পলাশ গাছের ওপর সোনাঝুরি রোদ লাল হয়ে এল। নদীর মাঝখানে গর্তটা একেবারে বুজে গেছে। একটুখানি বালিজল তিরতির করছে সেখানে। গরম হাওয়ায় কোত্থেকে একটা শুকনো পাতা উড়ে এসে মানিক সর্দারের গায়ে পড়ল, মনে হল কার একটা খরখরে কর্কশ হাতের ছোঁয়া এসে লেগেছে। চমকে উঠল মানিক সর্দার, বল্লমে ভর করে উঠে দাঁড়াল।
বলাই!
আসছি বাবা।
বলাই ফিরে এল। শুধু লাটা নয়, গিলেও পেয়েছে গোটা কয়েক।
চল বাপ, দু-কোশ রাস্তা আছে এখনও।
দু-ক্রোশ রাস্তা লাঠি নিয়ে তিন লাফে পেরিয়ে যেত একসময়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে। গোটা শুশুনিয়া পাহাড়টাই যেন ডিঙিয়ে যেতে হবে তাকে। বুকে হাত চেপে কখন যে পথের মাঝখানে বসে পড়বে সেকথা সে নিজেই জানে না।
তার ওপর সামনে জঙ্গলটা আছে। জায়গা ভালো নয়। চোর-ডাকাতের ভয় মানিক সর্দারের নেই, তার কাছে তারা আসবে না। কিন্তু ওই জঙ্গলে প্রায়ই বুনো জানোয়ার বেরোয়। ভালুক আসে, লক্কড় ঘোরে, দু-একটা বাঘেরও খবর মেলে। লোকের মুখে শুনেছিল, কাছাকাছি কোথায় একটা চিতা নাকি মানুষখেকো হয়ে উঠেছে।
সেইজন্যেই বল্লমটা আনা। কিন্তু কতখানি কাজে লাগবে! পিঠের ওপরে সেই প্রকান্ড একটা নিষ্ঠুর চাপ, হাঁটু দুটো নড়বড় করছে ক্রমাগত। এই বল্লম নিয়ে কী করবে মানিক সর্দার? বাঘ যদি সত্যিই আসে, সে কি এ দিয়ে ঠেকাতে পারবে তাকে?
কোঁচরের ভেতরে লাটা আর গিলেগুলোকে ঝমঝম করতে করতে বলাই আসছিল। হঠাৎ তীক্ষ্ণ মিষ্টি গলায় কলের গান থেকে শেখা গুনগুনানিকে সে হাওয়ায় ছড়িয়ে দিলে।
বিরক্ত হয়ে একটা ধমক দিতে গিয়েও থমকে গেল মানিক সর্দার। বেশ তো গায় ছেলেটা —সুন্দর সুরেলা গলা। একেবারে নিখুঁতভাবে তুলেছে কলের গান থেকে। যদি পৃথিবীটা এমন কঠিন জায়গা না হত—যদি বাঁচবার জন্যে এমন করে ফোঁটায় ফোঁটায় বুকের রক্ত শুকিয়ে না যেত, তাহলে…
ও বন্ধু রে–
সোনার খাটে বসো তুমি রুপার
খাটে পাও—
সোনার খাট–রুপোর খাট। আর এক বার গানটাকে থামিয়ে দিতে চাইল মানিক সর্দার, কিন্তু পারল না। একটু একটু করে সন্ধে নেমে-আসা মাঠের ওপর দিয়ে বলাইয়ের গান দূরান্তে ছড়িয়ে যেতে লাগল, আর হাতের বল্লমটার ওপর ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে চলতে লাগল মানিক সর্দার।
এখনও দু-ক্রোশ পথ পড়ে আছে সামনে। শুশুনিয়া পাহাড় ডিঙোনোর চাইতেও দুর্গম।
পুরোনো পেতলের মতো জ্যোৎস্নার রং। দু-পাশের গাছের পাতার ছায়া তার ভেতরে কলঙ্কের দাগের মতো কাঁপছে। হাওয়ায় হাওয়ায় কিশলয়ের গন্ধ। ভারি সুন্দর লাগছে জঙ্গলটাকে।
কিন্তু জঙ্গলের এই রূপ, কিশলয়ের সেই গন্ধকে ছাপিয়ে আর একটা গন্ধে হঠাৎ চকিত হয়ে উঠল মানিক সর্দার। সে-গন্ধ তার অচেনা নয়। এমনি বনের পথ দিয়ে যেতে যেতে কখনো কখনো এইরকম গন্ধের উৎকট উচ্ছ্বাস ভেসে এসেছে, আর…
শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মানিক সর্দার। এক হাতে তুলে ধরলে বল্লম, আর এক হাতে খপ করে চেপে ধরলে বলাইয়ের কাঁধটা।
কী হল বাবা?
চুপ! বাঘ!
বাঘ! এক বার শিউরে উঠেই পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বলাই। শিরশিরে হাওয়াটাও যেন আতঙ্কে নিশ্ৰুপ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। পুরোনো পেতলের মতো জ্যোৎস্নাটা ছায়ার কলঙ্ক মেখে কাঁপতে লাগল অল্প অল্প। মহুয়ার একটা ডাল এগিয়ে এসেছিল ওদের মাথার উপর, মনে হল মৃত্যুর কতকগুলো ধারালো নখ যেন ছোঁ মারবার জন্যে উদ্যত হয়ে রয়েছে।
কয়েক মুহূর্ত কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না কোথাও। থেকে থেকে ঝিঝি ডাকছিল এতক্ষণ, সেটাও থমকে গেছে আপাতত। শরীরের শিরাগুলোকে টানটান করে মানিক সর্দার
অপেক্ষা করতে লাগল।
বাবা চলো, আমরা দৌড়ে পালিয়ে যাই। শুকনো স্তিমিত গলা শোনা গেল বলাইয়ের।
পালাতে গেলেই পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে ঘাড়ের ওপর। তখন আর কিছু করা যাবে না।
আরও কিছুক্ষণ প্রতীক্ষায় কাটল। তারপর সতর্ক পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল ডান দিকের ঝোপের ভেতরে। বাঘও সুযোগের অপেক্ষা করছে। মানিকের হাতের বল্লমটা দেখেছে কি না কে জানে, কিন্তু হঠাৎ আক্রমণ করবার মতো সাহস পাচ্ছে না।
বলাইকে এক হাতে টেনে পিঠের দিকে সরিয়ে দিলে মানিক সর্দার। দুর্বল ক্লান্ত শরীরে কোথা থেকে একটা ভয়ংকর হিংস্র শক্তির জোয়ার এসেছে। বল্লম ধরা হাতের পেশি থরথর করে কাঁপছে, চোখ দুটো জ্বলে উঠছে দপ দপ করে। আবার বাতাস বইল, কিন্তু কিশলয়ের গন্ধ পাওয়া গেল না—ভেসে এল বাঘের গন্ধের বীভৎস ঝলক।
প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট প্রতীক্ষার পরে ডান দিকের ঝোপের ওপর সতর্ক চোখ রেখে একটু একটু করে এগোতে লাগল মানিক। এক হাতে বলাইকে টানতে লাগল পেছন পেছন। বাঘ যদি লাফিয়ে পড়ে তাহলে সোজা তাকে পড়তে হবে এই বল্লমের ওপরে। যদি দুটো-একটা থাবার আঁচড় লাগে, তাহলে সেটা তার ওপর দিয়েই যাবে, বলাইকে ছুঁতেও পারবে না।
একটু একটু করে দুজনে এগোতে লাগল। মানিকের চোখ আর বল্লম স্থির হয়ে রইল জঙ্গলের দিকে। বাঘই ভুল করেছে। গাছের ওপর থেকে যদি লাফ দিয়ে পড়ত, তাহলে কিছু আর করবার ছিল না। কিন্তু ডান দিকে এখন শুধুই ঝোপ, একটা গাছও নেই। আর গাছ থাকলেও আগে থেকেই সতর্ক হয়ে যাবে মানিক সর্দার।
ওরা আস্তে আস্তে এগোতে লাগল, আর তার সঙ্গে ঝোপের মধ্যেও চলল সতর্ক পদচারণা। পাতায় খস খস শব্দে বোঝা যাচ্ছিল বাঘও এগিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে।
