–তোর ঘড়ির নিকুচি করেছে অনামুখো!–হাতের কাছে একটা ধামা কুড়িয়ে পেয়ে তাই নিয়ে পাঁচুকে তাড়া করলেন ক্ষেমঙ্করী পিসিমা।
কিন্তু যে-ছেলে ছাইচাপা আগুন, তাকে ধামাচাপা দেওয়া অতই সস্তা? রামচন্দ্র! ততক্ষণে তুফান মেল আসানসোল পার–মানে, পাঁচুগোপাল বেমালুম ভ্যানিশ!
.
ক্ষেমঙ্করী পিসিমার পাঁচুগোপাল, আর পাঁচুগোপালের ক্ষেমঙ্করী পিসিমা–ত্রিসংসারে দুজনের আপন বলতে আর কেউ নেই। পাঁচু জন্মাবার অল্প কয়েক বছর পরেই ওর বাবা-মা মারা গেলে নিঃসন্তান বিধবা পিসিমাই পরম যত্নে পাঁচুগোপালকে মানুষ করে আসছেন।
হাওড়া বাজেশিবপুরে বলাই ঢ্যাং লেনে ক্ষেমঙ্করী পিসিমার বাড়ি। পিসিমা পূর্বজন্মে বোধহয় গোটাকয়েক হাঁড়িচাঁচা ভাজা খেয়ে থাকবেন, তাই এ-জন্মে একেবারে মোক্ষম গলা নিয়ে জন্মেছেন। গলা থেকে তো আওয়াজ বেরোয় না–বেরোয় নিনাদ। আচমকা সে-চিৎকার কানে গেলে রোগা পটকা লোকের হার্টফেল হয়ে যেতে পারে।
লোকে বলে ওই গলা আছে তাই বাঁচোয়া। ক্ষেমঙ্করী পিসিমা সাক্ষাৎ যক্ষী বুড়ি। তার টাকায় ছাতা পড়েছে। আধপেটা খেয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা জমিয়েছে বুড়ি। এই গলা দিয়েই পিসিমা সে-টাকা পাহারা দেন। পিসিমা মরলে সে-টাকা লাগবে পাঁচুগোপালের ভোগে।
কিন্তু তার আগেই যা অবস্থা–পিসিমাকে জেরবার করে ফেলেছে পাঁচুগোপাল।
ব্যাপার আর কিছুই নয়–সেরেফ সেই বৈজ্ঞানিক কৌতূহল।
পাঁচুগোপাল বায়না ধরে বসেছে, সে প্যাঁচা পুষবে।
প্যাঁচা পুষবে! কথাটা শুনে আধঘণ্টা প্যাঁচার মতো মুখ করে বসে থেকেছেন ক্ষেমঙ্করী পিসিমা। পাগল না পাহারাওলা!
পাঁচুগোপাল নাছোড়বান্দা।
–ওরে গোমুখ্যু, এ কী বুদ্ধি তোর? প্যাঁচা কি কেউ পোষে? শিস দেয় না– রা কাড়ে, শুধু রাতদুপুরে ‘হুদ্দুমদুম’ করে এমন বিটকেল আওয়াজ ছাড়ে যে আত্মারাম খাঁচাছাড়া! না না–ওসব চলবে না–ক্ষেমঙ্করী পিসিমা ঘোষণা করছেন।
পাঁচুগোপালের মুখে-চোখে ফুটে বেরিয়েছে গভীর একটা সংসার-বৈরাগ্য : প্যাঁচা পুষতে দেবে না? বেশ, ভালো কথা। আমিও তাহলে ছাই মেখে সন্নিসি হয়ে হিমালয়ে চলে যাব। এ-সংসারে কেই বা কার!
শুনে কেঁদে ফেলেছেন ক্ষেমঙ্করী পিসিমা : ওরে অমন অলক্ষুণে কথা বলিসনি! সংসারে তুই আমার, আমিই তোর; সন্নিসি হয়ে তোর কাজ নেই বাবা-তোর চাঁদমুখে একরাশ দাড়ি দেখলে আমি সইতে পারব না! তুই প্যাঁচা পোষ বাবা, বাদুড় পুষতে পারিস, চামচিকে পুষলেও আপত্তি নেই। দোহাই বাপধন পাঁচুগোপাল, সন্নিসি হোসনি!
এতক্ষণে একগাল হেসেছে পাঁচুগোপাল। তারপর লম্বা একটা শিস দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে প্যাঁচার সন্ধানে।
যোগাড় করতে অবিশ্যি খুব কষ্ট হয়নি। গলির মোড়ের বিড়িওলা এজলাস মিঞাকে আটগণ্ডা পয়সা দিতেই একটা প্যাঁচার বাচ্চা এনে দিলে দমদমা থেকে।
নতুন-কেনা খাঁচায় নতুন প্যাঁচার ছানা নিয়ে বিজয়গর্বে বাড়ি ঢুকল পাঁচুগোপাল।
–পিসিমা, পিসিমা!
ক্ষেমঙ্করী পিসিমা তখন কুঁড়োজালি জপবার নাম করে চোখ বুজে টাকার হিসেব করছিলেন। পাঁচুর ডাকে চমকে উঠলেন।
কী রে মুখপোড়া, হয়েছে কী? অমন চাঁচাচ্ছিস কেন?
–পিসিমা, চিড়িয়া আ গিয়া–আনন্দের চোটে পাঁচুর মুখ দিয়ে হিন্দী বেরিয়ে পড়ল।
–চিঁড়ে! আবার চিঁড়ে দিয়ে কী হবে? এই তো একটু আগে একধামা মুড়ি-মুড়কি খেয়ে গেলি।–বলতে বলতে খাঁচার দিকে নজর পড়ল পিসিমার : ওগো মাগো, এটা আবার কী গো।
–ওগো এটা প্যাঁচা গো। চিঁড়ে নয়, চিঁড়ে নয়, এটাই চিড়িয়া গো–পিসিমার স্বরের অনুকরণে জানাল পাঁচুগোপাল।
মরণ! মুখ কুঁচকে পিসিমা বললেন, তোর চিঁড়ে-মুড়ি নিয়ে ধুয়ে খা, ওসব অনাছিষ্টি কাণ্ডের মধ্যে আমি নেই!
এবার পাঁচুগোপাল লেগে গেল তার চিঁড়ে-মুড়ি অর্থাৎ চিড়িয়া মানে প্যাঁচার পরিচর্যায়।
আহা, কী রূপ! রূপে একেবারে চারিদিক অন্ধকার করে রেখেছে। সারা গায়ে ছাই রঙের পালক ফুলে আছে। থ্যাবড়া গোল মুখ–ধারালো ঠোঁট। সমস্ত মুখটায় এমন বিচ্ছিরি বিরক্তি যে মনে হয় প্যাঁচাটা বুঝি এইমাত্তর এক-গেলাস চিরতা খেয়ে এসেছে। আফিংখোরের মতো সারাটা দিন বসে বসে ঝিমুচ্ছে, এক-আধবার যখন চোখ মেলছে, তখন ভাঁটার মতো সে-চোখ দেখে হৃদকম্প হচ্ছে লোকের। কেউ কাছে গিয়ে ঝিমুনি ভাঙানোর চেষ্টা করলেই খ্যাঁচ-খ্যাঁচ করে এক ঠোকর–একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড!
তার আসল পরাক্রম প্রকাশ পায় রাত্তিরবেলায়।
–হুদ্দুমদুম–হুদ্দুম–দুদুম সারা রাত সে ভুতুড়ে চিৎকার ছাড়ে। দুটো আগুনের গোলার মতো চোখ তার জ্বলজ্বল করে জ্বলে-খাঁচার মধ্যে সে পাখা ঝাপটে ঝাপটে উড়তে চেষ্টা করে। আর সারাদিন ধরে যেসব আরশোলা, ব্যাঙ আর টিকটিকি পাঁচু তার খাঁচায় জোগাড় করে রেখেছে, একটার পর একটা সেগুলোই সে গিলতে থাকে টপাটপ করে।
এক-একদিন খেপে ওঠেন পিসিমা।
-গেরস্ত বাড়িতে এ কী সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড গো। সাতজন্মে এমন কথা কেউ শুনেছে। ও যমের অরুচি প্যাঁচাকে বাড়ি থেকে আজ বিদায় করে ছাড়ব।
পাঁচু আঁতকে ওঠে : সর্বনাশ, বলছ কী পিসিমা। প্যাঁচা তাড়াবে?
–তাড়াব না? প্যাঁচা আমার কোন্ নাতজামাই শুনি? মাগো, কী বিতিকিচ্ছি ডাক! শুনলে ভূত পালায়! না, প্যাঁচা আমি বাড়িতে রাখব না–
–পিসিমা, ছি-ছি!–পাঁচুর গলা হঠাৎ গম্ভীর : জানো, প্যাঁচা কে?
