পাঁচু নীরবে দেখছিল ব্যাপারটা। মন্দ হয়নি–পা টেপানোটা আদায় করা গেছে সুদে-আসলে। প্যাঁচাটার দিকে হাত বাড়িয়ে ডাকল : আয় আয় আত্মারাম–চুঃ–
প্যাঁচাটা উড়ে এসে তার হাতে বসল।
কিন্তু গুরুপুত্তুর কেন প্যাঁচাকে সামলাতে বলেছিলেন, তার উত্তর পাওয়া গেল পরদিন সকালে। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে তাঁর টিকিও দেখা গেল না। আর সেইসঙ্গে দেখা গেল না পিসিমার বাক্সের নগদ তিনশো টাকা, একরাশ বাসন আর পাঁচুগোপালের একজোড়া নতুন সিল্কের পাঞ্জাবি।
বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগলেন পিসিমা : হায় হায়। প্যাঁচাই ঠিক বুঝেছিল। কেন প্যাঁচাকে খাঁচায় বন্ধ করতে গেলাম! হায় হায়। প্যাঁচাই আমার ঘরের লক্ষ্মী, কেন প্যাঁচাকে আটকাতে বললাম!
এক বছর পরের কথা।
হাথরাস জংশন। ওয়েটিং রুমের এক প্রান্তে বসে মথুরার ট্রেনের প্রতীক্ষা করছিলেন পিসিমা আর পাঁচুগোপাল। তীর্থ করতে এসেছেন তাঁরা।
পাঁচুর হাতের ওপর প্যাঁচা ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে।
ওয়েটিং রুমের আর-এক পাশে দাড়িওয়ালা এক সাধুবাবা একদল গ্রাম্য লোককে উপদেশ দিচ্ছেন। কারও হাত দেখছেন, কাউকে তাবিজ দিচ্ছেন, কাউকে বিতরণ করছেন ধর্মোপদেশ। দুটি একটি করে টাকা জমছে পায়ের কাছে বেশ ব্যবসা ফেঁদেছেন সাধুবাবা।
কিন্তু কেমন যেন খটকা লাগছে পিসিমার। সাধুবাবার গলাটা যেন চেনা! কোথায় শুনেছেন?
কিছুতে মনে করতে পারলেন না।
কিন্তু প্যাঁচাটার মনে পড়ল।
ওয়েটিং রুমটার ওপর থেকে দিনের আলো নিবে গিয়ে যেই এল সন্ধ্যার অন্ধকার, অমনি গা ঝাড়া দিয়ে উঠল প্যাঁচাটা। চোখ দুটো দপদপ করে জ্বলে উঠল তার। তারপর হঠাৎ ফড়াৎ করে উড়ে গিয়ে প্রচণ্ড বেগে কয়েকটা ঠোকর মারল সাধুবাবার মাথার ওপর।
সাধু হাঁইমাই করে উঠলেন। হট্টগোলে ভরে গেল ওয়েটিং রুম। আর সেই গোলমালে সাধুরাবার নকল গোঁফদাড়ি খসে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল—গুরুপুত্তুর!
পুলিস এসে পড়ল। সাধুর ঝোলা থেকে বেরুল সিঁধকাঠি, সেইসঙ্গে একগাদা চোরাই মাল। দুজন শিষ্য সঙ্গে ছিল, তারাও ধরা পড়ল। জানা গেল, তারা এ অঞ্চলের দু’জন নামকরা দাগি চোর!
প্যাঁচা ততক্ষণে ভালো মানুষটির মতো পাঁচুগোপালের হাতে এসে বসেছে।
সম্প্রতি ইউ. পি. গভর্নমেন্ট ক্ষেমঙ্করী পিসিমাকে একখানা চিঠি দিয়েছেন। সে-চিঠিতে জানানো হয়েছে, তিনটে নামকরা চোরকে ধরিয়ে দেবার জন্যে পাঁচুগোপালের প্যাঁচাকে একটা সোনার মেডেল আর একবাক্স নেংটি ইঁদুর পুরস্কার দেওয়া হবে।
প্রপাত
সময় সেই সন্ধ্যা ছটায়, তবু ল কলেজের ক্লাসে দেড়টার পরে আর থাকতে পারল না চিন্ময়। মনে হচ্ছিল দপ দপ করছে রগের দু-পাশে, হাতের নাড়িতে মৃদু জ্বরের দ্রুতলয় উত্তেজনা। বসে ছিল ঠিক একটা পাখার নীচেই, তা সত্ত্বেও পাঞ্জাবির কাঁধটা ভিজে উঠেছিল ঘামে। শেষপর্যন্ত একেবারে প্রফেসারের চোখের সামনে দিয়েই বেরিয়ে এল সে।
উতরোল হাওয়া বইছে বাইরে ইউনিভার্সিটির লনে। মাথার একগুচ্ছ চুল হঠাৎ হঠাৎ উড়ে পড়ল চশমার উপর, কতগুলো বিসর্পিল কালো কালো রেখায় এক বারের জন্যে অস্বচ্ছ হয়ে গেল দৃষ্টি। কোনো দূর অরণ্যের ধ্বনির মতো মাথার উপরে শোনা গেল পত্ৰমর্মর। আশুতোষ মিউজিয়মের গায়ে দাঁড়-করানো বাসুদেবমূর্তিটা এক বার নড়ে উঠল যেন।
চোখের সামনে থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল চিন্ময়। মাথার উপরে পাতার শব্দে বুকপকেট থেকে খামখানাও যেন সাড়া দিয়ে উঠেছে। অথবা ভীরু একটা চাপা কণ্ঠস্বরের মতো শোনা যাচ্ছে তিনটে লাইন, যা বার বার পড়ে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে চিন্ময়ের।
আজ সন্ধে ছটায় চাঁদপাল ঘাটের ট্রাম-স্টপটার সামনে দয়া করে একটু দাঁড়াবেন। আমি আসব। দরকারি কথা আছে। ছায়া।
মনে মনে লাইন ক-টা গুঞ্জন করতে করতে চিন্ময় হাঁটতে লাগল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল এক বার। একটা পঁয়ত্রিশ। আরও প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা। কী করে কাটবে এতক্ষণ, কী করে এতখানি অসহ্য সময় পার হওয়া যাবে।
আপাতত মেস। অনেকক্ষণ চোখ বুজে বিছানায় পড়ে থাকা আর চুপ করে ভাবা, হঠাৎ ছায়া এ-চিঠি তাকে লিখতে গেল কেন?
সত্যি, কেন ছায়া এই চিঠি লিখল তাকে?
দুপুরের নির্জন নিঃশব্দ মেসে তিন তলার সিঙ্গল সিটেড ঘরে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চিন্ময় সেই কথাটাই ভাবতে চেষ্টা করল। এমন কী তার বলবার আছে যার জন্য চিন্ময়কে সে ডেকে পাঠিয়েছে সন্ধ্যা ছ-টার সময় চাঁদপাল ঘাটের ট্রাম-স্টপের সামনে?
সকালে চিঠিটা পাওয়ার পর থেকেই একটা তীক্ষ্ণ অস্বস্তিতে জর্জরিত হচ্ছে চিন্ময়। কী চায় ছায়া? মুক্তি? বলতে চায় আমার জীবনে আর একজন মানুষ অনেক দিন থেকে অপেক্ষা করে আছে, তাকে আমি কিছুতেই ভুলতে পারব না। বলবে বাংলাদেশে অনেক সুপাত্রী জুটবে আপনার জন্যে, শুধু আমায় দয়া করুন?
অথবা–
অথবা আর কী হতে পারে? চার দিন আগে মাত্র পনেরো মিনিটের জন্যে যার সঙ্গে পরিচয়, যার ছায়া-ছড়ানো করুণ মুখের আবছা আভাস মাত্র মনে করতে পারে চিন্ময়, যার হাতের আংটির পোখরাজ পাথরটা মাত্র বার কয়েকের জন্যে জ্বলজ্বল করে উঠেছিল আসন্ন সন্ধ্যার শান্ত আলোতে, সেই ছায়াসঙ্গিনীর মতো মেয়েটি কেন হঠাৎ এই প্রগলভ চিঠির আশ্রয় নিয়েছে?
