অত্যন্ত প্রসন্ন মনে তর্করত্ন একটা বিড়ি ধরালেন। গাড়ি চলছে মন্থর গতিতে। আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপূর্ণিমা। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ আলো করে দিয়ে চমৎকার চাঁদ উঠেছে। কালকের মেঘাচ্ছন্ন শ্মশানের সঙ্গে এর কত তফাত। শহরের অনেকগুলো লক্ষ্মী পুজো আজ তর্করত্নের নষ্ট হয়ে গেল। তা যাক, বলাই ঘোষ অনেক বেশি পরিমাণে তার ক্ষতিপূরণ করে দিয়েছে।
দু-পাশে দূরবিস্তৃত মাঠ। উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় দিকে-দিগন্তে ধানের শিষ দুলছে। চমৎকার ফলন হয়েছে এবার। মাঝে মাঝে এক-একটা দীর্ঘ তালের গাছ প্রহরীর মতো কালো ছায়া ফেলছে। পথের দু-পাশে কাঠমল্লিকার ফুল যেন গন্ধের মায়াবিস্তার করে দিয়েছে। এখানে ওখানে গ্রাম; এত শস্য, এত জীবনের মধ্যেও মৃত্যু আর মন্বন্তরের স্পর্শে নিস্তব্ধ।
হঃ-হঃ-হঃ।
জিহবা-তালু সহযোগে একটা প্রবল শব্দ করে গাড়োয়ান গাড়িটাকে থামিয়ে দিলে।
কী হল রে?
তর্করত্ন চমকে উঠলেন। এই নির্জন মাঠের মধ্যে-ডাকাত নয় তো? সঙ্গে পাঁচশো নগদ টাকা, বিস্তর জিনিসপত্র। বড়ো ভরসাও নেই।
রাস্তার ওপর ডোম পাড়ার পাগলিটা পড়ে আছে বাবু।
কে ডোম পাড়ার পাগলি? কী হয়েছে?
ওই… গাড়োয়ানের স্বরে বেদনার আভাস লাগল। আকালে ওর তিনটে বেটা আর সোয়ামি না খেয়ে মরে গেছে বাবু। তাই পাগল হয়ে গেছে। রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছে, যমে ধরেছে বোধ হয়।
তর্করত্ন সভয়ে গাড়ির মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দিলেন।
থাক, থাক, যেতে দে। পাশ দিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁকিয়ে চলে যা। যে-রোগ, বিশ্বাস নেই বাবা।
গাড়ি চলতে লাগল। কোজাগরী পূর্ণিমার রাশি রাশি জ্যোৎস্না, সাঁওতাল পাড়ায় মাদলের মৃদু-গম্ভীর শব্দ, ওরাও কি লক্ষ্মী পুজো করে নাকি? কোজাগরী। লক্ষ্মী ঘরে ঘরে ডাক দিয়ে যান, কে জাগে? চাঁদের দুধে ধানের শিষ পূর্ণায়ত হয়ে উঠছে। ফসলের ভরা খেতের মধ্যে থেকে থেকে একটি করে প্রদীপের শিখা। শস্যলক্ষ্মীকে আহ্বান করছে মাটির মানুষেরা, তাঁর পায়ের ছোঁয়া লেগে খেতের ধান সোনা হয়ে যাবে। কাঠমল্লিকার সুরভিতে কি তাঁরই শ্রীঅঙ্গের পদ্মগন্ধ?
তর্করত্নের মনটা হঠাৎ বিহ্বল হয়ে উঠল। দু-হাত কপালে ঠেকিয়ে তিনি গদগদ কণ্ঠে বলতে লাগলেন, দোহাই শ্মশানকালী, কৃপা করো মা। পুষ্করা কেটে যাক, মানুষ আবার বেঁচে উঠুক। মা মহাকালী, তুমি মহালক্ষ্মী হয়ে এসে দেখা দাও।
এত ধান, এত ফসল, পুষ্করা কেটে যাবে বই কী। কিন্তু একটা জিনিস তর্করত্ন বুঝতে পারেননি। তাঁর শ্মশানকালী এসেছিল ওই ডোমপাড়ার পাগলিটার রূপ ধরেই, আর এখনও পথের ধুলোয় পড়ে সে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে। কালীর মতো জিভ মেলে হাঁপাচ্ছে এক ফোঁটা জলের জন্যে। দীর্ঘদিনের বুভুক্ষার পরে দেবভোগ্য শিবাভোগ সে সহ্য করতে পারেনি।
কিন্তু তবুও পুষ্করা কেটে যাবে। মারি আর মড়কের সমস্ত বিষ চিরকাল ওরাই নীলকন্ঠের মতো নিঃশেষে পান করে নেয়।
প্যাঁচা ও পাঁচুগোপাল
ছেলেবেলা থেকেই পাঁচুগোপালের দুর্দান্ত বৈজ্ঞানিক কৌতূহল।
না হয়ে যায় কোথায়! তিনদিন তিনরাত পাঁচুঠাকুরের দোরগোড়ায় ধরনা দিয়ে তবে পাঁচুগোপালের আবির্ভাব। যখন জন্মেছিল তখন তার হাত-পা ছিল কাঠির মতো সরু সরু–তিন নম্বরী ফুটবলের মতো তার মস্ত মাথাটাই চোখে পড়ত তখন। আরও কী আশ্চর্য–পুরো একটি বছর মাথায় একগাছা চুল গজায়নি পর্যন্ত।
প্রতিবেশীর কাছে পাঁচুগোপালের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে হাপুস হুপুস করে কেঁদেই সারা হয়ে যেতেন ক্ষেমঙ্করী পিসিমা।
–আহা, পাঁচু আমাদের ক্ষণজন্মা! এখন বরাতে টিকলে হয়!–ওর মাথায় কেন চুল গজায়নি, জানো? বাছার মাথায় এত বুদ্ধি যে সেই বুদ্ধির গরমে আর চুল গজাতে পারেনি। সাক্ষাৎ পাঁচুঠাকুর আমাদের ঘরে জন্মেছেন গো! এসব তাঁরই নীলে (লীলা)-আবেগের চোটে শেষ পর্যন্ত ক্ষেমঙ্করী পিসিমার হিক্কা উঠতে থাকে। তখন পাড়াপড়শিরা তাঁর মাথায় জল ঢেলে তাঁকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
তারপর অনেক দিন পার হয়ে গেছে।
আগ্নেয়গিরির আগুনও একদিন ঠাণ্ডা হয়–পাঁচুগোপালের মগজ তো কোন্ ছার! যথাসময়ে সে-মাথায় উলুবনের মতো চুল গজিয়েছে। শুধু গজায়নি, সে-চুল ছাঁটতে এখন পাঁচুগোপালের করকরে নগদ দুটি করে টাকা খরচ। আর জুতসই করে টেরি বাগাতে কোন্ না দুটি ঘণ্টাদৈনিক কাবার হয়ে যায় তার?
আর ওই টেরি বাগাতে গিয়েই যত ঝামেলা! রোজ ইস্কুলে লেট হয়ে যায়। লেট হতে হতে একেবারে ফেল–ট্রেন নয়, ম্যাট্রিকুলেশন। পাক্কা তিনটি বার ঠোক্কর খেয়ে পাঁচুগোপাল এখন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় রত।
পোকা-মাকড়, টিকটিকি, আরশোলা, পাখি–এইসব তার গবেষণার বিষয়বস্তু। আর সে-গবেষণার চোটে স্বয়ং ক্ষেমঙ্করী পিসিমারই হাঁড়ির হাল!
কুঁড়োজালির মধ্যে হাত দিয়েছেন–ফরফর করে একঝাঁক আরশোলা উড়ে বেরিয়ে করকরে ঠ্যাঙে তাঁর গায়ে হাঁটতে শুরু করল–পিসিমার তো হাই-মাই চিৎকার। পাঁচু তার ঝুলির মধ্যে আরশোলা পুষতে চেয়েছিল। আর-একবার ঘরে ঢুকতে দেখলেন–চারদিকের দেওয়ালে সুতো বাঁধা সাত-আটটা জ্যান্ত টিকটিকি ঝুলছে।
–এ কী রে মুখপোড়া! এ কী!–পিসিমা চেঁচিয়ে উঠলেন—
একগাল হেসে পাঁচু বললে, ঘাবড়াচ্ছ কেন পিসিমা, দিব্যি বিনি-পয়সার ঘড়ি, সারা দিনরাত টিকটিক করবে।
