পেছনে আসছে পনেরো বছরের ছেলে বলাই। তার দিক থেকে খুশির অন্ত নেই। জীবনে এই প্রথম সে বাপের সঙ্গে কুসুমডাঙার হাটে এসেছে। এই ছ-মাইল পথে অনেকখানি আকাশ, শাল-পলাশের বন, সীমান্তরেখায় একটা বিশাল বন্য মহিষের মত শুশুনিয়া পাহাড়, সব তার কাছে নতুন—আর এক পৃথিবীর সংবাদ।
পথে আসতে আসতে একটা গাছ থেকে কয়েক ছড়া পাকা তেঁতুল সংগ্রহ করেছিল বলাই। হাটের সওদা থেকে খানিকটা নুন বের করে নিয়ে তাই দিয়ে মনের খুশিতে সে তেঁতুল খাচ্ছিল আর বিচিগুলো দিয়ে কখনো একটা গিরগিটি, কখনো-বা একটা শালিক পাখিকে তাক করবার চেষ্টা করছিল।
হাতের বল্লমটার ওপর ভর দিয়ে মানিক সর্দার দাঁড়িয়ে পড়ল।
কী হল বাবা?
একটু জল খাব। তেষ্টায় বুকটা যেন পাথর হয়ে গেছে।
নদী পাশেই। কচ্ছপের পিঠের মতো বড়ো বড়ো পাথর চারদিকে ছড়ানো আর মোটা মোটা দানার একরাশ বালি কোনো পদ্মগোখরোর খোলসের মতো আঁকাবাঁকা ভঙ্গিতে অন্তহীন মাঠের মধ্যে এলিয়ে রয়েছে। ওই বালির রেখাটাই নদী। কিন্তু এক বিন্দু জল কোথাও নেই, শুকিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
বিকেলের সোনাঝুরি আলোয় নদীটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখল মানিক সর্দার। মাঝখানটায় খানিক জায়গা যেন ভিজে ভিজে মনে হচ্ছে, খুঁড়লে হয়তো জল পাওয়া যাবে।
বলাই এদিক-ওদিক তাকাল।
জল কই বাবা?
পাওয়া যাবে বোধ হয় ওখানে। আয় খুঁজে দেখি।
দুজনে নদীর ভেতরে নেমে এল। হ্যাঁ, জল এখনও আছে। পায়ের চাপে চাপে ভিজে বালি থেকে জল বেরিয়ে আসতে লাগল। বল্লমের দরকার হল না, হাত দিয়ে খানিক খুঁড়তেই বালি-মেশানো জলে ভরে উঠল গর্তটা।
বালি খানিক থিতিয়ে এলে আঁজলা আঁজলা করে খানিকটা জল খেল মানিক। বাপের দেখাদেখি বলাইও খেল।
বড়ো দেখে একটা পাথরের ওপর বসে পড়ে মানিক বললে, পা আর চলছে না, একটুখানি জিরিয়ে যাই।
বিকেলের সোনাঝুরি রোদে ঝিকমিক ঝিলমিল করছিল চারদিক। হাওয়াটা এখনও সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হয়নি—নিভে আসা হাপরের বাতাসের মতো গরম। ওপরে সারবাঁধা কয়েকটা পলাশ গাছ, কালো কালো কুঁড়ি ধরেছে তাতে; দিন কয়েক বাদেই ফুলের আগুন জ্বলবে। একটা পাপিয়া ডাকছে কোথাও। বসন্ত আসছে।
কিন্তু বসন্তের রং কোথাও নেই মানিক সর্দারের মনে। ওই বিশাল বন্য মহিষের মতো শুশুনিয়া পাহাড়ের কালো ছায়াটা ভাসছে চোখের সামনে। আধি চাষের ধান ফুরিয়ে গেছে, আজ কুসুমডাঙার হাটে একটা বলদ বেচে দিয়ে আসতে হল। বাকিটাও বেশিদিন থাকবে না, নতুন ফসল এখনও অনেক দূরে। তারপরে উপোস। তারও পরে…
মানিক সর্দার বসে রইল ভিজে বালির দিকে তাকিয়ে। খোঁড়া গর্তটা বুজে আসছে একটু একটু করে। আরও এক মাস কিংবা দু-মাস বড়োজোর, তারপরেই এ জল পালিয়ে যাবে পাতালে। কোদাল দিয়ে সাত হাত কোপালেও এক আঁজলা পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ, শুধু মুঠো মুঠো নুড়ি আর কাঁকর উঠে আসবে।
একটা বলদ গেল। পরেরটাও যাবে। তারপরে নুড়ি আর কাঁকড়।
এবারে আর আশা নেই। কিছুই করবার উপায় নেই। না, একটা উপায় এখনও আছে। গত বছরে খাদেম আলি মোল্লা যা করেছিল তাই। তারও হালের বলদ ছিল না কিন্তু বলদের দড়িটা ছিল। গোয়ালঘরের আড়ায় সেই দড়ি বেঁধে নিজের গলায় দিয়ে ঝুলে পড়েছিল।
পায়ের নীচের দিকটা খসে পড়ে যাচ্ছে হাঁটু থেকে, পেছন থেকে কে যেন সমানে চাপ দিচ্ছে কাঁধের ওপর; যেন যেমন করে হোক তার মেরুদন্ডটাকে মটকে ভেঙে ফেলবে।
তৃষ্ণায় আবার জ্বালা করে উঠছে গলার ভেতর। কিন্তু নতুন করে উঠে গিয়ে আবার খানিকটা জল খাওয়ার মতো শক্তি কিংবা উদ্যম কিছুই খুঁজে পেল না মানিক সর্দার।
ঘোলা ঘোলা চোখে চেয়ে দেখল, চঞ্চল বলাই একটু দূরেই একটা লাটাবনে গিয়ে লাটা কুড়োচ্ছে—বোধ হয় কুঁচেরও সন্ধান পেয়েছে ওখানে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, গত বছর এমনি কোনো একটা জায়গাতেই একটা শঙ্খচূড় সাপ দেখেছিল সে। বসন্তের হাওয়া দিয়েছে এখন, এই হাওয়াতেই সাপেরা শীতের ঘুম থেকে জেগে ওঠে, খিদেয় রুক্ষ হয়ে থাকে মেজাজ-অকারণে আক্রমণ করতে চায়। এক বার মনে হল বলাইকে সে ডাক দেয়, কিন্তু গলা থেকে স্বর বেরুতে চাইল না।
লড়তে পারত মানিক সর্দার, এ অবস্থাতে লড়তে পারত। চাষের সময় না আসা পর্যন্ত মজুর খাটতে গ্রামে গ্রামে ঘুরে, নাহয় আট মাইল দূরের স্টেশনে গিয়ে কুলিগিরি করেও কয়েকটা পেট চালিয়ে নিত। কিন্তু গত বছর সেই যে সান্নিপাতিক জ্বর গেল, তা থেকে কোনোমতে বেঁচে উঠলেও শরীরে আর কোনো বস্তু রেখে যায়নি। কীভাবে এ বছরে চাষ করেছে তা কেবল ভগবানই জানেন আর সে জানে।
তবু তখন কিছু চাল দিয়েছিল মহাজন, পেট তখন ভরা থাকত। কিন্তু এখন? আধপেটা— না খেয়ে?
শুধু যদি আর একটু দাঁড়াতে পারত বলাই। আরও একটু বড়ো হত। আর খানিকটা চওড়া-চিতেন হত বুক, জোর থাকত হাতে। যদি আর একটু বুঝতে পারত যে, আগ বাড়িয়ে দুনিয়ার টুটি চেপে ধরতে না পারলে দুনিয়াই মানুষের গলা টিপে ধরে।
কিন্তু পনেরো বছর বয়সেও ছেলেটা একেবারে ছেলেমানুষ। মাইতিদের বাড়িতে কলের গান শুনেছে, সেই গান গুনগুন করে রাতদিন। একটা কাজ করতে বললে সাত বার ভুলে যায়, এখনও বনে-বাদাড়ে কুড়িয়ে বেড়ায় নীলকণ্ঠ পাখির পালক, এখনও কোঁচড় ভরে নিয়ে আসে লাটা আর কুঁচফল। বলাই এখনও লড়তে শিখল না।
