–কে আবার? দুনিয়ার অখাদ্যি জন্তু-পিসিমার প্রত্যুত্তর।
–না পিসিমা, তা নয়।–পাঁচু থিয়েটারি ভঙ্গিতে বলতে থাকে, তুমি কি জানো না পিসিমা, প্যাঁচা লক্ষ্মীর বাহন? যদি প্যাঁচাকে তাড়িয়ে দাও লক্ষ্মী এসে কোথায় বসবেন? বরং প্যাঁচা ঘরে থাকলে তার পিঠে চেপে থাকবেন–একদম অচলা। এমন সুযোগ হেলায় হারিয়ো না পিসিমা-সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলো না।
অকাট্য যুক্তি। খানিকক্ষণ মাথা চুলকে পিসিমা দেখলেন, এর প্রতিবাদ করা যাবে না। অগত্যা মনে মনে প্যাঁচার মৃত্যু কামনা করতে করতে পিসিমা ছাদে ঘুঁটে দিতে চললেন। পেছনে পাঁচু শিস দিয়ে প্যাঁচাকে শোনাতে লাগল : পড়ো বাবা আত্মারাম, নিতাই-গৌর রাধেশ্যাম
প্যাঁচা, পাঁচু ও পিসিমার এমনি দুঃখে সুখে যখন দিন কাটছিল, তখন ঘটনাস্থলে গুরুপুত্তুরের আবির্ভাব হল।
সাতপুরুষ আগে ক্ষেমঙ্করী পিসিমার কোন্ এক আত্মীয় গুরুপুত্তুরের কোন পূর্বপুরুষের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন। সেই সুবাদে বছরে একবার এই গুরুপুত্তুরদের আবির্ভাব হয়। দশটি টাকা, একজোড়া ধুতি আর পর্বত-প্রমাণ খাওয়া-দাওয়া করে তাঁরা বিদায় নেন। ক্ষেমঙ্করী পিসিমা মনে মনে বিরক্ত হন–কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না। হাজার হোক–গুরুর বংশ! তাকে চটানো মানেই গোখরো সাপের ল্যাজ দিয়ে কান চুলকোনো। কখন ফোঁস করে অভিসম্পাত দিয়ে বসবে, ব্যস তাহলেই সর্বনাশ।
সন্ধেবেলা দর্শন দিলেন গুরুপুত্তুর।
এর আগে যে বুড়ো আসতেন, এ তাঁর ছেলে। বুড়ো গুরু মানুষটি মোটের ওপর মন্দ ছিলেন না। গত বছর তিনি মারা গেছেন। তাই এবার তাঁর ছেলে এসেছে বার্ষিক প্রণামী আদায়ের ফিকিরে।
ছেলেটির চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, এক নম্বরের পাখোয়াজ। বছর আঠারো-উনিশ বয়স হবে। মাথায় টেরির কায়দাটি এমন নিপুণ যে, পাঁচুগোপালও লজ্জা পায়। নাকের নীচে বাটারফ্লাই গোঁফ, কানে সিগারেট গোঁজা।
এসেছে দিব্যি রসকলি কেটে। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ বলতে বলতে বাড়ি ঢুকল। যেন সাক্ষাৎ বৃন্দাবনের গোঁসাই।
গুরুপুত্তুরকে দেখেই ক্ষেমঙ্করী পিসিমার মেজাজ খিঁচড়ে গেছে। কিন্তু আর কী করেন, মহা সমাদরে বসালেন। হাজার হোক গুরুপুত্তুর। গোখরো সাপ না হোক তার ল্যাজ তো বটে।
গুরুপুত্তুর বয়সে পিসিমার চাইতে চল্লিশ বছরের ছোট। কিন্তু কী আসে যায়–গোখরোর ল্যাজ কিনা। কান থেকে সিগারেট নামিয়ে সেটাকে ধরাল, তারপর কায়দা করে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললে, কই হে ক্ষেমঙ্করী, এবার সেবার ব্যবস্থা করো।
পিসিমার পিত্তি জ্বলে গেল। তবু গলবস্ত্র হয়ে সবিনয়ে বললেন, কী সেবা হবে বাবা?
পোলাও আর পাঁঠার কালিয়া। যাও–চটপট। ভারি খিদে পেয়েছে।
পিসিমা বললেন, সে কী ঠাকুর! আপনি তো বোষ্টমের সন্তান। পাঁঠার কালিয়া খাবেন কী করে? আমি বরং কাঁচকলার কারি তৈরি করে দিচ্ছি
–ড্যাম ইয়োর কাঁচকলার কারি–তেড়ে উঠলেন গুরুপুত্ত্বর। ওসব কাঁচকলা-ফাঁচকলার মধ্যে আমি নেই। পাঁঠার কালিয়ায় একটু তুলসীপাতা ফেলে দিয়ো, তা হলে তা শুদ্ধ হয়ে যাবে–একদম মালসা-ভোগ। যাও, দেরি কোরো না। Hurry up!
‘হারি আপ’ শুনে হাঁড়ির মতো মুখ করে পিসিমা উঠে গেলেন। ইচ্ছে করছিল পাঁঠার নয়, মুড়ো ঝাঁটার কালিয়া খাইয়ে দেন। কিন্তু হাজার হোক
পাঁচুগোপাল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গুরুপুত্তুরের লীলা দেখছিল। এবার গুরুপুত্তুর তার দিকে মনোনিবেশ করলেন।
-এই, তোর নাম কী রে?
–পাঁচুগোপাল।
–পাঁচুগোপাল! গুরুপুত্তুর দাঁত খিঁচিয়ে বলেন, পাঁচু না, পেঁচো। যা তোর মুখের শ্রী–তুই আবার পাঁচু–গোপাল। নে চলে আয়–গুরুপুত্তুর একখানা পা পাঁচুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, টেপ।
-টিপব?
–হ্যাঁ–হ্যাঁ–টিপবি বইকি। গুরুর পা টিপলে স্বর্গে যাবি। নে, চলে আয়, দেরি করিসনি-গুরুপুত্তুর আবার মুখভরা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লেন।
পেঁচোর মতোই মুখ করে পাঁচু পা টিপতে বসল। মনে মনে স্বগতোক্তি করলে : আচ্ছা দাঁড়াও। পা টেপানো তোমার বার করে ছাড়ব–তবে আমি পাঁচুগোপাল।
সেইদিন মাঝরাত্রে গুরুপুত্তুরের হাঁউমাউ চিৎকারে পিসিমা লাফিয়ে উঠলেন। পাড়ার লোকজন লাঠি ঠ্যাঙা নিয়ে তেড়ে এল। হইহই কাণ্ড!
রাত্তিরে প্যাঁচাটাকে কে ছেড়ে দিয়েছিল কে জানে। গুরুপুত্তুর যেই গুটিগুটি ঘর থেকে বেরিয়েছেন, অমনি কোত্থেকে সেটা এসে তাঁকে আক্রমণ করেছে। দুটো জ্বলজ্বলে আগুনের মতো চোখ দেখে আর মাথার ওপর তিনটে ঠোকর খেয়েই একবার চিৎকার ছেড়ে তাঁর পতন ও মূর্ছা।
মাথায় দশ বালতি জল ঢালবার পরে তবে তাঁর চৈতন্য হল। গোঙাতে গোঙাতে তিনি তখনও বলছেন : ভু–ভূ-ভূত।
–ভূত না, প্যাঁচা। পাঁচুর প্যাঁচা।–পিসিমা জানাল।
–আঁ, প্যাঁচা। ভদ্রলোকের বাড়িতে প্যাঁচা।–গুরুপুত্তুর উঠে বসলেন।
-হ্যাঁ, পোষা।–আবার সভয়ে জ্ঞাপন করলেন পিসিমা।
–পোষা। প্যাঁচা কেউ পোষে।–গুরু চেঁচিয়ে উঠলেন : তাড়িয়ে দাও। একটু হলেই আমার মহাপ্রাণ বেরিয়ে গিয়েছিল।
–পাঁচুর পোষা প্যাঁচা বাবা। ও লক্ষ্মীর বাহন–ওকে তাড়াতে পারব না। ব্যাজার মুখে পিসিমা বললেন।
–তবে অন্তত ওটাকে খাঁচায় আটকাও।–গুরুপুত্তুর বললেন, নইলে এবাড়িতে একদণ্ড আমি থাকব না–অভিসম্পাত দিয়ে চলে যাব।
অভিসম্পাত। পিসিমা শিউরে উঠলেন। গোখরা সাপের ল্যাজ খেপে উঠেছে। ভয়ে ভয়ে বললেন, বাবা পাঁচু, তোর প্যাঁচা সামলা।
