো নতুন কথা নয়।
কিন্তু শিউকুমারীর পক্ষে মাত্র এক রাত্রি। সমস্ত জীবনের জন্যে একটি রাত্রির চরম গ্লানি, চূড়ান্ত অপমানকে মেনে নেবে সে? তারপর কাল, পরশু? তখন হয়তো তারা ভুটানের পাহাড় পেরিয়ে চলেছে সিকিমের দিকে। সমস্ত শিরায় শিরায় তীব্র জ্বরের জ্বালা নিয়ে ডিলিরিয়ামের রোগী যেমন উঠে বসতে চায়, ছুটে যেতে চায়, তেমনি করেই শিউকুমারী অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আর বিছানার উপরে বিহবল হয়ে বসে রইল মহীতোষ। তার রক্তে রক্তে একী আশ্চর্য দোলা! যেন নিশি পেয়েছে তাকে। তার নিজের অতীত, তার জীবনের সংকল্প, সব মিথ্যা আর মায়া হয়ে গেছে। নতুনের আহ্বান—বহুবিচিত্র, বহু ব্যাপক অনাস্বাদিত জীবনের আহ্বান। এই পুলিশের তাড়া, এই বিব্রত বিড়ম্বিত মুহূর্তগুলো, এদের ছাড়িয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়লে ক্ষতি কী? ক্ষতি কী নিজেকে ভাসিয়ে দিলে আশ্চর্য একটা অ্যাডভেঞ্চারের সমুদ্রে?
চাপা গলায় মহীতোষ ডাকলে, শিউ, শিউ।
কিন্তু শিউ এল না, এল অরবিন্দ। সত্যিই অরবিন্দ। জঙ্গলের মধ্য থেকে উঠে এল অমানুষিক মানুষ। মহীতোষের সর্বাঙ্গ দিয়ে যেন বরফগলা জলের শিহরণ নেমে গেল।
মহীতোষের মুখের ওপর টর্চের আলো ফেলে বজ্রগর্ভ কঠিন আদেশের গলায় অরবিন্দ বললে, অনেক খুঁজে তোমার সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু এখানে বসে একটা পাহাড়ি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করা ছাড়াও ঢের কাজ আছে তোমার। উঠে পড়ো।
বিহবল ভীত গলায় প্রশ্ন এল, কোথায়?
পঁচিশ মাইল দূরে। ভালো শেলটার আছে, দলের লোক আছে। ওখানে থেকে শহরে আণ্ডারগ্রাউণ্ড ওয়ার্ক বেশ করা চলবে। উঠে পড়ো।
এখনি?
হ্যাঁ, এখনি। মুখের মধ্যে চাপা দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠল অরবিন্দের। বাঁ-হাতে দেখা দিলে ছোটো একটা কালো রিভলবার। তিন রাত পাহাড়িদের ঘরে কাটিয়েই কি আয়েশি হয়ে গেলে নাকি?
মহীতোষ কলের পুতুলের মতো উঠে দাঁড়াল। রিভলবারের সংকেতটা অত্যন্ত স্পষ্ট।
অরবিন্দ বললে, বাইরে বড়ো ঘোড়া তৈরি আছে। দুজনকেই এক ঘোড়ায় উঠতে হবে। হারি আপ!
টর্চের আলো নিবে গেল। ঝোপড়ির মধ্যে নিঃসঙ্গ অন্ধকারে পচাইয়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। দূরে ঝম ঝম করে প্রচন্ড শব্দে ভুটিয়ারা ঝাঁঝি বাজাচ্ছে—অপদেবতাকে তাড়াবার চেষ্টা করছে তারা। ঘোড়ার খুরের শব্দে কি অপদেবতার পদধ্বনিও মিলিয়ে এল?
চরম লাঞ্ছনা আর মর্মান্তিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সংগ্রহ করা তিনশো টাকার নোট। শিউকুমারীর হাতের মধ্যে ঘামে ভিজছে নোটের তাড়াটা। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে সে। কালো অন্ধকার, এক হাত দূরের মানুষ চোখে দেখা যায় না। শালের পাতায় শিরশিরানি, এখানে-ওখানে বন্যজন্তুর আগ্নেয় নয়ন।
মহীতোষ—এই কালো অন্ধকারে কোথায় মহীতোষকে খুঁজে পাবে শিউকুমারী? অরণ্য তাকে গ্রাস করেছে, নিঃশেষে তলিয়ে নিয়েছে নিজের মধ্যে। তবু অন্ধকারে শিউকুমারী খুঁজে ফিরছে। শালের চারায় পা কেটে রক্ত পড়ছে, কাঁটায় ছড়ে যাচ্ছে সর্বাঙ্গ। এত অন্ধকার এমন দুচ্ছেদ্য তমসায় একটুখানি আলো যদি পাওয়া যেত!
আলো পাওয়া গেল ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর। পট পট করে পাতা পোড়ার শব্দ, বনমুরগির ভীত কলরব চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। বনজ্যোৎস্না নয়, দাবাগ্নি!
বন্দুক
অধৈর্যভাবে ঘরের ভেতরে পায়চারি করছে লোকনাথ সাহা। ক্ষুব্ধ আক্রোশে অনেকক্ষণ ধরে দাঁতের ওপর দাঁত চেপে রাখবার ফলে মাড়িটা টনটন করছে এখন। ডান হাতটা অতিরিক্ত জোরে মুঠো করে রাখবার জন্যে হাতের নরম মাংসের ভেতরে দু-তিনটে নখ একেবারে বসে গেছে; জ্বালা করছে চিনচিন করে, রক্ত পড়ছে বোধ হয়। কিন্তু লোকনাথ সাহা টের পাচ্ছে না কিছু, তেমনি অধৈর্যভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘরের মধ্যে পায়চারি করে যাচ্ছে।
তারপর আস্তে আস্তে সন্ধ্যা ঘনাল। ঘরের ভেতরে নামতে লাগল কালো অন্ধকার। যেগুলো স্পষ্ট আর আকারগত ছিল, ধীরে ধীরে তারা অবয়বহীন হয়ে যেতে লাগল। তারও পরে ঘরের ভেতরে লোকনাথ সাহার নিজের অস্তিত্ব ছাড়া কিছু জেগে রইল না।
নিজের অস্তিত্বটাই শুধু জেগে রইল। কিন্তু অতি তীব্র, অতি ভয়ংকর এই জাগরণ। ইচ্ছে করতে লাগল এই অন্ধকারের মধ্যেই সে ছুটে বেরিয়ে পড়ে; জ্বালিয়ে দেয় এই পৃথিবীটাকে, ভেঙে চুরমার করে দেয় যা-কিছু সম্ভব। একটা অসহ্য অথচ অবাস্তব ধ্বংসকল্পনায় প্রচন্ড বিস্ফোরণের মতো নিজের মধ্যে ধূমায়িত হতে লাগল লোকনাথ সাহা। যুগ পালটাচ্ছে, দেশ স্বাধীন হচ্ছে, সব মানি; এও জানি যে গরিবের দুঃখ দূর করতে হবে, চাষাভুসোদের পেটের অন্নের সংস্থান করে দিতে হবে। কিন্তু এ কী ব্যাপার! স্বাধীনতার আন্দোলন করতে হয়, লড়াই করতে হয় করো ইংরেজের সঙ্গে। পেটের ভাত চাইতে হয় মহকুমা হাকিমের বাংলোর সামনে গিয়ে ধর্না দাও, শহরের রাস্তায় ভুখামিছিল বার করো। এদের কোনোটাতেই লোকনাথ সাহার আপত্তি নেই। দরকার হলে দেশের জন্যে সেও আত্মবিসর্জন করতে পারে, অর্থাৎ একটা সভাসমিতিতে সভাপতি হয়ে মাস তিন-চার এ ক্লাস জেল খেটে আসতে পারে—যা সে এর আগেও করেছে। আর বলো তো খবরের কাগজে জ্বালাময়ী একখানা পল্লিগ্রামের পুত্রও সে লিখে দিতে পারে, অগ্নিময় কণ্ঠে প্রশ্ন করতে পারে আমরা জানিতে চাই, জনপ্রিয় মন্ত্রীমন্ডলী এই অনাচার-অবিচারের প্রতিবিধান করিবেন কি না এবং কবে করিবেন?
