থাকার অনুমতি মিলল, কিন্তু মহীতোষ ভাবতে লাগল, থাকা কি সত্যিই সম্ভব। পাহাড়িদের ছোটো ছোটো কুঁড়েঘর—ঝোপড়া। দড়ির খাঁটিয়া। পচাইয়ের উগ্র দুর্গন্ধ। চারদিকে নীল জঙ্গল সমস্ত পৃথিবীকে দৃষ্টির আড়ালে সরিয়ে রেখে কারাগারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের প্রকান্ড বিক্ষুব্ধ জগৎটাতে ইতিহাসের দ্রুত আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কী-যে ঘটে চলেছে তা এখান থেকে জানবার বা অনুমান করবারও উপায় নেই। একি আশ্রয়, না আন্দামানে নির্বাসন?
শিউকুমারী এগিয়ে এল। পাহাড়ি মেয়ের সহজ নিঃসংশয়তায় একখানা হাত রাখল মহীতোষের কাঁধের উপর। বললে, বাঙালিবাবু কী ভাবছ?
মহীতোষ অন্যমনস্কভাবে বললে, কই, কিছুই তো ভাবছি না।
না, কিছুই ভাবতে হবে না। কোনো ভয় নেই তোমার, অংরেজ এখানে তোমাকে খুঁজে পাবে না।
মহীতোষ ম্লান হাসল, ঠিক জান তুমি?
জানি বই কী! কিন্তু এখানে থাকতে হলে তো বসে বসে ভাবলে চলবে না, কাজ করতে হবে। চলো, জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে আনি।
একটা-কিছু করবার সুযোগ পেয়ে যেন হালকা হয়ে গেল অনিশ্চিত অস্বস্তির বোঝাটা। মহীতোষ উঠে দাঁড়াল, বললে, চলো।
শালবনের পথ। নীচের দিকটা দাবানলে জ্বলে গেছে এখানে-ওখানে। শাল-শিশুরা আগুনে পুড়ে গিয়ে কালো কালো কতকগুলো খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে। কিন্তু আগুনে পুড়েছে বলেই ওরা মরবে না। এ হচ্ছে ওদের জীবনীশক্তির প্রথম পরীক্ষা, ভাবীকালে বনস্পতি হওয়ার গৌরব লাভ করবার পথে প্রথম অগ্নি-অভিষেক। তিন-চার বছর দাবানল ওদের ডাল-পাতা পুড়িয়ে নির্জীব করে দেবে, কিন্তু তার পরেই অগ্নি উপাসক ঋত্বিকের মতো নির্দাহন শক্তি লাভ করবে ওরা। দিনের পর দিন বড়ো হয়ে উঠবে, ঋজু হয়ে উঠবে, নিজেদের বিস্তীর্ণ করে দেবে ডুয়ার্স থেকে টেরাই পর্যন্ত।
ডালে ডালে পাখি—চেনা-অচেনা, নানা জাতের, নানা রঙের। ময়ূর আর বনমুরগির ছুটোছুটি। চকিতের জন্যে দেখা দিয়েই বিদ্যুতের মতো মিলিয়ে যায় হরিণের পাল। এখান ওখান দিয়ে ঝোরার জল। দু-পাশে সবুজ ঘনবিন্যস্ত ঝোপ, বড়ো বড়ো ঘাস, অসংখ্য বুনো ফুল। পায়ে পায়ে ভুইচাঁপার বেগুনি মঞ্জুরি।
কাঠ আর শুকনো পাতা কুড়িয়ে চলেছে দুজনে। বেশ লাগছে মহীতোষের। জীবনের রূপটা যে এত বিচিত্র, এমন মনোরম, একথা আগে কি কখনো কল্পনা করতে পারত মহীতোষ? কিন্তু আর নুয়ে নুয়ে খড়ি কুড়োতে পারা যায় না। পিঠটা টনটন করছে।
শিউকুমারী ডাকল, বাঙালিবাবু?
মহীতোষ চোখ তুলে তাকাল, কী বলছ?
হাঁপিয়ে গেছ তুমি। এসব কাজ কি তোমাদের পোষায়? এসো, জিরিয়ে নিই।
একটা শাল গাছের গোড়ায় শুকনো পাতার স্কুপের উপরে বসল দুজনে। নীল ঠাণ্ডা ছায়া। খসখসে শালের পাতায় বাতাসের শিরশিরানি। ঘুঘু ডাকছে। ভুইচাঁপার ওপরে উড়ে বসছে নানা রঙের বুনো প্রজাপতি। গাছের ডালে ডালে বানর লাফিয়ে চলে যাচ্ছে। শান্ত সুন্দর ঘুমন্ত অরণ্য। হিংস্র রাত্রির অবসানে জানোয়ারেরা হয়তো ঝোপ আর ঘাসবনের ভেতরে নিশ্চিন্ত নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে এখন।
শিউকুমারী আস্তে আস্তে বললে, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাঙালিবাবু?
মহীতোষ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, না, কষ্ট আর কীসের?
কষ্ট নয়? দেশ-গাঁ ছেড়ে কোথায় এসে পড়েছ। এখানে জঙ্গল, আমরা জংলা মানুষ। এ তো তোমার ভালো লাগবার কথা নয়।
মহীতোষ মৃদু হাসল, কিন্তু ইংরেজের জেলের চাইতে অনেক ভালো নিশ্চয়ই।
তা সত্যিই।
শিউকুমারীর মনটা হঠাৎ ভাবাতুর হয়ে উঠল। শুধু এইটুকুই ভালো? ইংরেজের জেলের চাইতে অনেক ভালো? তার চাইতে আরও কিছু ভালো নেই কি এখানে? জঙ্গলের শান্ত স্নিগ্ধ ছায়া। হাওয়ায় ঝরে-পড়া শালের ফুল। রাত্রিতে মাতাল-করা বনজ্যোৎস্না। জলঢাকার কলরোল। কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনার মুকুট। দূরের পাহাড়ে পাথর-কাটা পথের ওপর যখন জংলা কলার পাতা হাওয়ায় কাঁপে, জানোয়ারের পায়ে লেগে গড়িয়ে-পড়া পাথরের শব্দে মনে হয় দূরবাসী পিতম ঘোড়া ছুটিয়ে অভিসারে আসছে, তখন শিউকুমারীর ইচ্ছে করে…।
কিন্তু শিউকুমারীর যে-ইচ্ছে করে সে-ইচ্ছে মহীতোষের নয়। শৃঙ্খলিত ভারতবর্ষ। ছাব্বিশে জানুয়ারি। কারাপ্রাচীরের অন্তরালে রাত্রির তপস্যা। আগস্ট আন্দোলন—ডু অর ডাই। সেই জগৎ থেকে, সেই আন্দোলিত আবর্তিত বিপুল জীবন থেকে কোথায় ছিটকে পড়ল সে? বিক্ষুব্ধ বোম্বাই, উন্মত্ত কলকাতা। পথে পথে বন্দেমাতরম, লাঠি, বন্দুক, রক্ত, আইন। চোখের সামনে ছায়াছবির মতো ঘুরে যায় সমস্ত। সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেই গর্জিত সমুদ্রের তরঙ্গে আফ্রিকার বনভূমির শিলাসৈকতের মতো জীবনের একটা অজ্ঞাত তটে নিক্ষিপ্ত হয়েই পড়ে থাকবে সে? আকাশে যেখানে ঘূর্ণিত নক্ষত্রমালায় আর জ্বলন্ত নীহারিকায় ভাঙা গড়ার প্রলয় চলছে, সেখান থেকে কক্ষভ্রষ্ট হয়ে মৃত্যুসমুদ্রের মধ্যে তলিয়ে থাকবে নিবে যাওয়া উল্কা?
মহীতোষ বললে, দয়া করে আশ্রয় দিয়েছ তোমরা। ঋণ কী করে শোধ হবে জানি না।
দয়ার ঋণ আমরা শোধ নিই না বাঙালিবাবু। শিউকুমারীর গলার স্বর তীক্ষ্ণহয়ে উঠল, সে আমাদের নিয়ম নয়। কিন্তু চলো, বেলা উঠে গেল।
খোঁচা খেয়ে মহীতোষ আশ্চর্য হয়ে গেল। এ আকস্মিক তীক্ষ্ণতার অর্থ কী? ডুয়ার্সের জঙ্গলের মতোই জংলি মেয়ের চরিত্র বোঝবার চেষ্টা করা বৃথা।
