হুড্রতে যখন গাড়ি পৌঁছুল তখন মনটা যেন দশ বছর পেছিয়ে গেছে ওদের।
ব্যোমকেশ বললে, হাউ লাভলি!
অমল বললে, দূর, একা একা এ ভালো লাগে না এখানে। সঙ্গে ফিয়াঁসি না থাকলে কেমন ফিকে ফিকে লাগে যেন।
ব্যোমকেশ পাইপটা গালের একপাশে ঠেলে দিলে। তারপর চোখের একটা ভঙ্গি করে বলল, দেয়ার ইজ এ চান্স ফর ইউ। পারো তো পিক-আপ করে নাও-না।
চিন্ময় আর অমল তাকিয়ে দেখল। ছোটো-বড়ো পাথরের মধ্যে দিয়ে টাল খেতে খেতে সুবর্ণরেখার রুপালি জল যেখানে এসে নীচের শূন্যতায় ঝাঁপ দিয়েছে, ঠিক প্রায় তারই কাছাকাছি নিথর হয়ে বসে আছে একটি মেয়ে। মগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে ওধারের কালো পাহাড় আর কালো জঙ্গলের দিকে।
চিন্ময়ের পা দুটো যেন পাথরের মতো আটকে গেল। তৎক্ষণাৎ আবছা স্বরে চিন্ময় বললে, বন্দনা! বন্দনা!
ব্যোমকেশের মুখ থেকে টপ করে পাইপটা নীচে পড়ে গেল, যেন সামনে সাপে ফণা তুলেছে এমনিভাবে লাফিয়ে উঠল অমল।
পাইপটা কুড়িয়ে নিয়ে ব্যোমকেশ বললে, চল, আলাপ করি।
এতক্ষণের খুশিটা দপ করে নিবে গেছে একটা দমকা হাওয়ায়। আবার দপ দপ করছে। কপালের রগগুলো। দু-বছর আগেকার চাঁদপাল ঘাটের সন্ধ্যাটা ফিরে এসেছে, ডান হাতে ছটফট করছে সেই বন্য হিংস্র শক্তিটা।
ভুল হয়ে গিয়েছিল, সেদিন অত সহজেই ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল না বন্দনাকে। অনেক নিদ্রাহীন রাত্রে দুঃসহ অন্তজ্বালায় সেকথা ভেবেছে চিন্ময়, মনে হয়েছে একটা নিষ্ঠুর কঠিন কিছু তার করা উচিত ছিল সেদিন। শক্ত মুখে চিন্ময় বললে, না।
পুরোনো আলাপটা ঝালিয়ে নিবি না? অমল হাসল, আবার পাত্রী দেখতে এসেছিস, সে-খবরটা দিবিনে ওকে?
দরকার নেই। চল নীচে নামি।
বন্ধুরা কিছু-একটা বুঝল, রসিকতা করতে গিয়ে সেদিনের বলাইদার মতোই থমকে গেল ব্যোমকেশ। নামতে শুরু করল তিন জন।
কিন্তু হাত কয়েক নেমেই থমকে দাঁড়াল চিন্ময়।
তোরা ঘুরে আয়। আমি উপরেই রইলাম।
ব্যোমকেশ আর অমল মুখ চাওয়াচাওয়ি করল এক বার। নেমে গেল নিঃশব্দে।
চিন্ময় যখন ফিরে এল, তখনও সেইভাবেই মগ্ন হয়ে বসে আছে বন্দনা যেন স্বপ্ন দেখছে। পায়ে পায়ে চিন্ময় এগিয়ে গেল।
শুনুন?
হুড্রুর তীব্র গর্জনের মধ্যেও ডাকটা শুনতে পেল বন্দনা। ফিরে তাকাল চিন্ময়ের দিকে।
চিনতে পারেন? কঠিন মুখে আবার প্রশ্ন করল চিন্ময়।
পারি বই কী। বন্দনা শ্রান্ত হাসি হাসল, আপনি ভোলবার নন। কিন্তু এখানে আপনাকে আশা করতে পারিনি।
বিনা নিমন্ত্রণেই পাশের পাথরটার উপর বসে পড়ল চিন্ময়। বললে, রাঁচিতে মেয়ে দেখতে এসেছিলাম। চমৎকার পাত্রী। তা ছাড়া এবার আর ডুপলিকেটের ভয় নেই।
নেই নাকি? বন্দনা তেমনি ক্লান্তভাবে হাসল, যাক, খুশি হলাম। চিন্ময় আশ্চর্য হল। কথাটার একটা প্রতিক্রিয়া আশা করেছিল, ভেবেছিল অন্তত এক বারের জন্যেও চকিত হয়ে উঠবে বন্দনা, অন্তত অপমানের এক ঝলক রক্তের উচ্ছাস ফুটে উঠবে গালে। কিন্তু কিছুই ঘটল না। একখন্ড পাথরের মতোই নিরুত্তাপ বন্দনা।
কেমন যেন কুঁকড়ে গেল চিন্ময়, হঠাৎ অত্যন্ত ইতর মনে হল নিজেকে। একটা ঢোঁক গিলে বললে, আপনি এখানে যে?
বন্দনা বললে, দুটি পাতালের সঙ্গী জুটিয়েছি, পালিয়েছি তাদের সঙ্গে। বলছে বম্বেতে নিয়ে গিয়ে ফিলমে নামাবে। আপাতত দেখছি রাঁচিতে এনে হাজির করেছে, তারপরে কোথায় নিয়ে যাবে জানি না।
মাথার উপর একটা শক্ত পাথর দিয়ে যেন ঘা মারল কেউ। আকস্মিক যন্ত্রণায় বিবর্ণ হয়ে গেলচিন্ময়, পাগল হয়ে গেছেন আপনি? সেদিন যেকথা বন্দনা জিজ্ঞাসা করেছিল, আজ ঠিক সেই প্রশ্নই বেরিয়ে এল চিন্ময়ের মুখ দিয়ে।
একটা ছোটো নুড়ি তুলে নিয়ে একরাশ ফেনিল জলের মধ্যে ছুড়ে দিলে বন্দনা।
কী করব বলুন? বাবা কালো, মা কুৎসিত, হঠাৎ কোত্থেকে জন্ম হল আমার!
বন্দনার মুখটা বিকৃত হয়ে গেল, বাবা কদর্য সন্দেহ করলেন মাকে। সে-সন্দেহ আরও বীভৎস হয়ে উঠল যখন পর পর ছায়া আর কমলা জন্মাল বাবার ঠিকে মিল দিয়ে। শেষপর্যন্ত মাকে আত্মহত্যাই করতে হল, আর বাবা তাঁর সমস্ত প্রতিশোধ নিলেন আমার উপর। লেখাপড়া শেখালেন না, যারা দু-একজন আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, জঘন্য অশ্লীল চিঠি লিখে ভাংচি দিলেন তাদের। তারপর থেকে বাবার দুটি খাঁটি কন্যার জন্যে আমাকে সিটিং দিতে হয়েছে। ছায়া, কমলা দুজনকেই পার করেছেন বাবা। যদিও ছায়ার স্বামী দু-দিন পরেই ছায়াকে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে, তবু তো কন্যাদায় উদ্ধার হয়েচে ওঁর!
চিন্ময় স্থবিরের মতো বসে রইল। রক্তে যে-উত্তাপ জেগেছিল, তার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই আর, এখন মেরুদন্ড দিয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত বইছে, একটা তীব্র আকস্মিক শীতে জমে যেতে চাইছে আঙুলগুলো।
লেখাপড়া শিখিনি, তবু একটা প্রাইমারি স্কুলে অ আ ক খ-র চাকরি জুটিয়েছিলাম। বাবার একখানা বেনামি চিঠিতেই সে-চাকরি গেল। ফিলমে নামতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কনে দেখার আড়ষ্ট ভূমিকাটাই অভ্যেস আছে—চলল না। নার্স হতে গেলাম, সেখানেও বাবা কী মন্ত্র পড়লেন তাড়িয়ে দিলে আমাকে। শুধু অধঃপাতের দরজাই দরাজ ছিল সবসময়ে, কিন্তু মা-র যন্ত্রণাভরা মুখ ভুলতে পারিনি তখনও। কিন্তু আর থাকা গেল না। মা বেঁচে থাকতেই বাবা নতুন সংসার করেছিলেন, দ্বিতীয় পক্ষের ট্যারা মেয়ে কেয়া পনেরোয় পা দিয়েছে, আবার আমায় কেয়ার পার্ট শুরু করতে হবে। তাই পাড়ার দুটো নামকরা ছেলের সঙ্গেই পালাতে হল শেষপর্যন্ত।
