এ-পাড়ায় থাকেন না, থাকেন বাদুড়বাগানে। ছাপাখানার সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই। মার্চেন্ট অফিসে চাকরি করেন, অন্য সময় ইনসিয়োরেন্সের দালালি করেন। কী সুত্রে, কবে যে সুধীরের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছিল, সুধীরও মনে করতে পারে না সেকথা। কিন্তু পুণ্ডরীকবাবু ঠিক জেনে ফেলেছেন, আমি এলেই খাবার আসবে। এবং খাবার এসে পৌঁছনোমাত্র–
এই যে সুধীরবাবু, ভালো তো?–মুখের কাঁচাপাকা দাড়ির ভেতর দিয়ে দাঁতের ছটা বেরিয়ে আসে তাঁর : সুকুমারবাবুর খবর সব ভালো? বলেই চেয়ার টেনে বসে পড়েন, তারপর নাক কুঁচকে বাতাস শুকতে-শুকতে বলেন, বাঃ, কী এল? পুডিং নাকি? বেড়ে গন্ধটি বেরিয়েছে তো? পুডিং খেতে আমি ভীষণ ভালোবাসি মশাই।
পরের অবস্থা বুঝতেই পারো। তখন আর তাঁকে বাদ দিয়ে খাওয়া যায় কিছু? হয় আর-এক প্লেট, আনাতে হয় তাঁর জন্যে, নইলে আমাদের থেকেই ভাগ দিতে হয়। আর কী মন দিয়ে যে খান! পুডিংয়ের প্লেট দুহাতে মুখের কাছে ধরে চাটতে থাকেন, কাটলেটের হাড়ফাড় চিবিয়ে একেবারে পাউডার! দাড়িতে দৈবাৎ একটা পেঁয়াজকুচো লেগে থাকলে সেটাকে খুঁজে বের করে মুখে পুরে, তবে নিশ্চিন্তি।
আমরা বলি, পুণ্ডরীকবাবু আপনি ভটচাজ বামুন, খুব নিষ্ঠাবান, দুবেলা গঙ্গাস্নান করেন, জামার তলায় রুদ্রাক্ষের মালাও রয়েছে। মুরগির ডিম-দেওয়া পুডিং খান কেন, মুরগির হাড়ই বা চিবোন কী বলে?
পুণ্ডরীকবাবু খুশি মনে দাড়ি মুছতে মুছতে বলেন, আপনিও তো বামুনের ছেলে, আপনি খান কেন?
আমি সন্ধ্যা-আহ্নিক করি না, গঙ্গাস্নানেও যাই না। কিন্তু আপনি এমন সাত্ত্বিক হয়েও
আরে, অগস্ত্যের বংশধর না?-হা-হা করে হাসেন পুণ্ডরীকবাবু : অগস্ত্য মুনি কী করেছিলেন, মশাই? পুরাণের কথা মনে নেই? একটা গোটা অসুরকেই হজম করে ফেলেন। মুরগি তো তার কাছে তুচ্ছ জিনিস, মশাই।
মোক্ষম যুক্তি যাকে বলে!
পুণ্ডরীকবাবুকে খাওয়াতে সুধীরের আপত্তি নেই, তার মনও ছোট নয়। কেউ যদি খেতে ভালোবাসে, তাকে খাইয়ে ভালোও লাগে। কিন্তু খাওয়ার লোভ জিনিসটাই বিশ্রী।
পুণ্ডীকবাবুর খাওয়া দেখলে, খাবারের দিকে তাঁর জ্বলজ্বলে চাউনি দেখলে, দুহাতে তুলে প্লেট চাটতে দেখলে এমন জঘন্য লাগে যে, কী বলব! কখনও কখনও দস্তুরমতো গা বমিবমি করে।
লোকটি যে গরিব, খেতে পান না, তা তো নয়। তা হলে মায়া হত। চাকরিটা ভাল করেন, ইনসিয়োরেন্সের কাজ করে বেশ দুপয়সা পান, বাদুড়বাগানে পৈতৃক বাড়ি–তার একতলা-দোতলা থেকে শতিনেক টাকা অন্তত ভাড়া পান, দমদমে একটা বড় বাগানও আছে। যে-কোনও সাধারণ গেরস্তর চাইতে ঢের বেশি বড়লোক তিনি। অথচ ওই স্বভাব-পরের পয়সায় খেয়ে বেড়াবেন।
আবার ভণ্ডামিও আছে। প্রায়ই বলেন, একদিন সুধীরবাবু আর সুকুমারবাবুকে আমার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গিন্নীর হাতের পোলাও, তপসে মাছের ফ্রাই, দই-ইলিশ আর মাংসের কোর্মা খাওয়াব। আমার গিন্নী এসব যা রাঁধেন, বুঝলেন–বলতে বলতে সুড়ৎ করে জিভের জল টেনে নেন একবার খেলে জীবনে আর কোনওদিন ভুলতে পারবেন না।
ভুলতে আমরা চাই না, কিন্তু খাওয়ার চানস আর পাচ্ছি কোথায়! তিন বছর ধরে পোলাও-ফ্রাই-কোর্মার গল্পই শোনাচ্ছেন কেবল, কিন্তু একপেয়ালা চা পর্যন্ত কখনও খাওয়ালেন না।
আশ্চর্য এই যে, যেদিন খাবার নেই, সেদিন পুণ্ডরীকবাবুও নেই। শুধু চা এলে পুণ্ডরীকবাবু আসেন না। চা তিনি খান না, বলেন, ওসব বিদেশী পানীয়, ব্রাহ্মণের খেতে নেই। তা ছাড়া চা খেলে খিদে নষ্ট হয়, জুত করে খাওয়া যায় না।
এইটেই আসল কথা। মুরগি খেলে ব্রাহ্মণের কিছু হয় না, আর কটা শুকনো পাতা একটু দুধ আর চিনি মিশিয়ে খেলেই ধর্মকর্ম গেল? কী লোক—দেখেছ!
আমাদের গোড়ার দিকে সমস্যা ছিল, কী করে টের পান পুণ্ডরীকবাবু। কোনও যোগবল-টল আছে নাকি ভদ্রলোকের? আমাদের জন্যে চপকাটলেট কারিফ্রাই পুডিংয়ের অর্ডার গেলেই মন্ত্রের জোরে টের পেয়ে যান, আর তৎক্ষণাৎ মুখভর্তি কাঁচা-পাকা দাড়ি আর জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে হাওয়ায় উড়ে পৌঁছে যান দোতলার ঘরে : বাঃ, কী এল আজ? কবিরাজী কাটলেট? গন্ধেই মাত হয়ে গেছে, মশাই! বেড়ে তৈরি করে কিন্তু আপনাদের রসনারঞ্জন রেস্তোরাঁ।
অতএব ভাগ দিতে হয়। চোখ বুজে মনের সুখে মুরগির হাড় চিবুতে থাকেন পুণ্ডরীক, আর সুধীর আর আমি মনে-মনে যা বলতে থাকি
যা বলতে থাকি, সে আর তোমাদের শুনে কাজ নেই। মোটের উপর, সেটা পুণ্ডরীকের দীর্ঘ-জীবন কামনা নয় বলাই বাহুল্য।
অবশ্য–টের পান কী করে, একটু গোয়েন্দাগিরির সাহায্যে সেটা আবিষ্কার করেছি আমরা। রেস্তোরাঁর বাঁ দিকে রেডিয়োসারাইয়ের ছোট দোকান আছে একটা। রোজ বিকেলে সেখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকেন পুণ্ডরীকবাবু, দোকানদারের সঙ্গে অকারণ খোশ-গল্প করেন আর কড়া নজর রাখেন রেস্তোরাঁর দিকে। যেই খাবারের ট্রে তোয়ালে ঢাকা দিয়ে সুধীরের প্রেসের দিকে রওনা হল, তৎক্ষণাৎ
সুধীর বলে, লোকটা ছিনে জোঁক রে।
আমি বলি, কী আর করবি? ওঁর জন্যে একটা বাড়তি প্লেটের অর্ডার দিয়ে রাখিস, তা হলেই আর ঝামেলা থাকে না।
সুধীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
আমার মনে হয় কী জানিস? মরবার পরেও আমার সঙ্গ ছাড়বে না।
আমি বলি, বোধহয় না। স্বর্গে গিয়ে তুই থালা নিয়ে বসেছিস, সঙ্গে সঙ্গে এসে বলবে, কী খাচ্ছ হে? বেড়ে জিনিস তো।
