মেরুদন্ডের মধ্যে ঠাণ্ডা স্রোতটা বরফ হয়ে গেছে চিন্ময়ের। কনকনে শীতে দাঁতগুলো ঝনঝন করে উঠছে। চিন্ময় অস্পষ্ট গলায় বললে, তারা কোথায়?
নীচে নেমেছে প্রায় তিন ঘণ্টা আগে। সঙ্গে ফ্লাস্ক ছিল। এখন মনে হচ্ছে মদ ছিল তাতে। পায়ে একটা ব্যথার জন্যে আমি নামতে পারিনি, আপাতত বেঁচে গেছি ওদের হাত থেকে। কিন্তু আজ না হোক কাল আছে, কালের পর পরশু আছে, ওরা তা জানে।
বন্দনা উঠে দাঁড়াল। চিন্ময় বন্দনার দিকে তাকাল কিন্তু মুখটা দেখতে পেল না। হঠাৎ যেন ওর মাথাটা মুছে গেছে। সামনে দাঁড়িয়ে একটা মুন্ডহীন শরীর, একটা বীভৎস কবন্ধ।
আকস্মিক অর্থহীন ভয়ে তীব্র চিৎকার করলে চিন্ময়। সেই চিৎকারে বন্দনা চমকে পিছিয়ে গেল, সেখান থেকে পিছলে পড়ল দু-হাত দূরে, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আবার টলে পড়তে গেল সেখানে যেখানে একরাশ ফেনিল জল সোজা নীচের বিপুল শূন্যতায় ঝাঁপ দিয়েছে।
চকিতে দৃষ্টিটা স্বচ্ছ হয়ে গেছে চিন্ময়ের, রক্তের মধ্যে হঠাৎ বরফ-গলানো সূর্য জ্বলে উঠেছে।
মুহূর্তের জন্যে শুনল প্রপাতের রাক্ষসগর্জন, দেখতে পেল বন্দনার চোখে-মুখে মৃত্যুর আসন্নতা।
প্রাণপণ শক্তিতে দু-হাত বাড়িয়ে অনিবার্য রসাতল থেতে বন্দনাকে টেনে আনল চিন্ময়। প্রায় মূৰ্ছিত বন্দনাকে বুকের মধ্যে আশ্রয় দিয়ে বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলতে ফেলতে বললে, আপনি আমার সঙ্গেই কলকাতায় ফিরে যাবেন। আজকেই।
ফার্সী গল্পের এক টুকরো
–সেকালে নবাব বাদশাহেরা খুশি হলেই কবিদের এক-আধটা ঘোড়া-টোড়া উপহার দিতেন। আর ঘোড়া পেলে খুব সম্মান বোধ করতেন কবিরাও।
কবি আনোয়ারী ছিলেন বিখ্যাত ফার্সী কবি। সুলতান সঞ্চুর ছিলেন খুব গুণগ্রাহী আরআনোয়ারীকে বিশেষ পছন্দ করতেন তিনি।
সুলতান একবার হুকুম দিলেন, আনোয়ারীকে এই কবিতার জন্যে একটা ঘোড়া দেওয়া হোক। হুকুম তামিল হল সঙ্গে সঙ্গেই।
হুকুম তো তামিল হল। আর যে ঘোড়া কবিকে দেওয়া হল, অনেকদিন সেটার যত্ন হয়নি, সুলতানের আস্তাবলে ভালো করে দানাপানিও পায়নি। সে-বেচারা কবির বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতেই
কী ঘটল একটু পরে বলছি।
পরদিন সুলতান দেখেন, কবি হেঁটেই সভায় হাজির।
কই হে, ঘোড়া কী হল?
আজ্ঞে সেটায় চড়া আমার কর্ম নয়।
কেন?
হুজুর, যেরকম তার বেগ, তাতে পৃথিবীর কোনও মানুষ তার পিঠে চাপতে পারে না।
সে কী হে! সুলতান আশ্চর্য হয়ে গেলেন : আমিও পারব না?
আজ্ঞে না।
সুলতান চটে গেলেন : আমার আস্তাবলের ঘোড়া, আমি চাপতে পারব না? গোস্তাকি তো কম নয় তোমার।
আনোয়ারী বললেন, তা হলে শুনুন হুজুর :
কে দেখেছে এমন ঘোড়া–গজনী থেকে গৌড়ে,
মর্ত্য থেকে স্বর্গে গেল একটি রাতের দৌড়ে!
অর্থাৎ কবির বাড়িতে পৌঁছে একরাত্রেই ঘোড়াটা পটল তুলেছিলে। তখন সুলতানের কী হল, বুঝতেই পারো।
বনজ্যোৎস্না
জঙ্গলের মধ্যে জ্যোৎস্না পড়েছে।
দু-পাশে নিবিড় শালের বন। কিন্তু নিবিড় হলেও পত্ৰাচ্ছাদন লতা-গুল্মে জটিল নয়, পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিয়েছে পূর্ণিমার চাঁদ। আলো-আঁধারির মায়ায় অপরূপ হয়ে আছে অরণ্য।
সরু পায়ে-চলার পথ দিয়ে শিউকুমারী এগিয়ে চলেছিল। কাঁখের কলসি দেহের ললিত ছন্দে দোল খাচ্ছে, শুকনো শালের পাতা পায়ের নীচে যেন আনন্দে গান গেয়ে উঠছে। এই সন্ধ্যায় একা জঙ্গলের পথ নিরাপদ নয়। বাঘ আছে, ভালুক আছে, হাতি আছে, নীলগাই আছে, বরা আছে—কী নেই এই বিশাল অরণ্যে? তবু শিউকুমারীর ভয় করে না। তা ছাড়া ডুয়ার্সের বাঘ নিতান্তই বৈষ্ণব, পারতপক্ষে তারা মানুষের গায়ে থাবা তোলে না, এমনই একটা জনশ্রুতিতেও এদেশের লোক প্রগাঢ়ভাবে আস্থাবান।
বনের মধ্য দিয়ে একা চলেছে শিউকুমারী। গায়ের রুপোর গয়নায় জ্যোৎস্নার ঝিলিক। জঙ্গলের বুকে একটা গভীর ক্ষতচিহ্নের মতো বিসর্পিত রেখায় ঝোরার জল যেখানে বয়ে গেছে সেখানকার ঘনবিন্যস্ত ঝোপের ভেতর থেকে উঠছে বুনো ফুলের গন্ধ। জ্যোৎস্নায় মাতাল হয়ে ডেকে চলেছে হরিয়াল। পূর্ণিমা রাত্রির মায়ায় তারও চোখ থেকে ঘুম দূর হয়ে গেছে। শুধু থেকে থেকে কোথায় তীব্রস্বরে চিৎকার করছে একটা ময়ূর-পাখা ঝটপট করছে, হয়তো বেকায়দায় পেয়ে কোথাও আক্রমণ করেছে শিশু একটা পাইথনকে। অকৃপণ পূর্ণিমা আর অনাবরণ সৌন্দর্যের মধ্যেও আরণ্যক আদিম হিংসা নিজেকে ভুলতে পারেনি। হরিয়ালের সুরে আর ময়ুরের ডাকে রুদ্র-মধুর ঐকতান বেজে চলেছে।
জঙ্গল শেষ হতেই খরখরে বালি। পলিমাটির নরম কোমলতা নয়, মুক্তাচূর্ণের মতো মিহি মখমল মসৃণ বালিও নয়, চূর্ণ পাথরের টুকরো এখানে কাঁকরের মতো ধারালো। ভরা বর্ষায় জলঢাকা যে-সমস্ত পাথরের চাঙড় হিমালয়ের বুক থেকে নামিয়ে নিয়ে এসেছিল, অতিকায় কতকগুলো কচ্ছপের মতো তারা সেই বিশাল বালিবিস্তারের উপরে ছড়িয়ে পড়ে আছে।
ওপারে ভুটানের কালো পাহাড়। আর তলা দিয়ে ছেদহীন অনন্ত অরণ্য ডুয়ার্স থেকে টেরাই। দুর্গমতার ওপারে প্রতিরোধের তর্জনী। দেবতাত্মা নাগাধিরাজের অলঙ্ঘ্য প্রাকার। আলোয়-ধোয়া আকাশের নীচে পৃথিবীর বুক-ঠেলে-ওঠা কালো বিদ্রোহ আর সামনে পাহাড়ি নদী জলঢাকা।
কতটুকু নদী, কতটুকুই-বা জল— বুক পর্যন্তও ডুববে কি না সন্দেহ। দেখে মনে হয় পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায়। কিন্তু ওই মনে হওয়া পর্যন্তই—শুধু হেঁটে কেন, নৌকাতেও পার হওয়া চলে না। ঘণ্টায় ত্রিশ মাইল বেগে দুর্দান্ত স্রোতে জল নেমে চলেছে—পাহাড় থেকে সমতলে, সমতল থেকে সমুদ্রে। স্বপ্ন থেকে হঠাৎ জাগা নিঝরের বজ্রগর্জন। জলের তলায় তলায় ঠেলে নিয়ে চলেছে বেলেপাথর আর গ্র্যানাইটের জগদ্দল স্থূপ। নীচে পাথরে পাথরে সংঘর্ষ, ওপরে খরখরে বালি ভেঙে জলের হুংকার। এতটুকু নদীর কলরোল এক মাইল দূর থেকেও কানে আসে।
