জ্যোৎস্নায় ঝলসে যাচ্ছে জলঢাকা। শান্ত ঘুমন্ত আলোর বাঁকা তলোয়ার নয়—পাহাড়িরা যাকে সোনালি অজগর বলে এ যেন ঠিক তাই। ক্ষুধার্ত সোনালি অজগরের মতো গর্জন করে এঁকেবেঁকে ছুটে চলেছে—যেন মুখ থেকে ছিটকে পালিয়ে-যাওয়া শিকারের সন্ধানে তার অভিযান।
কাঁখে কলসি নিয়ে শিউকুমারী স্থির হয়ে দাঁড়াল খানিকক্ষণ। পিছনে অরণ্য, ওপারে অরণ্য আর পাহাড়, মাঝখানে নদী, আকাশে চাঁদ।
ভারি খুশি লাগছে মনটা। আনন্দে গান গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করছে। এমনই জ্যোৎস্না রাতেই তো পিতমের আসবার কথা। পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে নেমেছে উতরাইয়ের পথ। দু-ধারে শালের বন হাওয়ায় কাঁপছে। পাহাড়ি ঝাউয়ের একটানা সোঁ সোঁ শব্দ। জংলি কলার পাতাগুলো কাঁপছে—কাঁপছে জ্যোৎস্নার রং মেখে। আর সেই পথ বেয়ে নামছে ঘোড়া, নেমে আসছে ঘোড়সওয়ার। খট খট খটাখট। বুকের রক্তে মাতলামির দোলা লেগেছে, সমস্ত শিরা-স্নায়ু চকিত হয়ে উঠেছে অধীর এবং উদগ্রীব প্রতীক্ষায়। পিতম আসছে অভিসারে।
একটা গানের কলি গুনগুন করে দু-পা এগিয়ে আসতে-না-আসতেই আবার শিউকুমারীকে থেমে পড়তে হল। আকাশের চাঁদে আর মায়াময় পৃথিবীতে মিলে বনজ্যোৎস্নার যে অপূর্ব সুর বাজছিল—হঠাৎ সে-সুর কেটে গেছে। ভয়ে আর আশঙ্কায় সমস্ত শরীর ছমছম করে উঠল।
জলের ধারে সাদামতো ওটা কী পড়ে আছে! পাথর? না, পাথর নয়। বিকালেও শিউকুমারী ওখানে গা ধুয়ে গেছে, তখন তো ওটা ছিল না। আর এতটুকু সময়ের মধ্যে অত বড়ো একখানা পাথর তো আর হাওয়ার মুখে উড়ে আসেনি। তাহলে?
নিশ্চয় মানুষ। কিন্তু মানুষ এল কী করে? কেউ খুন করেছে নাকি? জানোয়ারে মেরে দিয়েছে? দুটোই সম্ভব। ননরেগুলেটেড এরিয়া—আইনের বন্ধন এখানে শিথিল। অরণ্যরাজ্যে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করে আরণ্যক মানুষেরাই, সেজন্যে তাদের সদর আদালতে ছুটে যেতে হয় না। আর সন্ধ্যা বেলায় দু-চারটে জানোয়ারের জলের কাছে আনাগোনাও খুবই সম্ভব। বিশেষ করে ভালুকের আমদানিটা এ তল্লাটে এমনিতেই একটু বেশি।
কয়েক মুহূর্ত শিউকুমারী দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী করবে? এগিয়ে যাবে ওখানে? কে জানে কোনো অনিশ্চিত বিপদ ওখানে প্রতীক্ষা করে আছে কি না। এই জঙ্গল আর জনহীন নদীর ধারে—এখানে বিপদ-আপদ এলে সে কী করতে পারে।
কিন্তু ইতস্তত করে লাভ নেই, দেখাই যাক-না। ভুটানি মেয়ের নির্ভীক নিঃসংশয় মন আত্মস্ত হয়ে উঠল ক্রমশ। ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে গেল সে।
মানুষই বটে, কিন্তু বিদেশি—বাঙালি। জলের ধারে নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে। ভালুকে খায়নি, তাহলে চোখ-নাক নিশ্চয় আস্ত থাকত না। গায়ে কোথাও রক্তের দাগ নেই, ক্ষতচিহ্ন নেই কোনোখানে। কাপড়টা গোছানোই আছে, সাদা জামাটার সোনার বোতামগুলো আলোতে ঝিকিয়ে উঠছে। আর, আর কী আশ্চর্য—মানুষটা মরেনি! সমস্ত শরীরে ঢেউয়ের মতো দোলা দিয়ে বড়ো বড়ো নিশ্বাস উঠছে তার, নিশ্বাস পড়ছে। কোনো কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছে। নিশ্চয়।
তারপরে আর ভাবতে হল না শিউকুমারীকে। কলসি ভরে সে জলঢাকার জ্যোৎস্নায়-গলা তুহিন-শীতল জল নিয়ে এল, সস্নেহে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল লোকটার পাশে। মুখে-চোখে জল ছিটিয়ে একটুখানি উড়ানির হাওয়া দিতেই অজ্ঞান মানুষের দীর্ঘায়ত ক্লান্ত নিশ্বাস ক্রমশ সহজ আর স্বাভাবিক হয়ে আসতে লাগল। আরও খানিক পরে চোখ মেলল মহীতোষ। বিহব্বল অর্থহীন দৃষ্টি। সমস্ত চিন্তা যেন মস্তিষ্কের মধ্যে অস্পষ্ট নীহারিকার মতো দ্রুত লয়ে আবর্তিত হয়ে চলেছে। খন্ড খন্ড, ছিন্ন ছিন্ন। রূপ নেই, আকার নেই, অর্থসঙ্গতি নেই।
আরও জোরে জোরে হাওয়া দিতে লাগল শিউকুমারী। আরও বেশি করে ছিটিয়ে দিলে জল। জলঢাকার বরফগলা স্পর্শে মরামানুষ চমকে উঠতে পারে, আর মহীতোষ তো অজ্ঞান হয়ে পড়েছে মাত্র। আস্তে আস্তে মহীতোষ উঠে বসল।
সামনে তরুণী নারী। উদবিগ্ন ব্যাকুল দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার কালো চোখে জ্যোৎস্না, সুন্দর মুখোনাতে জ্যোৎস্না, কর্ণাভরণে জ্যোৎস্না। পাশ দিয়ে তীব্র কলরোলে বয়ে যাচ্ছে জলঢাকা। পুলিশ নয়, পিছনে ছুটে-আসা শত্রুও নয়। গতিশীল, ভয়ত্ৰস্ত উদ্ৰান্ত জীবনের সমস্ত চঞ্চলতা যেন এখানে এসে স্থির আর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আকাশ থেকে স্বপ্নের পাখায় ভর দিয়ে কি পরি এসে নেমেছে তার পাশে? অপরিসীম ক্লান্তি আর অবসাদে কি শেষপর্যন্ত মরে গেছে মহীতোষ! আর মৃত্যুর পরে পৌঁছে গেছে একটা আশ্চর্য জগতে!
মর্মরশুভ্রা বিদেশিনি তরুণী। মূর্তির মতো অপলক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে তার দিকে। বিস্ময় আর জিজ্ঞাসা একসঙ্গেই সে-দৃষ্টির মধ্যে কথা কয়ে উঠেছে। কিন্তু মর্মরমূর্তি নয়, পরি নয়, মানুষই বটে।
মহীতোষ বললে, আমি কোথায়?
হিন্দি-মেশানো বাংলায় জবাব দিলে মেয়েটি, নদীর ধারে।
নদীর ধারে! মহীতোষের মনে পড়ে গেল— পালিয়ে আসছিল সে আর অরবিন্দ। শালবনের মধ্যে অরবিন্দ কোথায় হারিয়ে গেল, তার আর সন্ধান মিলল না। কিন্তু দাঁড়াবার সময় নেই, প্রতীক্ষা করবার উপায় নেই। পালাও, পালাও, আরও জোরে পালিয়ে চলো। আগের দিন কিছু খাওয়া হয়নি, সারা রাতের মধ্যে চোখ বুজবার উপায় ছিল না একটি বারও। খিদে-তেষ্টায় সমস্ত শরীরটা অসাড় আর শিথিল হয়ে গেছে। তারপর ছুটতে ছুটতে সামনে পড়ল জল। পিপাসার্ত পশুর মতো সেদিকে ছুটে এল মহীতোষ। তার পরে আর কিছু মনে পড়ে না।
