বলাই ঘোষও সামনে নেই। তাঁকে পুজোয় বসিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়িতে গিয়ে বোধ হয় ঘুম লাগিয়েছে। হয়তো ভেবেছে আর ভাবনা নেই। তর্করত্নের মতো সিদ্ধপুরুষ, পঞ্চমুন্ডি আসনে বসে যিনি দৈনন্দিন কালী পূজা করেন, তিনি অনায়াসেই গ্রাম থেকে সমস্ত মড়ক আর আদিব্যাধির বালাই দূর করে দিতে পারবেন। কিন্তু তর্করত্ন যে কী সর্বনাশের সামনে দাঁড়িয়ে বলির পশুর মতো কাঁপছেন, একথা বলাই ঘোষের ভাববারও ক্ষমতা নেই। এক বার বলাই ঘোষকে সামনে পেলে… তর্করত্ন হিংস্রভাবে ভাবতে লাগলেন, বলাই ঘোষকে সামনে পেলে তিনি পৈতে ছিঁড়ে অভিশাপ দিতেন— সবংশে দেবীর উদরে যাও তুমি, তুমি উচ্ছন্নে যাও।
ঝিমুতে ঝিমুতে কাশী কুমোর হঠাৎ যেন চমকে উঠল।
কী ঠাকুর, কী খবর?
খবর আবার কী? যা কপালে আছে, তাই হবে। কথার শেষ দিকটা কান্নায় কাঁপতে লাগল।
শেয়াল এল না?
নাঃ। তর্করত্নের চোখে এবার অশ্রু ছলছল করে উঠল।
ও আর এসেছে। কত মড়া পাচ্ছে খেতে, খিদে-তেষ্টা তো নেই। আর তাজা মানুষের রক্তেই দেবীর পেট ভরছে। তোমার ওই শুকনো চিমসে লুচি আর পোয়াটাক বোকা পাঁঠার মাংস খেতে তো বয়েই গেছে তাদের।
তুই থাম হারামজাদা। বজ্রকণ্ঠে ধমক দিয়ে উঠলেন তর্করত্ন, যা বুঝিসনে, তার ওপর কেন কথা কইতে যাস।
হে-হে-হে। নির্বোধ শব্দ করে কাশী কুমোর হেসে উঠল। গাঁজার নেশায় তার ভয়ডর ভেঙে গেছে। আচ্ছা, আমি থামলাম। ন্যাংটোর আবার বাটপাড়ের ভয়। আমার তো সবই ওলাদেবীর পেটে গেছে, বউ-ব্যাটা সমস্তই। পুষ্করাই লাগুক আর ঘোড়ার ডিমই লাগুক, ওতে আমার আর কী হবে ঠাকুর?
তা বটে, তার কিছুই হবে না। কিন্তু তর্করত্নের তো তা নয়। তাঁর ঘর আছে. সংসার আছে, ছেলেপিলে আছে। তিনি মরলে তাদের খেতে দেবে এমন কেউ নেই। তিনশো টাকা তাদের বাঁচিয়ে রাখবে ক-দিন! আর এই দুর্ভিক্ষের বাজার। মৃত্যু যেন চারিদিক থেকে কালো কালো হাত বাড়িয়ে মানুষকে তেড়ে আসছে, একেবারে সমস্ত গ্রাস না করে তার খিদে আর মিটবে না। না খেয়ে মরছে, খেয়ে কলেরা হয়ে মরছে। পুষ্করার বাকি আছে কোথায়।
সামনে কালীমূর্তি। কাঁচা কালো রং জ্বলজ্বল করছে, ঘাসের মতো টপ টপ করে তার দু এক বিন্দু ঝরে পড়ছে দেবীর পায়ের তলায়—মহাদেবের সমস্ত মুখে এঁকে দিয়েছে বিষাক্ত ক্ষতের চিহ্ন। সমস্ত মূর্তিটা যেন জীবন্ত, চোখ দুটি রক্তে মাখা। এ মূর্তিও সাধারণ নয়, তৈরি করতে হয় শ্মশানে, মাটির সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হয় শ্মশানচিতার কয়লা, তারপর রাতারাতি বিসর্জন দিতে হয়। তাড়াতাড়িতে তৈরি করতে গিয়ে কাশী কুমোর দেবীর মূর্তিকে ঠিক দেবী করে গড়ে তুলতে পারেনি, সবটা মিলিয়ে একটা পৈশাচিক বীভৎসতার সৃষ্টি হয়েছে। পেট্রোম্যাক্সের আলোয় তার একটা দীর্ঘ ছায়া পেছনে নদীর জলে গিয়ে পড়েছে, স্রোতের টানে সেই ছায়াটা কাঁপছে। পচা মড়ার দুর্গন্ধে যেন নিশ্বাস আটকে আসছে তর্করত্নের।
কাশী কুমোর আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। ঢোলের ওপর মাথা রেখে নাক ডাকাচ্ছে কেশব ঢাকি। কী আশ্চর্যরকমে নিশ্চিন্ত হয়ে আছে ওরা। শ্মশান, সমস্ত দিকপ্রান্ত যেন কার মন্ত্রবলে স্তব্ধ হয়ে গেছে। শেয়াল ডাকছে না, গ্রামের দিক থেকে আবার কান্নাটা গেছে থেমে। শুধু মাথার ওপর শুক্লা চতুর্দশীর আকাশ মেঘের ভারে আচ্ছন্ন হয়ে আতঙ্কে যেন থমথম করছে।
হাওয়ায় অল্প শীতের আমেজ। পরনের খাটো রক্তবস্ত্রে শরীরের সবটা ঢাকা পড়ছে না। ভয়ের সঙ্গে শীতের শিহরণ মিশে গিয়ে তর্করত্ন কাঁপতে লাগলেন, কম্পিত কণ্ঠে মন্ত্র উচ্চারিত হতে লাগল— দেবী, প্রসীদ, প্রসীদ…
দূরে কলাপাতার ওপর শিবাভোগ শীতের স্পর্শে ঠাণ্ডা আর বিবর্ণ হয়ে আসছে। আর এক পাত্র তীব্র কারণ গলায় ঢেলে নিলেন তর্করত্ন। মুহূর্তে সর্বাঙ্গে আগুন ধরে গেল। দেবী আসবে না? নিশ্চয় আসবে, আসতেই হবে তাঁকে। সারাজীবন ধরে ঐকান্তিক নিষ্ঠাভরে দেবীর আরাধনা করছেন তিনি। সাধারণ পূজারি যেখানে এগিয়ে যেতে সাহস করে না, সেই তান্ত্রিক পঞ্চমুন্ডি আসনে বসে তিনি নিত্যপূজা করেন। তাঁর আহ্বান দেবীকে শুনতে হবে—শুনতেই হবে।
ঘড়ির কাঁটায় রাত তিনটে। তা হোক।
তর্করত্ন নিজের মধ্যে গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে গেলেন।
কতক্ষণ ধ্যান করছিলেন খেয়াল নেই, একসময়ে চমকে জেগে উঠলেন তিনি। দপ দপ দপ। আকস্মিকভাবে খানিকটা উগ্র দীপ্তিতে শিখায়িত হয়ে উঠেই পেট্রোম্যাক্সটা নিবে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গেই চারদিকের অন্ধকার যেন হুড়মুড় করে এসে ভেঙে পড়ল বিরাট একটা বন্যাস্রোতের মতো। গুঁড়োয় গুড়োয় জলের কণা ছড়িয়ে পড়ছে, বৃষ্টি নামল নাকি?
উঠে আলোটা জ্বালবার একটা প্রেরণা বোধ করেই সঙ্গে সঙ্গে তর্করত্ন নিঃসাড় হয়ে গেলেন। বৃথা হয়নি, মিথ্যে হয়নি তাঁর সকাতর প্রার্থনা। দেবী এসেছেন। কালির মতো কালো অন্ধকারেও তর্করত্ন ভীত রোমাঞ্চিত দেহে দেখলেন শিবাভোগের সামনে দুটো চোখ আগুনের মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। দু-হাতে সে শিবাভোগ গোগ্রাসে খাচ্ছে, তার দাঁতে লুচি আর মাংস চিবানোর একটা হিংস্র শব্দ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে তর্করত্নের কানে ভেসে এল।
কিন্তু দু-হাতে! দু-হাতে কীরকম? তর্করত্ন আবার তীব্র চমক অনুভব করলেন নিজের মধ্যে। শেয়ালের তো হাত থাকে না। তাহলে, তাহলে দেবী কি নিজের মূর্তি ধরেই তাঁর ভোগ গ্রহণ করতে এসেছেন?
