ছোটো কাঠের বোঝাটা মহীতোষ তুলে নিলে নিঃশব্দে।
শালবনের ছায়ামেদুর কবিতায় ছন্দপতন হয়ে গেছে। দূরে পাহাড়ের গায়ে বুনো হাতির ডাক। জলঢাকার কলগর্জন ছাপিয়ে মেঘমন্দ্রের মতো সে-ডাক ভেসে এল।
কক্ষভ্রষ্ট উল্কা, কিন্তু নিবতে চায় না—বুকের মধ্যে জ্বলতে থাকে অবিরাম। তবু উপায় নেই, থাকতেই হবে, অন্তত কটা দিনের জন্যে আশ্রয় নিতেই হবে—যে-পর্যন্ত অরবিন্দ ফিরে না-আসে। আর মহীতোষ জানে, মনের দিক থেকে নিশ্চিতভাবেই জানে, অরবিন্দ ফিরে আসবেই। যেখানে থাক, যেমন করে থাক, তাকে খুঁজে বার করবেই। মৃত্যুর হাত এড়ানো চলে, কিন্তু অরবিন্দের চোখকে এড়াবার উপায় নেই। তার দুটো চোখ যেন লক্ষ লক্ষ হয়ে পৃথিবীর আকাশ-বাতাস-অরণ্যে ছড়িয়ে পড়ে আছে।
তবু দিন কাটে। খড়ি কুড়োয়, কুলবীরের গাদাবন্দুক নিয়ে বনমুরগি শিকার করে, হরিণের সন্ধান করে। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে মনে হয় এখনই হয়তো কোথা থেকে একটা ছায়ামূর্তির মতো অরবিন্দ সামনে এসে দাঁড়াবে।
কিন্তু অরবিন্দ আসে না। যেখান-সেখান থেকে বনলক্ষীর মতো দেখা দেয় শিউকুমারী। কাঁখে কলসি, ভিজে শাড়ি সুললিত দেহের খাঁজে খাঁজে ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে রয়েছে। মৃদু হেসে চোখের তীব্র চাহনি হেনে বলে, শিকার মিলল?
থমকে দাঁড়িয়ে যায় মহীতোষ। দৃষ্টিটাকে বন্দি করে ফেলে শিউকুমারীর অনিন্দ্য দেহসুষমা। মনে রং লাগে। নিজের অজ্ঞাতেই বেরিয়ে আসে অবচেতনার স্বীকারোক্তি, মিলল বলেই তো মনে হচ্ছে।
শিউকুমারীর দৃষ্টিতে আগুন জ্বলে যায়। সত্যি?
সত্যি। যেন অদৃশ্য শয়তানের শৃঙ্খলে টান লাগে, এক-পা এক-পা করে এগিয়ে যায় মহীতোষ, অনেক খুঁজে এইবারে পাওয়া গেল বলে ভরসা হচ্ছে।
শিউকুমারী আর দাঁড়ায় না। দেহভঙ্গিমার উন্মত্ত আলোড়ন রক্তের কণায় কণায় জাগিয়ে দিয়ে দ্রুতপায়ে অদৃশ্য হয়ে যায় জঙ্গলের মধ্যে। আর পরক্ষণেই যেন দুঃস্বপ্নের ঘোর কেটে যায় মহীতোষের। নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়, মনে হয় একান্তভাবে ব্রতচ্যুত, যোগভ্রষ্ট। শেষপর্যন্ত এই দাঁড়াল! ছাব্বিশে জানুয়ারির সংকল্প ভুলে গিয়ে পাহাড়ি মেয়ের সঙ্গে বনে বনে প্রেম করে বেড়াচ্ছে সে?
দু-হাতে মাথাটা টিপে ধরে মহীতোষ। নাঃ, আর নয়। এ কোন জালে দিনের পর দিন জড়িয়ে পড়ছে সে? স্বাধীনতার সৈনিক, শৃঙ্খলিত ভারতবর্ষের কান্নায় কন্যাকুমারী থেকে গৌরীশেখরের তুহিন-শৃঙ্গ অবধি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। একী মোহ তার! এইভাবেই কি সে তার কর্তব্য পালন করছে?
বিকাল থেকে রাত নটা পর্যন্ত পচাইলোভী কুলি আর পাহাড়িদের আড্ডা বসে কুলবীরের দোকানে। কাঠের পা নিয়ে কুলবীর একা সব দেখাশোনা করতে পারে না। শিউকুমারী কাজের সহায়তা করে তার। মৃদু হাসির সঙ্গে ক্রেতার দিকে এগিয়ে দেয় পচাইয়ের ভাঁড়। মনে রং লাগে— নেশার রং, শিউকুমারীর চোখের রং। ভুল করে খরিদ্দারেরা বেশি পয়সা দিয়ে ফেলে।
আর সেই সময়ে কুলবীরের একটা ঢোলা হাফ প্যান্ট পড়ে ঘরের পিছনে একটা চৌপাইয়ের উপরে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে মহীতোষ। এই সময়টা তাকে অজ্ঞাতবাস করতে হয়। কুলিরা আসে, কুলিদের সর্দার আসে, ফরেস্ট অফিসের দু-চার জন আধাবাবুরও পদপাত ঘটে। ওখানে থেকে হইচই শোনা যায়, হুল্লোড় শোনা যায়, দুর্বোধ্য গানের কলি শোনা যায়। উন্মত্ত হাসিতে কুলবীরের ছোটো ঝোপড়াটা যেন থরথর করে কেঁপে ওঠে। আর সব কিছুর ভিতর দিয়ে একটা তরল তীক্ষ্ণ হাসি বিচ্ছুরিত হয়ে পড়ে—শিউকুমারী হাসছে।
মোহ কাটাতে চায় মহীতোষ। কিন্তু মোহ কি সত্যিই কাটে? শিউকুমারী হাসছে—পাহাড়ি মেয়ে পচাই বিক্রির খরিদ্দারদের খুশি করবার জন্যে তার অভ্যস্ত হাসি হাসছে। তাতে মহীতোষের কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু সত্যিই কি ক্ষতি নেই? তাহলে বুকের মধ্যে জ্বালা কেন, কেন মনে হয় শিউকুমারী তাকে ঠকাচ্ছে?
বনজ্যোত্সা শেষ হয়ে গেছে, এসেছে অমাবস্যা—আরণ্যক তমসা। অন্ধকারের মধ্যে মহীতোষ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে, ঝাঁকে ঝাঁকে মশা এসে ঘেঁকে ধরে তাকে। বুকের মধ্যে অসহায় কান্নার রোল ওঠে—অরবিন্দ, অরবিন্দ। এমন সময়ে তাকে ফেলে কোথায় চলে গেল অরবিন্দ?
নিজে চলে যাবে? এখুনি চলে যাবে এই কালো অন্ধকারে-ঘেরা শালবনের ভেতর দিয়ে, বালিমাখা জলঢাকার তীক্ষ্ণধারা পার হয়ে? কিন্তু মন তাতেও উৎসাহ পায় না। কে যেন তার সমস্ত শক্তি নিঃশেষে কেড়ে নিয়েছে। একা চলে যেতে ভয় করে, ভয় করে আবার কোনো একটা নতুন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে। জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়িদের এই ছোটো ঘরেই কি সে চিরতরে বাঁধা পড়ে গেল, হারিয়ে ফেলল পথ চলার ক্ষমতা? অরবিন্দ, এ সময়ে যদি অরবিন্দ থাকত…
কুলবীরের দোকানে কলরব ক্রমশ কমে আসছে। শিউকুমারীর হাসির আওয়াজ আর শোনা যায় না। শুধু মাঝে মাঝে ঠুন ঠুন করে মিষ্টি শব্দ। কাঠের বাক্সের উপর বাজিয়ে বাজিয়ে পয়সা গুণছে কুলবীর।
হঠাৎ কেরোসিনের টেমির আলো এসে মুখে পড়ে মহীতোষের। প্রদীপ হাতে বনরাজ্যের মালবিকা। চোখে সকৌতুক দৃষ্টি, চলো বাঙালিবাবু, ঘরে চলো। ওরা পালিয়েছে।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো মহীতোষ উঠে পড়ে। ঠিক প্রথম দিনটির মতোই হাত বাড়িয়ে দেয় শিউকুমারী, এসো, এসো।
