আর কিছু মনেও থাকে না। একটু আগেকার তীব্র হাসির জ্বালাটাও তেমনি করে আর কানের মধ্যে বিধতে থাকে না। এই মেয়েটা কি ওকে সম্মোহিত করে ফেলেছে?
দিন কাটছিল, কিন্তু আর কাটল না। জীবনের অপরিহার্য জটিলতা এসে দেখা দিল। সন্ধ্যার অন্ধকারে পচাইয়ের দোকানে কাঠের কারবারি বলদেও আবির্ভূত হল। এক মুখ কুটিল হাসি বিস্তার করে বললে, ভালো আছ শিউ?
শিউকুমারীর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল, কুলবীর তাকাল সন্দিগ্ধ ভীত দৃষ্টিতে। সাংঘাতিক লোক বলদেও। পচাইতে তার নেশা নেই, কোনো মতলব না-থাকলে এদিকে পা দিত না সে। কিন্তু কী সে-মতলব?
কুলবীর অনুমান করবার চেষ্টা করতে লাগল।
বলদেও প্রতিপত্তিশালী লোক। যেমন কূটবুদ্ধি তেমনি নির্মম। তাকে ভয় না-করে এমন লোক নেই। তবু শিউকুমারী ভয় করেনি তাকে। সন্ধ্যার অন্ধকারে তার হাত চেপে ধরে প্রণয় নিবেদন করেছিল বলদেও। বলেছিল, যত টাকা চাস…
কিন্তু কথাটা শেষ হয়নি। প্রকান্ড চড়টার বিভ্রম থেকে আত্মস্থ হয়ে বলদেও যখন মাথা তুলেছিল, তখন জলঢাকার বালিবিস্তারের উপর একটি প্রাণীরও চিহ্ন নেই। শুধু নদীর গর্জন পরিহাসের মতো বাজছে।
টাট্টু ছুটিয়ে বলদেও চলে গিয়েছিল। কিন্তু চড়ের জ্বালাটা যে সে ভোলেনি, সহজে ভুলবেও, একথা শিউকুমারীও জানত।
বিবর্ণ মুখে শিউকুমারী বললে, ভালোই আছি।
হুঁ, খুব ভালো আছ বলেই মনে হচ্ছে? আবার নির্মমভাবে বলদেও হাসল। ছোটো ছোটো চোখ দুটোয় ঝিকিয়ে উঠল পাহাড়ি প্রতিহিংসার সর্পিল চমক।
বলদেও নেশা করে না সহজে। কিন্তু আজ তার কী হয়েছে? ভাঁড়ের পর ভাঁড় নিঃশেষ করে চলল সে। একটা দশ টাকার নোট কুলবীরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললে, চালিয়ে যাও থাগাজি।
রাত বেড়ে চলল। একে একে খরিদ্দারেরা চলে গেল সবাই, কিন্তু বলদেও ওঠে না। অধৈর্য হয়ে টাট্টুঘোড়াটা পা ঠুকছে বারে বারে, লেজের ঘা দিয়ে মশা তাড়াচ্ছে। জঙ্গলের পথে বুনো জানোয়ারকে ভয় করে না বলদেও। অমিত শক্তিমান লোক-ভোজালির ঘায়ে বাঘ মারতে পারে।
কী-একটা কাজে কুলবীর ঘরের মধ্যে ঢুকতেই বলদেও এগিয়ে এল। শিউকুমারীর চোখের ওপর রক্তাক্ত হিংস্র চোখ দুটো স্থির নিবদ্ধ করে বললে, ফেরারি আসামিকে ঘরে জায়গা দিয়েছ?
পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত থরথর করে কেঁপে গেল শিউকুমারীর, কে বলেছে তোমাকে?
আমাকে ফাঁকি দেবে তুমি? মুষ্টিগত শিকারের অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে পরিতৃপ্ত জিঘাংসার আনন্দে বলদেও বললে, সাত-সাতটা চোখ আছে আমার। কালই খবর যাবে ফাঁড়িতে। শুধু ওই বাঙালিবাবু নয়, হাতে দড়ি পড়বে তোমার, দড়ি পড়বে থাপাজির।
শিউকুমারী আর্তনাদ করে উঠল।
বলদেও বললে, শোনো শিউ। এ খবর আমি ছাড়া কেউ জানে না। আমি তোমাদের বাঁচাতে পারি, রেয়াত করতে পারি বাঙালিবাবুকেও, কিন্তু দয়া করে নয়। আজ রাতে আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করব। যদি আস, কোনো ঝামেলা হবে না। যদি না আস, কাল সকলের হাতে দড়ি পড়বে।
শিউকুমারী তাকিয়ে রইল নির্বাক চোখে!
বলদেও খাপ থেকে বার করলে ঝকঝকে ভোজালিখানা, যেন উদ্দেশ্যহীনভাবেই তার ধার পরীক্ষা করলে এক বার। বললে, টাকার জন্যে ভেবো না। আমাকে খুশি করতে পার তো যা চাও তাই দেব। যুদ্ধের বাজারে কাঠের ব্যাবসা করেছি জান বোধ হয়। কিন্তু আজ রাতের কথা যেন মনে থাকে। যদি না যাও, কাল সকালে যা হবে তারজন্যে আমাকে দোষ দিয়ো না।
বলদেও টলতে টলতে উঠে পড়ল ঘোড়ায়। সাত সেলের তীব্র একটা হান্টিং-টর্চের আলোয় অরণ্য উদ্ভাসিত করে দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল।
কিন্তু এত ব্যাপার জানল না মহীতোষ। দড়ির খাঁটিয়ায় সে তখন অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। বাইরে শালের পাতায় মর্মর তুলে বয়ে যাচ্ছে বাতাস, ঝোপড়ির ফাঁকে ফাঁকে স্নেহস্পর্শ বুলিয়ে দিচ্ছে তার সর্বাঙ্গে। স্বপ্ন দেখছে সে। কীসের স্বপ্ন? ছাব্বিশে জানুয়ারির নয়, নাইনথ আগস্টেরও নয়। পতাকাবাহী উন্মত্ত জনতার তরঙ্গবেগ কোথায় চাপা পড়ে গেছে। বিস্মৃতির অতলতায়। জলঢাকার খরখরে বালির উপর বনজ্যোৎস্না। চোখে-মুখে জলের ছাট দিয়ে যে উড়ানির বাতাস দিচ্ছে, সে কি কোনো মর্মরমূর্তি? অথবা আকাশ থেকে স্বপ্নের পাখায় ভর দিয়ে নেমে আসা কোনো আলোকপরি?
চমকে ঘুম ভেঙে গেল! বুকের ওপরে কে যেন আছড়ে পড়েছে এসে। বড়ো বড়ো নিশ্বাস মুখের ওপর এসে পড়ছে, অনুভব করা যাচ্ছে তার উত্তেজিত প্ৰসরণশীল হৃৎপিন্ডের উৎক্ষেপ। কেরোসিনের টেমির আলোয় মহীতোষ দেখলে, শিউকুমারী!
চলো, পালাই আমরা। আমাকে নিয়ে চলো তুমি।
আকস্মিক উত্তেজনায় বিভ্রান্ত হয়ে মহীতোষ দু-হাতে পাহাড়ি মেয়েটিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলে, কোথায় যাব?
শিউকুমারীর যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, অসহ্য আবেগে থরথর করে গলা কাঁপছে তার, যেখানে তোমার খুশি।
মহীতোষ ক্রমশ আত্মস্থ হয়ে উঠছে, কিন্তু কী করে নিয়ে যাব তোমাকে? এখান থেকে শুধুহাতে তো পালানো চলে না। পদে পদে বিপদ। সেসব এড়াবার জন্যে টাকা দরকার। অনেক দূর দেশে তো যেতে হবে, টাকা নইলে চলবে কী করে?
টাকা! শিউকুমারী উঠে বসল, কত টাকা চাই তোমার?
দুশো-তিনশো। তাহলে তোমাকে নিয়ে সিকিম চলে যেতে পারব, চলে যেতে পারব একেবারে গ্যাংটকে। সেই ভালো, সেখানে গিয়েই ঘর বাঁধব আমরা। যা পিছনে পড়ে আছে, পিছনেই পড়ে থাক। মহীতোষের যেন নেশা লেগেছে, নতুন করে জীবন শুরু করব আমরা।
