নিজের মূর্তি ধরেই? ভয়ে যেমন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে যেন কোথা থেকে ঠেলে উঠল একটা দুঃসহ আনন্দের জোয়ার। সারাজীবন ধরে যে-সাধনা তিনি করেছেন, আজ তা সম্পূর্ণ সার্থক হল। এই মহাশ্মশানে আর মৃত্যুর বিরাট উৎসবের মধ্যে দেবী এবার মূর্তি ধরেই নেমে এসেছেন। বিস্ফারিত চোখ মেলে তর্করত্ন দেখতে লাগলেন কী ক্ষুধার্তভাবে চোখ দুটো জ্বলে উঠেছে। অন্ধকারের মধ্যে দৃষ্টি নিশাচরের মতো তীক্ষ্ণতা পেয়েছে, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একমাথা ঝাঁকড়া চুল, কুচকুচে কালো গায়ের রং, অর্ধনগ্ন নারীমূর্তি। তার দাঁতের চাপে হাড়গুলো মড়মড় করে ভেঙে যাচ্ছে।
শিউরে উঠে তর্করত্ন চোখ বোজবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। কে যেন সে দুটোকে জোর করে টেনে ধরে রেখেছে। কাশী কুমোর আর কেশব চুলি বিভোর হয়ে ঘুমুচ্ছে। ঘুমোক, ঘুমোক, দেবীকে স্বচক্ষে দেখবে এত পুণ্য ওরা করেনি। চারদিকে রন্ধ্রহীন কালো অন্ধকার, পচা মড়ার গন্ধ, আকাশ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় কালো বৃষ্টি গলে পড়ছে।
দেবী, প্রসন্না হও, প্রসন্না হও। তোমার ভোগ গ্রহণ করো, মারিভীতদের রক্ষা করো।
প্রসন্না হও…
ভীত শুকনো গলায় উচ্চারিত হতে লাগল ক্ষীণ প্রার্থনা। কিন্তু এত নিঃশব্দে যে তর্করত্ন নিজেই তা শুনতে পেলেন না।
ঘড়ির কাঁটায় তাল পড়ছে টিক-টিক-টিক। তর্করত্নের বুকের মধ্যে তার প্রতিধ্বনি। কালো অন্ধকারের পাষাণপ্রাচীর ভেদ করে সময় যেন এগিয়ে যেতে পারছে না, বার বার করে থমকে দাঁড়াচ্ছে। হাড়-চিবানোর শব্দটা তারই মধ্যে ক্রমাগত কানে আসছে। তর্করত্নের গলা শুকিয়ে আসছে, সমস্ত শরীর যেন হিম হয়ে যাচ্ছে। আর এক বার কারণ খেয়ে নিতে পারলে মন্দ হত না। কিন্তু নড়বার সাধ্য নেই, কে যেন তাঁর সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকে অসাড় আর অনড় করে দিয়েছে।
হি-হি-হি…
হঠাৎ একটা প্রচন্ড তীক্ষ্ণ হাসিতে সমস্ত শ্মশানটা থরথর করে কেঁপে উঠল। তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে গেল দিকে-দিগন্তে। মরা নদীর জল আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল, ওপারের ন্যাড়া শিমুল গাছে ডুকরে উঠল শকুনের বাচ্চা। তর্করত্নের হৃৎপিন্ডটা যেন লাফিয়ে গলার কাছে উঠে এসেই আবার ধড়াস করে আছড়ে পড়ে গেল।
কাশী কুমোর আর কেশব ঢুলি চমকে জেগে আর্তনাদ করে উঠল। অমানুষিক ভয়ে বুজে আসা চোখ দুটো খুলে তর্করত্ন দেখতে গেলেন, সে-মূর্তিটা অন্ধকারের মধ্যে কোথায় মিলিয়ে গেছে, যেন দূর থেকে ভেসে আসছে একটা দ্রুত বিলীয়মান লঘু পদধ্বনি।
জয় মা শ্মশানকালী, জয় মা। তর্করত্ন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলেন।
ওরে, বাজা বাজা। আর ভয় নেই, দেবী নিজে এসেছিলেন, তাঁর ভোগ নিজেই গ্রহণ করে গেছেন। বাজা-বাজা। জয় মা শ্মশানকালী, জয় মা মহাকালী।
আবার পেট্রোম্যাক্সের আলো জ্বলে উঠল। শিবাভোগ নিঃশেষিত। এমন হাতে হাতে। প্রত্যক্ষ ফল সচরাচর দেখা যায় না।
কেশব ঢুলি প্রাণপণে ঢাকে ঘা লাগাল। কারণের বাকিটুকু একচুমুকে নিঃশেষ করলেন তর্করত্ন। কাশী কুমোর গাঁজার কলকেটা নতুন করে সাজতে বসল।
রাত ভোর হয়ে আসছে। সাড়ে চারটে। মাথার ওপর থেকে কালো মেঘ আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে, তার একপাশ দিয়ে অস্তগামী চাঁদের উজ্জ্বল আলো এতক্ষণে বিচ্ছুরিত হয়ে পড়ল। যেন মৃত্যুর যবনিকা মুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে শ্মশানকালী প্রসন্ন হাসিতে হেসে উঠেছেন।
ভোরের আগেই এই অদ্ভুত ঘটনার কথা গ্রামের ঘরে ঘরে আলোড়ন জাগিয়ে দিলে। শ্মশানকালী নিজে এসে ভোগ গ্রহণ করেছেন, কলি যুগে দেবীর এমন প্রত্যক্ষ আবির্ভাবের কথা আর শোনা যায় না। এখন আর ভয় নেই, এবার গ্রাম রক্ষা পাবে, দেশ রক্ষা পাবে। মারি থাকবে না, মন্বন্তর থাকবে না। মৃত্যুমগ্ন গ্রামের ওপর উল্লাসের তরঙ্গ জেগে উঠল। তর্করত্নের চোখ দিয়েও দরদর করে জল পড়তে লাগল। তাঁর সাধনা এতদিনে সফল হয়েছে, দেবী এসে সশরীরে তাঁকে দর্শন দিয়েছেন।
বেলাবেলিই স্টেশনে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তর্করত্নের। কিন্তু গ্রামের লোক তাঁকে যেতে দিলে। বলাই ঘোষ তো গলায় কাপড় জড়িয়ে সারাদিনই তাঁর পদতলে পড়ে রইল। ধুলো দিতে দিতে পায়ের একপর্দা চামড়াই উঠে গেল তর্করত্নের। আর সমবেত জনতার কাছে সত্যি মিথ্যের রং ছড়িয়ে ব্যাপারটা ফলাও করতে লাগল কাশী কুমোর।
মাকে দেখবার পুণ্যি তো করিনি, তাই পাপচোখে কী মোহনিদ্রাটাই নেমে এল। সবই তাঁর লীলে। আর সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে মা নিজেই নেমে এসে শিবাভোগ খেলেন। গলায় মুন্ডমালা, হাতে খাঁড়া, জিভ থেক টপ টপ করে পড়ছে রক্ত। তারপর সে কী ভয়ানক হাসি! শুনলে যেন পেটের পিলে ফুসফুস একসঙ্গে চড়াৎ করে ফেটে যায়। চমকে তাকিয়ে দেখি…
সমবেত জনতার উদগ্রীব ভয়ার্ত মুখের দিকে আর এক বার চোখ বুলিয়ে নিয়ে শুরু করলে, চমকে তাকিয়ে দেখি…
সন্ধ্যার পরে তর্করত্ন গোরুর গাড়িতে চেপে স্টেশনে যাত্রা করলেন। শেষরাতে ট্রেন ধরতে হবে। তারপর শহর।
গাড়ির অর্ধেকটা দানে আর দক্ষিণায় বোঝাই। কলা, মুলো, নারিকেল, কাপড় আরও কত কী। এদিক দিয়ে বলাই ঘোষের কার্পণ্য নেই, ধানের ব্যাবসা করে সে মেলা টাকা কামিয়েছে এবারে। তা ছাড়া ঘোষপাড়া গ্রামটাই তালুকদার আর মহাজনের দেশ। যুদ্ধের বাজারে তারা মুঠো মুঠো টাকা কুড়িয়ে নিয়েছে। দক্ষিণার অঙ্কে তিনশো টাকার জায়গায় তারা পাঁচশো টাকা তুলে দিয়েছে তাঁর হাতে। তর্করত্ন প্রাণভরে আশীর্বাদ করেছেন। পাঁচশো টাকা একটা কালী পুজোর দক্ষিণা! যুদ্ধে দেশের ব্যাবসাবাণিজ্যের উন্নতি না হলে এমন কথা কি কেউ ভাবতে পারত।
