চার দিন আগে রবিবারে ছুটি ছিল। সকাল বেলা নিশ্চিন্ত মনে খবরের কাগজটা পড়বার
সময়ে এক বার এসে হানা দিয়েছিল বলাইদা।
এই, ভালো চা আর গরম জিলিপি আনা এক ঠোঙা।
তা আনাচ্ছি। কিন্তু হঠাৎ পাড়ার রোয়াকের মায়া ছেড়ে এখানে এসে জুটলে যে?
কী করব? চিন্ময়ের সিগারেটের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে বলাইদা বললে, কাল রাত্রেও রমাপ্রসাদবাবু এসেছিলেন। বললেন, তুমি আর এক বার ওকে মনে করিয়ে দিয়ে বলাই। একালের ছেলে, কখন আবার ভুলে যায়…
চিন্ময় হাসল, একালের ছেলেদের স্মৃতিশক্তির বালাই নেই এ ধারণা কী করে জন্মাল রমাপ্রসাদবাবুর? কিন্তু সত্যি বলাইদা, আমার কেমন উৎসাহ হচ্ছে না।
বলাইদা ভুরু কোঁচকাল, পাকামো হচ্ছে নাকি? আজ তিন মাস ধরে সারা কলকাতায় তোমার জন্যে মেয়ে দেখে বেড়াচ্ছি, আর এখন বলা হচ্ছে উৎসাহ পাচ্ছি না?
বিয়ে করতে আপত্তি নেই, কিন্তু মেয়ে দেখাটাই…
একটানে সিগারেটের আধখানা শেষ করলে বলাইদা, বুঝেছি, আর বলতে হবে না! অর্থাৎ এ-যুগে এরকম বর্বরতা আর সহ্য হয় না, একটি মেয়েকে গোরু-ছাগলের মতো ইত্যাদি, ইত্যাদি। ওসব লেকচার ছেড়ে দে। না দেখে একটা কালোকোলো হাবাগোবা মেয়ে বিয়ে করার ইচ্ছে থাকলে সেটা আগে বললেই হত। পাঁচ মিনিটে কনে জুটিয়ে দিতুম, এসব ঝকমারি আমাকে পোয়াতে হত না।
চিন্ময় বললে, না না, জীবে দয়া করবার ঔদার্য আমার নেই। শিক্ষিতা সুন্দরী স্ত্রী সবাই চায়—আমিও চাই। শুধু বলছিলুম, এভাবে মেয়ে দেখতে যাওয়াটা…
বলাইদা বললে, তুই একটা ছাগল। টুইশন করলি, ডজন খানেক স্কুল-কলেজের মেয়ে পড়ালি, তার মধ্যে একটা প্রেমট্রেমের ব্যবস্থা করে নিতে পারলিনে? তাহলে তো এসব ঝামেলা করতে হত না। নে, এখন চটপট চা আর জিলিপি আনতে দে। আর মনে রাখিস, ঠিক চারটের সময় আমি আসব, তুই জামাকাপড় পরে রেডি হয়ে থাকবি।
অতএব যেতেই হল চক্ৰবেড়েতে। ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক সাড়ে চারটেয়।
হলদে রঙের পুরোনো দোতলা বাড়ি। সামনে হাত পাঁচ-ছয় খানিকটা চতুষ্কোণ জমি, একটা জীর্ণ চেহারার ইউক্যালিপ্টাস একগুচ্ছ শীর্ণ পাতার অঞ্জলি তুলে বেমানানভাবে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। বাড়িটাকে আচমকা কেমন শ্রান্ত, কেমন অবসন্ন মনে হয়।
রমাপ্রসাদবাবু দাঁড়িয়ে ছিলেন। অভ্যর্থনা করে নিয়ে বসালেন বাইরের ঘরে। পুরোনো ফার্নিচার, পুরোনো ফোটো, বিলিতি তেল কোম্পানির রংচঙে ক্যালেণ্ডার, তক্তপোশের উপরে পাতা সুজনিটায় ইস্ত্রির মরচে-ধরা দাগ একটা। শুধু কোণভাঙা দুটো কাচের ফুলদানি থাকলেই যেন সম্পূর্ণ হত সবটা।
তারপর সেইরকম। সেই দরজার পর্দার ওপার থেকে কয়েকটি পা আর শাড়ির প্রান্ত, চুড়ির আওয়াজ আর চাপা ফিসফিসানি, একটি আট-ন বছরের মেয়ের পর্দা সরিয়ে এক বারের জন্যে মুখটি বাড়িয়ে দেওয়া, আর রমাপ্রসাদবাবুর একটানা বলে যাওয়া মেয়েটি আমার দেখতে-শুনতে ভালোই, রান্না-সেলাই সবই জানে, তবে লেখাপড়া বেশিদূর করেনি। ম্যাট্রিকের আগে টাইফয়েড হয়েছিল।
সব সেইরকম। সেই শিঙাড়া-লেডিকেনি-সন্দেশের খাবারের প্লেট। মেয়ে দেখতে এলে কী কী খাবার সাজিয়ে দিতে হয়, মিঠাইওয়ালাদের পর্যন্ত মুখস্থ আছে সেটা। সেইসঙ্গে সবিনয় অনুরোধ–না না, ও আর ফেলে রাখবে না, দুটি তো মিষ্টি, সামান্য ব্যবস্থা।
পুরোনো ফোটো, পুরোনো ফার্নিচার, পুরোনো ঘড়ির শব্দ আর পুরোনো সামাজিকতার ভিতরে চিন্ময় যখন ক্রমশই স্তিমিত হয়ে উঠছিল, তখন দু-হাতে দু-পেয়ালা চা নিয়ে ছায়া ঘরে ঢুকল। এ-পর্যন্ত সব জ্যামিতির নিয়মে চলছিল, কিন্তু ইউক্লিডের থিয়োরেম এইবার হোঁচট খেল একটা। এই ঘরে এমনি পুরোনো নীতিনিয়মের ভিতরে মেয়েটি এমন আকস্মিকভাবে দেখা দিল যে, চমকে উঠল চিন্ময়। যেন বটতলার রামায়ণের ভিতর থেকে হঠাৎ আবিষ্কার করা গেল অবনীন্দ্রনাথের একখানা ছবি।
কী ছিল মেয়েটির চেহারায়? চিন্ময় আজও সেকথা জানে না। ভোরের তারার মতো আলো-অন্ধকার জড়ানো চোখ, হালকা মেঘে-ছাওয়া জ্যোৎস্নার মতো শরীর, ঠোঁটের কোণে নিঃশব্দ কান্নার মতো কী-একটা মাখানো।
এক বার রমাপ্রসাদবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখল চিন্ময়। বাহুল্যহীন বেঁটেখাটো চেহারা, মোটা মোটা হাতের আঙুল, পলা-বসানো রুপোর আংটি একটা, মোটা নাকের তলায় সযত্নে কাঁচিছাঁটা গোঁফ। এঁরই মেয়ে! ঠিক বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না।
বলাইদা কী দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করল, ভালো করে শুনতেও পেল না চিন্ময়। মাত্র কয়েক পলক দেখার রঙে মনকে রাঙিয়ে নিয়ে বসে রইল স্বপ্নবিহ্বলের মতো।
দশ-পনেরো-বিশ মিনিট। বলাইদার বেসুরো গলায় ঘোর কেটে গেল। আজ আমরা তবে
আচ্ছন্নের মতো বেরিয়ে এল চিন্ময়। শুধু এক বারের জন্যে মাথা তুলে দেখল ইউক্যালিপ্টাস গাছটাকে। পড়ন্ত দিনের ছাইরং লালচে আকাশের দিকে একগুচ্ছ শীর্ণ পাতার অঞ্জলি। খেয়ালের মতো তার মনে হল, ওই গাছটার কী-যেন একটা মানে আছে। কিছু বোঝা যাচ্ছে, কিছুটা বোঝা যাচ্ছে না।
ট্যাক্সিতে উঠতে উঠতে বলাইদা বললে, কেমন দেখলি?
ভালো লাগল। আমি রাজি আছি।
হুঁ! বলাইদা এক বার তাকাল চিন্ময়ের চোখের দিকে, সেই পুরোনো নিয়মেই হয়তো কোনো একটা রসিকতা করতে চাইল, কিন্তু তারপরেই আর কথা খুঁজে পেল না। বলাইদাও কি ওই ইউক্যালিপ্টাস গাছটাকে দেখতে পেয়েছে? সেও কি একটা মানে বুঝতে চাইছে মনে মনে?
