কাকে বলে সে-কি আমিই জানি। কোথায় যেন দেখেছিলুম শব্দটা। বললুম, নামে কী আসে যায়, চালিয়ে দিন না। জাঁদরেল নামেরও তো গুণ আছে একটা।
এবার ঊ। ঊ-ঊ–নাঃ, ঊ বড় বেয়াড়া, ঊর্ধ্বময়ী ছাড়া কিছু মনে আসছে না। আর ঊর্ধ্বময়ী নাম দিলে–
গজাননদা বললেন, মাসিমা ভাবতেন–তাঁর ছাগলের ঊর্ধ্বলোক, মানে মৃত্যু কামনা করা হচ্ছে। তা হলেই প্রাইজের আশা ফিনিশ! ওসব চলবে না। তা ছাড়া প্যালারাম, তুমি যেভাবে অ-আ-ই-ঈ-চালাচ্ছ–
ঈ বাদ দিয়েছি তো। ওতে ঈশ্বরী ছাড়া আর কিছু হয় না।
না না, ঈশ্বরী নয়। ঈশ্বরী ছাগল মানে স্বর্গীয় ছাগল, উর্ধ্বময়ীও তাই। ডেনজারাস। আমি বলি কি প্যালারাম, এই স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণের প্যাঁচ ছাড়ো-নইলে গোটা দিনেও শেষ হবে না যে! গজাননদা কাতর হয়ে বললেন, ওদিকে তালের বড়াগুলো ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে!
তালের বড়ার নামে আমাকেও প্ল্যান বদলাতে হল!
তা হলে শর্টকাট করা যাক। লিখুন ক-এ কুসুমিকা, খ-এ-আচ্ছা খ থাক–গ-এ গরবিনী, ঘ-এ ঘোরাননা? না ঘোরাননা বাজে–মাসিমা ভাববেন, তাঁর ছাগলের মুখ ঘোড়ার মতো বলা হচ্ছে, চ- এচ-এ চিত্রলেখা।
না-না, চিত্রলেখা তোমার বৌদির নাম!–গজাননদা আর্তনাদ করলেন : ছাগলের ও-নাম দিলে তোমার বৌদি আর রক্ষে রাখবে না, তালের বড়া আর তালক্ষীর একেবারে গেল।
আমি ভয় পেয়ে বললুম–ছেড়ে দিন–ছেড়ে দিন। তা হলে চ-এ চারুপ্রভা, ছ-এছ-এ ছাগলিকা, জজ-এ জয়ধ্বজা, ঝ-এ-ঝ-এ ঝঞ্ঝিকা–।
ঝঞ্জিকা! ঝড়-টড় নাকি? না না, ওসবের মধ্যে যেয়ো না।–গজাননদা ছটফট করতে লাগলেন : প্লিজ প্যালারাম, শর্টকাট করো–তালের বড়াগুলো
ঠিক–তালের বড়াগুলো। আমিও উত্তেজিত হয়ে উঠলুম : তা হলে আর বর্ণমালা নয়, অ্যাট র্যানডম–মানে যা মনে আসে। লিখে যান–বিচিত্রিতা, নবরূপা, মনোহরা
মনোহরা কি একটা খাবার নয়? মাসিমা ভাববেন, কে তার ছাগলকে কেটে খাওয়ার
তা হলে মনোরমা। লিখুন পল্লবিকা, পাতা-টাতা খায়, ফুল্লনলিনী-দেবভোগ্যা–
গজানো আবার বাধা দিলে : দেবভোগ্যা? সে তো ঘিয়ের বিজ্ঞাপনে লেখে হে! তুমি কি ঘি দিয়ে ছাগল রান্না-টান্নার পরামর্শ দিচ্ছ?
থাক–থাক। লিখুন দেবকন্যা, টঙ্কারিণী, ডামরী
বেজায় শক্ত ঠেকছে।
হোক শক্ত। ব্রহ্মময়ী নামটাই বা কী এমন নরম? অমন নাম যাঁর, কড়া নামেই হয়তো তিনি খুশি হবেন। লিখে যান শূরসুন্দরী, সুখময়ী
লিস্টি যখন শেষ হল, তখন পুরো আঠাশটা নাম।
আমি বললুম, আরও দুটো মনে পড়েছে। য-র-ল-ব-হ-ক্ষ–লিখুন, হংসপদিকা, ক্ষুরেশ্বরী
ক্ষুরেশ্বরী?
ক্ষুরের ঈশ্বরী যে। অর্থাৎ কিনা–মাসিমার ছাগলের মতো ক্ষুর আর কোনও ছাগলেরই নেই।
রাইট। ক্ষুরেশ্বরী চলতে পারে। কিন্তু প্যালারাম, লিস্ট একটু বড় হল না?
তা হোক। লটারিতে বেশি টিকিট কিনলে প্রাইজের আশাও বেশি– বুঝতে পারেন তো? দিন, দিন পাঠিয়ে একটা লেগে যাবে নির্ঘাত।
ফুল-চন্দন পড়ুক তোমার মুখে।
ফুল-চন্দনের আগে তালের বড়া পড়া দরকার। আর পঁচিশ টাকা কমিশন।
নিশ্চয়–নিশ্চয়। সে আর বলতে। তবে পঁচিশ টাকা একটু বেশি হল না প্যালারাম? যদি কুড়ি টাকা দিই?
আমি চটে বললুম, বলেন কী? লিস্ট ফেরত দিন আমার।
আচ্ছা-আচ্ছা, পঁচিশ টাকাই যাক। চলো তালের বড়া খেয়ে আসা যাক।
বিস্তর খাটুনি হয়েছিল। উৎসাহিত হয়ে তালের বড়া খেতে গেলুম।
খেতে-খেতে এবার মিটমিট করে হাসতে লাগলেন গজাননদা।
কী হল, হাসছেন যে?
জানো, ভুতো এসেছিল কাল।
ভুতোদা?
হ্যাঁ, আমার আর একমাসতুতো ভাই। এক নম্বর গবেট। আমার কাছ থেকে আবার নামের সাজেশন চায়!–গজাননদা বললেন, তা দিয়েছি বলে।
কী বলে দিলেন?
আন্দাজ করো দিকি?–চোখ মিটমিট করতে লাগল তাঁর।
বলতে পারলুম না।
গঙ্গারাম। ও যেমন হাবা গঙ্গারাম–তাতে ওনাম ছাড়া ওকে আর কী দেব। শুনে ধন্যি হয়ে চলে গেল। হা হা হা
শুনে আমিও হাসলুম : হা হা হা
প্রাইজের রেজাল্ট বেরুবে পরের রবিবার। পঁচিশ টাকার আশায়-আশায় খবর জানতে গেলাম।
দেখি, গজানো আরশোলার মতো মুখ করে বসে।
পাননি প্রাইজ?
নাঃ- হাঁড়ি ফাটার মতো আওয়াজ করে গজাননদা বললেন, তোমার ইন্দীবরী–আজীবনী–অপরূপা ফুলনলিনী হংসপদিকা–সব চিত। প্রাইজ কে পেয়েছে, জানো? ভুতো।
অ্যাঁ।
হ্যাঁ, সেই গঙ্গারাম! একত্রিশজন বোনগো-বোনঝি বাংলা ডিকশনারি উজাড় করে দিয়েছিল। মাসিমা বললেন, ছাগলের নামে ওসব কাব্যি দিয়ে কী হবে। গঙ্গারাম। আহা-মা গঙ্গা, তায় রাম-নাম! নাম করতেই পুণ্যি।–বলে, ছাগলটার পায়ে চুপ করে একটা পেন্নাম করে প্রাইজটা ভুতোকেই দিয়ে দিলেন।
আমি হাঁ করে চেয়ে রইলাম। আজও বাড়ির ভেতর থেকে ভাদ্র মাসের তালের বড়ার। গন্ধ আসছিল, কিন্তু বৌদি যে সে বড়া আমায় খেতে দেবেন, সে-ভরসা আর হল না আমার।
পরের পয়সায়
একেবারে সময় মতো এসে পড়েন পুণ্ডরীকবাবু। যাকে বলে, তাক বুঝে।
আমার ছেলেবেলার বন্ধু সুধীর ঘোষের একটা বড় ছাপাখানা আছে। মাঝে মাঝে সন্ধের পর আমি সেখানে গল্প-টল্প করতে যাই। সুধীরের প্রেসের উলটো দিকে এ-তল্লাটের একটা নামকরা রেস্তোরাঁ রয়েছে। আমি গেলে সুধীর প্রায়ই না-খাইয়ে ছাড়ে না। কখনও গরম কাটলেট আনায়, কখনও পুডিং, ওমলেট। সুধীর নিজে খেতে ভালোবাসে, খাওয়াতেও।
দোতলায় ওর অফিস-ঘরের নিরালায় আমাদের খাওয়া চলে, আড্ডাও হয়। আর কী আশ্চর্য, যেই বেয়ারা খাবারের ট্রে-টা নিয়ে ঘরে এল, অমনি তার পেছনে ঢোকেন পুণ্ডরীকবাবু। পুণ্ডরীক ভটচাজ।
