দাঁতে দাঁত চেপে খানিক নিথর হয়ে রইল চিন্ময়। হঠাৎ নিজের ডান হাতে একটা বন্য বর্বর শক্তি যেন অনুভব করল সে। ম্লান আলোয় এক ফোঁটা শিশিরের মতো পোখরাজের আংটিটা জ্বলছে বন্দনার আঙুলে, ইচ্ছে করলে ওই আঙুলটাসুদ্ধ বন্দনার ছোটো মুঠোটাকে এক্ষুনি সে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলতে পারে।
হিংস্র কিছু না করে কেবল কপালের ঘামই মুছে ফেলল চিন্ময়। শুকনোভাবে জিজ্ঞাসা করলে, কিন্তু আপনি কেন একাজ করতে গেলেন? আপনি কি ওঁদের আত্মীয়া?
প্রশ্নটার জন্যে বন্দনা অপেক্ষা করছিল। আবার ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো
দেখা গেল না, তারা অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেছে।
সেকথা থাক। নাই-বা শুনলেন।
অভিনয় করেছিলেন, ভালোই করেছিলেন। চিন্ময় বিষাদহাসি হাসল, কিন্তু একথাগুলো কেন বলতে এলেন আমাকে? এটুকু অনুগ্রহ করার কী দরকার ছিল?
আকস্মিকভাবে উঠে দাঁড়াল বন্দনা।
আজ আমি যাই চিন্ময়বাবু। আবার সর্বাঙ্গে সেই ক্রুদ্ধ হিংস্রতার বিদ্যুৎ বয়ে গেল চিন্ময়ের। দাঁড়িয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গেই।
জবাব দিলেন না?
কী হবে জবাব দিয়ে? আপনি বুঝবেন না। যাবার জন্যে পা বাড়াল বন্দনা। চিন্ময়ের অবাধ্য হাতটা এবারে আর শাসন মানল না। নগ্ন নির্লজ্জ ক্রোধে বন্দনার মুঠোটা চেপে ধরল মুহূর্তের মধ্যে। থরথর করে বন্দনা কেঁপে উঠল এক বার, তারপরেই পাথর হয়ে গেল।
কী করছেন আপনি? পাগল হয়ে গেলেন? হাত ছেড়ে দিল চিন্ময়, কিন্তু তার চোখ দুটো বুনো জন্তুর মতো জ্বলছে তখন।
চুলোয় যাক ছায়া, অধঃপাতে যাক। আপনি আমায় বিয়ে করতে পারেন?
এর জন্যেও কি প্রতীক্ষা করেছিল বন্দনা? সে-ই জানে। অত্যন্ত সহজ স্বাভাবিক স্বরে বললে, আমি কে, আমার কী পরিচয়, আপনি জানেন?
জানবার দরকার নেই। বিয়ে করবেন আমাকে?
কোথা থেকে চলন্ত স্টিমারের একটা দীর্ঘ রশ্মি এসে ছড়িয়ে পড়ল বন্দনার মুখে। সেই ভোরের তারার মতো ম্লান আচ্ছন্ন তার চোখ, ঠোঁটের কোণে সেই বিষণ্ণতার মায়া-মাখানো। বন্দনা আস্তে আস্তে বললে, না।
হাওড়ার ব্রিজ একটা তারার বল্লমের মতো গঙ্গার এপার-ওপারকে গেঁথে রেখেছে। জাহাজ দুটো দাঁড়িয়ে আছে অবাস্তব ফ্যান্টাসির মতো। দু-দিকের এত আলোর ভিতরে গঙ্গার জলটা কী অবিশ্বাস্য রকমের কালো!
চিন্ময় বললে, আচ্ছা আপনি যান। যে-উপকারটুকু করলেন, অনেক ধন্যবাদ সেজন্যে।
তবু যাওয়ার আগে বন্দনা আরও কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে রইল। কী-একটা বলতে গিয়ে বার কয়েক কাঁপতে লাগল তার ঠোঁট।
আশা করি, রমাপ্রসাদবাবুকে…
আমি জানি, বন্দনার উপস্থিতি এবার অসহ্য মনে হতে লাগল চিন্ময়ের, আপনাকে বলতে হবে না। আপনি যান।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বন্দনা। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চিন্ময় এবার ধপ করে হিমশীতল একটা পাইপের উপরেই বসে পড়ল। সারাদিনের উত্তেজনার টানটা ছিঁড়ে গেছে, শরীরে একটা গুরুভার অবসাদ নেমে এসেছে। ভূতুড়ে জাহাজ দুটোর দিকে বিমর্ষ দৃষ্টি ফেলে বসে রইল সে, পাইপের মুখ থেকে ঝিরঝির করে জল নেমে এসে তার জুতোর তলাটা একটু একটু করে ভিজিয়ে দিতে লাগল।
দু-বছর পরে আবার মেয়ে দেখতে যেতে হল চিন্ময়কে, মুনসেফির নমিনেশন পাওয়ার পরে। এবার রাঁচিতে। কিন্তু জাল-জুয়াচুরির কোনো ভয় ছিল না। মেয়ের বাপ বড়োদরের সরকারি চাকুরে। হাজারিবাগ রোডে প্রকান্ড বাংলো। হাল আমলের ড্রয়িং রুমে অত্যন্ত নিঃসংকোচভাবেই মুখোমুখি এসে দাঁড়াল সুন্দরী শিক্ষিতা মেয়েটি। টি-পট থেকে চা ঢেলে দিলে চিন্ময়ের পেয়ালায়, রাঁচির আবহাওয়া নিয়ে গল্প করল, গান শোনাল অর্গান বাজিয়ে।
এবার বলাইদা নয়, অন্য দুটি বন্ধু ছিল সঙ্গে।
বাইরে বেরিয়ে লঘু ঈর্ষাভরা গলায় ব্যোমকেশ বলল, তুই ভাগ্যবান রে!
চিন্ময় মৃদু হাসল, তাই মনে হচ্ছে আপাতত। তবে শেষপর্যন্ত জাল না হলেই বাঁচা যায়।
বন্ধুরা ভেঙে পড়ল অট্টহাসিতে, সেই বন্দনা? না না, এবার আর সে-ভাবনা নেই।
চাঁদপাল ঘাটের সেই সন্ধ্যাটা সহজে ভুলতে পারা যায়নি। একটি সূক্ষ্ম বেদনা থেকে থেকে মনের মধ্যে বেজে উঠত, তার হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্যে গল্পটা বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিলে চিন্ময়। ক্রমেই ব্যাপারটা কৌতুকের রূপ নিলে।
চেনা-জানা কেউ কনে দেখতে গেলেই একজন আরেকজনকে সাবধান করে দেয়, জাল কি না ভালো করে যাচাই করে নিয়ে হে। সব মেয়েই তো বন্দনা নয় যে আগ বাড়িয়ে এসে উপকার করে যাবে।
খুশিতে চঞ্চল হয়ে এগিয়ে চলল তিন জন। ফাল্গুন মাসের চমৎকার সকাল। মিষ্টি ঠাণ্ডা, মিষ্টি রোদ। ঝিলমিল পাতা আর পাখির ডাক।
অমল বললে, কথা তো একরকম দিয়েই এলি দেখছি।
একটা সিগারেট ধরিয়ে চিন্ময় বললে, কী আর করা যায়? মা আলটিমেটাম দিয়েছেন। আসছে বৈশাখ মাসের মধ্যে বিয়ে না করলে তীর্থযাত্রায় বেরুবেন। সে যাক, আজই ফিরবি নাকি কলকাতায়?
ব্যোমকেশ গালের পাশ থেকে পাইপটা বের করে আনল, এত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? থেকে যাই আর একটা দিন। চল, আজ বেরিয়ে আসি হুড্র থেকে।
হুড্র? বার দশেক দেখেছি, পুরোনো হয়ে গেছে।
ব্যোমকেশ বললে, ইডিয়ট! হুড্র কখনো পুরোনো হয় না। ওর যে কী-একটা আশ্চর্য সৌন্দর্য আছে, যখনই দেখি, তখনি মনে হয় এভারনিউ! চল, গাড়ির জোগাড় করি।
খাওয়া-দাওয়ার পর তিন জনে বেরুল ট্যাক্সি নিয়ে।
