শুক্লা চতুর্দশীর রাতে কালী পুজো। কথাটা শুনতে অশোভন আর অশাস্ত্রীয় ঠেকছে। কিন্তু এ সাধারণ কালী পুজো নয়। আশেপাশে দশখানা গ্রামজুড়ে মড়ক দেখা দিয়েছে, কলেরার মড়ক। আর সে কী মৃত্যু! ছ-মাসের শিশু থেকে ষাট বছরের বুড়ো দিব্যি আছে, কোনো রোগব্যাধির বালাই নেই, হঠাৎ কাটা কই মাছের মতো ধড়ফড় করে মরে যাচ্ছে। তাই দেবীর কোপ শান্ত করবার জন্যে শ্মশানে শ্মশানকালী পুজোর আয়োজন। অসহায় বিপন্ন মানুষ তিথি-নক্ষত্রের দোহাই মানে না।
পাশেই একটা পেট্রোম্যাক্স জ্বলছে। তার সাদা দীপ্তিটা কেমন নীলাভ হয়ে আসছে, তেল ফুরিয়ে গেছে বোধ হয়। আলোটার ওপরে-নীচে নানা জাতের ছোটো-বড়ো পোকা এসে জমেছে তূপাকারে। তারই অদূরে বসে কাশী কুমোর গাঁজা খাচ্ছে আর গায়ের ওপর থেকে পোকা তাড়াচ্ছে ক্রমাগত।
মুখ থেকে গাঁজার কলকে নামিয়ে কাশী কুমোর বললে, এল?
অসহায় কাতর দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকিয়ে তর্করত্ন বললেন, না, কোনো পাত্তাই তো দেখছি না।
কাশী বললে, রাত তো প্রায় কাবার। ভোগ হয়ে গেছে কতক্ষণ। ও আজ আর আসবে।
আসবে না? আসবে না মানে? বীরাসনে বসেও রক্তবস্ত্রধারী তর্করত্নের আপাদমস্তক থরথর করে কেঁপে উঠল।
না এলে কী হবে জানিস? পুষ্করা পাবে। কারও রক্ষা থাকবে না, তোর নয়, আমার নয়। শ্মশানকালীর খাঁড়ায় কেটেকুটে একজাই হয়ে যাবে সমস্ত। একটি মানুষেরও আর বাঁচবার জো থাকবে না।
কাশী কুমোরের হাত থেকে গাঁজার কলকে খসে পড়ে গেল।
ডাকো-না ঠাকুর, ভালো করে মাকে ডাকো। এতকাল পুজোআচ্চা করলে, এত বড়ো পন্ডিত তুমি, আর দেবীকে ভোগ খাওয়াতে পারলে না? ডাকো, ডাকো, প্রাণপণে ডাকো।
শুকনো মুখে তর্করত্ন বললেন, ডাকছি তো, কিন্তু…
একটু দূরে আধো অন্ধকারের মধ্যে বড়ো একখানা কলাপাতায় পাকারে লুচি সাজানো আর খানিকটা মাংস। তার ওপরে বড়ো একটা জবাফুল, পেট্রোম্যাক্সের আলোতে চাপবাঁধা খানিকটা রক্তের মতো দেখাচ্ছে। সেদিকে দুখানা হাত বাড়িয়ে দিয়ে তর্করত্ন আবেগ-ভরা কম্পিত গলায় মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন, দেবী প্রসন্ন হও, প্রসন্ন হও। তোমার ভোগ গ্রহণ করো, জগৎকে রক্ষা করো…
কিন্তু কোথায় দেবী!
নিশিরাত্রের শ্মশান। শুধু শ্মশান বললে কম বলা হয়, এ মহাশ্মশান। অগভীর আর পঙ্কস্রোতা নদীর ধারে ধারে প্রায় তিন মাইল জুড়ে এই শ্মশান ছড়িয়ে পড়ে আছে। কত যে মড়া এখানে পুড়তে আসে তার হিসেব দেওয়া দুঃসাধ্য। আধপোড়া হাড়, মানুষের মাথা, চিতার কয়লা, পোড়া বাঁশ আর রাশি রাশি ভাঙা কলসি। প্রতি বছর বানের সময় নদীপাড় ভাঙে, মুছে নিয়ে যায় অসংখ্য চিতার অঙ্গারচিহ্ন, মড়ার মাথা আর পোড়া হাড়ের টুকরোয় তার গর্ভ ভরাট হয়ে ওঠে। তারপরেই আবার নতুন চিতা জ্বলে, লকলকে আগুনের শিখা প্রতিফলিত হয় অস্বাস্থ্যকর কালচে জলের ওপর, শ্মশান ক্রমশ এগিয়ে আসে লোকালয়ের কোল পর্যন্ত। আগে যেখানে মড়া নিয়ে যেতে হলে পর পর তিনখানা পোড়ো জমির মাঠ পেরিয়ে যেতে হত, এখন সেখান থেকে হরিধ্বনি দিলে গ্রামের ঘরে ঘরে তার সাড়া জেগে ওঠে।
তর্করত্ন পেছনে ফিরে তাকালেন। নিঃশব্দ ঘুমন্ত গ্রাম। ঘুমন্ত! আতঙ্কে মূৰ্ছিত, মৃত্যুতে অসাড়। যে-বাড়িতে সাতটি লোক ছিল তার চারটিই হয়তো মরে শেষ হয়ে গেছে, এক জনের হয়তো ভেদবমি ধরেছে আর বাকি দুজন খুবসম্ভব শহরে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে। শুক্লা চতুর্দশীর রাতকে কালো মেঘ অমাবস্যার মুখোশ পরিয়েছে। এক কোণে থেকে থেকে বিদ্যুতের সর্পিল চমক একটা নিষ্ঠুর রক্তাক্ত হাসির মতো নদীর কালো জলকে উদ্ভাসিত করে দিচ্ছে।
দেবী, প্রসীদ, প্রসীদ…
কাতর আর্তকণ্ঠে তর্করত্ন আহ্বান করছেন। নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে চলেছে রাত্রির প্রহর, একপাশে রাখা টাইমপিসটার কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছে আড়াইটের ঘরে। তর্করত্নের হৃৎপিন্ডে উচ্ছলিত রক্তের স্পন্দনের সঙ্গে সঙ্গে যেন ঘড়ির কাঁটার তাল পড়ছে— টিক টিক টিক। রাত যদি ভোর হয়ে যায়, দেবী যদি শিবাভোগ গ্রহণ না করেন, তা হলে তা হলে–তর্করত্ন আর ভাবতে পারছেন না। অনিবার্য পুষ্করা। আর তার ফলে শুধু এই গ্রাম নয়, সমস্ত দেশ শ্মশানকালীর কোপে শ্মশান হয়ে যাবে। পুরোহিত, কুমোর কারও রক্ষা নেই। টাকার লোভে বিদেশে এসে শেষে তাঁর সর্বনাশ হয়ে গেল!
গাঁজার ঝোঁকে কাশী কুমোর ঝিমুচ্ছে। কেশব চুলি ঢাকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় কেমন করে ওরা ঘুমুচ্ছে, আশ্চর্য! গ্রামের দিক থেকে মাঝে মাঝে এক একটা কান্নার শব্দ ভেসে আসছে, নিজের রক্তের মধ্যেও যেন তর্করত্ন শুনতে পাচ্ছেন সেই কান্নার প্রতিধ্বনি। বাতাসে পচা মড়ার গন্ধ ভাসছে, মুখে আগুন ছুঁইয়েই গ্রামের লোক মড়া ফেলে গেছে এখানে-ওখানে। নদীর দুর্গন্ধ আবদ্ধ জলে সাদামতন ওটা কী ভাসছে? একটা মানুষ যে অমন অতিকায়ভাবে ফুলে উঠতে পারে এ যে কল্পনাই করা যায় না! ঝোপে-ঝাড়ে শেয়ালের ডাক উঠছে আর তার জবাব দিচ্ছে মড়াখেকো শ্মশানকুকুরের একটানা কান্নার মতো অস্বাভাবিক আর্তনাদ।
চারিদিকে এত শেয়াল, অথচ দরকারের সময় একটার দেখা নেই! শিবাভোগ। শেয়াল এসে ভোগ গ্রহণ না করলে পুজো ব্যর্থ হয়ে যাবে। তর্করত্ন বৈজ্ঞানিক যুগের চিন্তাধারায় মানুষ নন; তিনি শাস্ত্র বিশ্বাস করেন, দেবীর মাহাত্মে বিশ্বাস করেন। সারাজীবন এই করেই তাঁর কেটেছে। পন্ডিত বলে তাঁর খ্যাতি আছে, নানা জায়গা থেকে ক্রিয়াকর্মে তাঁর ডাক আসে। বাংলাদেশের বহু বড়োলোকের বাড়ি থেকে সসম্মানে বিদায় পান তিনি। তিনশো টাকা দক্ষিণার লোভ দেখিয়ে গ্রামের সমৃদ্ধ মহাজন আর তালুকদার বলাই ঘোষ তাঁকে ডেকে এনেছে দেবীর কোপ শান্ত করবার জন্যে। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁর নিজের হাত কামড়ে খেতে ইচ্ছে করছে, সমস্ত চেতনা চিৎকার করে কেঁদে উঠতে যাচ্ছে। এমন বিপদে তিনি জীবনে আর পড়েননি।
