সেই ছায়া তাকে চিঠি লিখেছে। সেই মেয়েটি।
সেদিন ছায়ার মতোই পা জড়িয়ে জড়িয়ে ঢুকেছিল ঘরে। থেমে-যাওয়া সেতারের ঝংকারের মতো কী-একটা বয়ে এনেছিল নিজের সঙ্গে। সেই ছায়া কী কথা তাকে বলতে চায়। ফিকে নীল এক টুকরো কাগজে মাত্র তিনটি সংক্ষিপ্ত লাইনে কোনো আশ্চর্য সংবাদের সংকেত লুকিয়ে রয়েছে।
চিন্ময় উঠে বসল। সাড়ে তিনটে। বাইরে ক্ষুরের ফলা রোদ এখনও। রাস্তায় হাঁপিয়ে চলা ট্রাম-বাসের ম্যারাথন রেস। ফুটপাথ ঘেঁষে পড়ে থাকা পিচ-জ্বালানো কদাকার গাড়িটা থেকে উগ্র বিস্বাদ গন্ধ। ওপাশের বাড়িটার তেতলার কার্নিশে একটা দুঃসাহসী সাদা-কালো বেড়ালের থাবা চেটে চেটে প্রসাধনের চেষ্টা।
চিন্ময় থাকতে পারল না। জামা চড়িয়ে, চটিটা পায়ে টেনে আবার নেমে এল রাস্তায়। উঠে পড়ল চৌরঙ্গির ট্রামে। আর এক বার ইচ্ছে হল পকেট থেকে চিঠিখানা বের করে পড়ে নেয়; কিন্তু দরকার ছিল না, নির্ভুলভাবে লেখাটা মুখস্থ হয়ে গেছে।
চৌরঙ্গির একটা চায়ের দোকানে খানিকটা সময় কাটল। আরও খানিক সময় কাটল বইয়ের স্টলে এলোমেলো পাতা উলটে। তারপর ডালহৌসি স্কোয়ার হয়ে পায়ে হেঁটে চাঁদপাল ঘাটের কাছে যখন পৌঁছুল, তখন সাড়ে পাঁচটার কাছাকাছি।
আরও–আরও আধ ঘণ্টা।
রেললাইনের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দেখল নোঙর-ফেলা নিথর জাহাজগুলোকে। দেখল গঙ্গার স্রোতে ভেসে গাংশালিকের খেলা আর ফেরি-লঞ্চের আনাগোনা। তারপর হাতের ঘড়িতে যখন ছ-টা বাজতে দশ মিনিট, তখন এসে দাঁড়াল ট্রামস্টপের সামনে। এতক্ষণে মাথার দু ধারে রগ দুটো আবার দপ দপ করতে শুরু হয়েছে, হাতের নাড়িতে আবার উত্তেজিত জ্বরের স্পন্দন।
ছায়া এল ছ-টার তিন মিনিট আগেই।
চিন্ময় ভেবেছিল, হয়তো চিনতে পারবে না। হয়তো আভাসের মতো যাকে দেখেছে, এই মুহূর্তে তাকে সম্পূর্ণ অপরিচিত বলে মনে হবে। আর ছায়াই কি দেখেছে তাকে? তার দিকে চোখ তুলেই কি তাকিয়েছে একটি বারের জন্যেও?
তবু দুজনেই দুজনকে চিনতে পারল সঙ্গে সঙ্গেই। সংকোচ নেই, দ্বিধা নেই, জড়তা নেই। আশ্চর্য স্বাভাবিক গলায় ছায়া বললে, অনেকক্ষণ এসেছেন?
হার স্বীকার করল না চিন্ময়। মিথ্যে কথাই বললে।
মিনিট পাঁচেক।
কোনো কাজের ক্ষতি হয়নি আপনার?
না, কিছু না।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ছায়া। সেই পুরোনো ঘরটার মতোই আলো-অন্ধকার এখানে। আরও নিবিড়, আরও সংকেতিত। খানিকটা চেনা যায়, অনেকটা চেনা যায় না। উত্তেজনায় টানটান স্নায়ু। প্রত্যেকটা মুহূর্ত খরমুখ। চিন্ময় সইতে পারল না।
কেন ডেকেছিলেন আমাকে? ছায়া মুখ তুলল। আধবোজা চোখ মেলে ভালো করে তাকাল কি না বোঝা গেল না।
চলুন, বসি কোথাও।
ইডেন গার্ডেনে?
ঘাটের জেটিতেই চলুন। চিন্ময় বুঝল। একেবারে একান্ত হতে চায় না। ইডেন গার্ডেনের ঘন ঘাসের নির্জনতায় নয়, এক-আধজন কাছাকাছি থাকুক, নিভৃতির ভিতরেও থাকুক লৌকিক সৌজন্য।
তাই চলুন তবে।
বেঞ্চিগুলোতে জায়গা ছিল না। জেটির বাঁ-দিকে নীচু পন্টুনের উপর যেখানে জোড়া অজগরের মতো দুটো জলের পাইপ এসে নেমেছে, পায়ে পায়ে দুজনে এগিয়ে গেল সেখানেই।
এখানে কোথায় বসবেন? চিন্ময় প্রশ্ন করল।
কাঠের উপরেই বসা যাক। খানিক দূরে নোঙর ফেলা দুটো জাহাজের ভূতুড়ে গম্ভীর মূর্তির দিকে তাকিয়ে ছায়া বললে, আপনার অসুবিধে হবে না?
না।
দুজনে বসল। এপারে আলো, ওপারে আলো, মাঝখানে কালো গঙ্গা। ডান দিকে অনেক দূরে হাওড়া ব্রিজের বৈদ্যুতিক সরলরেখা। যেন একটা তারার বল্লম দিয়ে এপার-ওপার গেঁথে রেখেছে কেউ।
ছায়াই শুরু করল, এবং বিনা ভূমিকাতেই।
ক্ষমা করবেন। আমার নাম ছায়া নয়।
চিন্ময় চমকে উঠল। যেন কথাটা শুনতেই পায়নি, কী বলছেন?
আমার নাম ছায়া নয়, বন্দনা।
নির্বোধের মতো কিছুক্ষণ চেয়ে রইল চিন্ময়। বললে, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
বন্দনা আস্তে আস্তে বললে, বোঝাটা কিছু শক্ত নয়। আপনি ছায়াকে দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ছায়া কালো, ছায়া কুৎসিত। তার কপালে একটা ধবলের দাগ। তাই ছায়ার ভূমিকায় আমাকেই অভিনয় করতে হয়েছে।
গঙ্গার কালো জলে একটা স্টিমারের কর্কশ বাঁশি বাজল, কয়েকটা লাল-নীল আলো ভেসে চলল কাঁপতে কাঁপতে। চিন্ময়ের মনে হল পন্টুনটাও কাঁপছে তার সঙ্গে সঙ্গে, দুলছে। ওপারের আলোগুলো, হাওড়া ব্রিজের তারার বল্লমটা থেকে থেকে বেঁকে যাচ্ছে ধনুকের মতো।
একটা অস্ফুট শব্দ করল চিন্ময়।
গল্পের মতো মনে হচ্ছে, তাই না? বন্দনার গলাটা যেন গঙ্গার ওপার থেকে শুনতে পেলচিন্ময়। আমাকে দেখিয়ে ওঁরা ছায়ার সঙ্গে আপনার বিয়ের ব্যবস্থা করছিলেন।
চিন্ময় নড়ে উঠল।
আপনি ঠাট্টা করছেন তো?
ঠাট্টা করবার মতো পরিচয় কি আপনার সঙ্গে আছে আমার? শীতল নিষ্প্রাণ স্বরে বন্দনা জবাব দিলে।
সত্যিই, সে-পরিচয় নয় বন্দনার সঙ্গে। মাত্র পনেরো মিনিটের জন্যে দেখেছিল। তাও কয়েক বার চোরের মতো তাকিয়েছিল সভয়ে। না, বন্দনা ঠাট্টা করছে না।
গঙ্গার ঠাণ্ডা হাওয়াতেও চিন্ময় ঘামতে লাগল।
কিন্তু বিয়ের সময়ই তো ধরা পড়বে সব। তখন যদি…
উঠে আসেন বাসর থেকে? চিন্ময়ের কথাটা বন্দনাই কুড়িয়ে নিলে, পাড়ার ছেলেদের আপনি চেনেননি চিন্ময়বাবু। আপনি কি আশা করেন যে, কন্যাদায়গ্রস্ত ভদ্রলোককে বিপদে ফেলে আপনি পালিয়ে আসবেন আর তারা আদর করে একখানা ট্যাক্সি ডেকে দেবে আপনাকে?
