রাত বাড়ছে। জঙ্গলের আড়ালে চাঁদ উঠে আসছে মাথার ওপর। কোথা থেকে চিৎকার করছে হায়না। কুলিরা একে একে উঠে পড়ল সবাই, সাঁওতাল কুলিদের মাদলের শব্দ আর জড়িত গানের সুর ক্রমে মিলিয়ে এল দূরে। হঠাৎ কুলবীরের খেয়াল হল মেয়ে শিউকুমারী এখনও ফেরেনি। নদীতে জল আনতে গিয়েছিল, তারপর…
কুলবীরের মনটা চমকে উঠল। জানোয়ারের পাল্লায় পড়েনি তো? ঝকঝকে ভোজালিখানা খাপে পুরে নিয়ে সবে বেরিয়ে পড়তে যাবে এমনসময় এল শিউকুমারী। একা নয়, কাঁধে ভর দিয়ে আসছে মহীতোষ। আর আসছে বললেই কথাটা ঠিক হয় না, শিউকুমারী বয়ে আনছে
কুলবীর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। ছোটো ছোটো মঙ্গোলিয়ান চোখ দুটো বিস্ফারিত করে অস্ফুট গলায় বললে, একী?
ঠোঁটে আঙুল দিয়ে শিউকুমারী বললে, চুপ। একে কিছু খেতে দিয়ে এখন শোবার ব্যবস্থা করে দাও বাবা। যা শোনবার শুনো সকালে।
কুলবীরের একটা পা কাঠে তৈরি। ১৯১৪ সালের লড়াইফেরত লোক সে। ফ্ল্যাণ্ডার্স, কামানের গর্জন—ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। শেলের টুকরোতে বাঁ-পাখানা হয়তো উড়ে গিয়ে ইংলিশ চ্যানেলেই আশ্রয় নিয়েছে।
যুদ্ধ থামল, কুলবীর ফিরে এল দেশে। ভুটান সরকার কিছু কিছু জমিজমা দিলে রাজভক্তির পুরস্কার। কিন্তু সেই জমি নিয়েই শেষপর্যন্ত বাঁধল নানা গন্ডগোল। বুড়ো কুলবীরের এসব ঝামেলা ভালো লাগল না। একদিন সকালে দুটো টাট্টুঘোড়ার পিঠে সব চাপিয়ে দিয়ে ভুটানের পাহাড় ডিঙিয়ে জলঢাকার হিমশীতল তীক্ষ্ণধারা পার হয়ে সে চলে এল ডুয়ার্সের জঙ্গলে।
তারপর দিন কেটে চলেছে। ভালোেয়-মন্দে, ছোটো-বড়ো সুখ-দুঃখে। সাত বছরের মেয়ে শিউকুমারীর বয়স এখন উনিশ। দিনের পর দিন শক্তিহীন হয়ে পড়ছে কুলবীর, অথর্ব হয়ে পড়ছে। একটা পায়ের অভাবে বুনো ঘোড়ার মতো তেজিয়ান শরীরেও শিথিলতার সঞ্চার হয়েছে খানিকটা। অনেকটা এই কারণেই এতদিন পর্যন্ত বিয়ে হয়নি শিউকুমারীর। বুড়ো বয়সে কুলবীরের অন্ধের যষ্টি।
রাত্রির অন্ধকারে দেখা যায়নি, এখন প্রথম সূর্যের আলোয় দিগন্তে দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালি চুড়ো। শালবনকে অত ঘনবিন্যস্ত বলে বোধ হচ্ছে না। পাহাড়ের রেখাটা গাঢ় নীলিমা দিয়ে আঁকা, রাশি রাশি কুঞ্চিত লোমের মতো ঘন জঙ্গল তার সর্বাঙ্গে বিস্তৃত হয়ে আছে।
হুঁকো হাতে নিয়ে দড়ির খাঁটিয়ায় বসে মহীতোষের ইতিহাস সবটা শুনল কুলবীর। চাপা তামাটে মুখোনার ওপর দিয়ে সংশয়ের নিবিড় ছায়া ছড়িয়ে পড়ল।
এখানে কেমন করে তোমাকে থাকতে দেব বাবু? ইংরেজের মুলুক। আমার দেশ ভুটান হলে তো কথা ছিল না, কিন্তু এখানে…
পচাইয়ের একটা হাঁড়ি নিয়ে শিউকুমারী বেরিয়ে এল বাইরে। বনজ্যোৎস্নায় যাকে অপরূপ স্বপ্নময়ী বলে মনে হয়েছিল, দিনের উজ্জ্বল আলোয় দেখা গেল ততটা সুন্দরী সে নয়। খর্ব নাসিকা, ছোটো ছোটো চোখ। পরনের উড়ানিটার রং ময়লা। ফর্সা মুখোনার ওপরে স্বাভাবিক অযত্নের একটা মলিন রেখা পড়েছে, গলার খাঁজে কালো হয়ে জমে আছে ময়লা। অপগতক্লান্তি সুস্থ শিক্ষিত মহীতোষের যেন স্বপ্নভঙ্গ হয়ে গেল। নিতান্ত সাধারণ, নিতান্তই পথেঘাটে দেখা পাহাড়ি মেয়ে। বনজ্যোৎস্না আর সোনালি অজগরের মতো খরধারা নদীর পটভূমিতে আলোর পাখায় যে ভর দিয়ে নেমে এসেছিল, সে যেন নিতান্তই অন্য লোক।
মহীতোষ কোনো জবাব দিলে না কুলবীরের কথায়, জবাবটা দিলে শিউকুমারী। বললে, না বাবা, বাঙালিবাবুকে কটা দিন রাখতেই হবে। এখন এখান থেকে বেরোলেই অংরেজ ধরে নেবে ওকে। তুমি তো স্বাধীন ভুটিয়া, স্বাধীন বাঙালিকে আশ্রয় দিতে আপত্তি করছ। কেন?
এবার চমকাবার পালা মহীতোষের। আশ্চর্য! এমন একটা কথা এই নোংরা পাহাড়ি মেয়েটা বলতে পারল কী করে? একি স্বাধীন পাহাড়ি রক্তের থেকে স্বতোৎসারিত অথবা এই আরণ্যক উন্মুক্ত পৃথিবীর প্রভাব? মহীতোষ তাকিয়ে রইল শিউকুমারীর দিকে। সুগঠিত দেহ, লালিত্যের চাইতে দৃঢ়তা বেশি। ছোটো ছোটো চোখ দুটোতে শানিত দৃষ্টি। কানে রুপোর দুটো প্রকান্ড আভরণ-বাঙালি মেয়ের নরম কান হলে ছিঁড়ে নেমে পড়ত। এক লহমায় মনে হল ভুটানের স্বাধীন সৈনিকের জন্ম দেওয়ার অধিকারিণী বীর মাতাই বটে।
কিন্তু কথাটা কুলবীরের মনে ধরেছে। স্বাধীন জাত, প্রতিদিন বিদেশি শৃঙ্খলের অপমান বয়ে বেড়াতে হয় না। তা ছাড়া নিজে লড়াই করেছে কাদামাখা বোমাবিধ্বস্ত ট্রেঞ্চে, ফাটা শেলের ফুলঝুরিতে, রাশি রাশি বুলেটের মধ্যে, বেয়নেটের ধারালো ফলায়। সৈনিকের মর্যাদা সে বোঝে। আর তা ছাড়া মহীতোষও সৈনিক বই কী। স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করে যে, সে-ই তো সৈনিক।
কুলবীর চিন্তিত মুখে হুঁকোয় টান দিয়ে বললে, আচ্ছা, থাকো। এখন কোনো ভয় নেই, এবেলা লোকজনের আমদানি হয় না জঙ্গলে। কিন্তু বিকালে চা-বাগান থেকে সব আসে, তাদের সামনে পড়লে বিপদ হতে পারে।
শিউকুমারী বললে, সে তোমাকে ভাবতে হবে না বাবা, আমি ঠিক করে নেব।
মহীতোষ কৃতজ্ঞ গাঢ়চোখে এক বার তাকালে শিউকুমারীর আনন্দিত উজ্জ্বল মুখের দিকে। অস্পষ্ট গলায় বললে, তোমার দয়া থাপাজি।
না না, দয়া আর কীসের। এসেছ, থাকো দু-দিন। কুলবীর অল্প একটু হাসল, তারপর কাঠের পায়ে খট খট করে ঘরের ভেতরে চলে গেল। আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু সংশয় কাটছে না।
