তুই কী মনে করিস, অমন লোভী লোক কখনও স্বর্গে যাবে?
না গেল! নরক থেকেও দৌড়ে আসবে। স্বর্গের কোনও দারোয়ান ওকে ঠেকাতে পারবে না।
স্বর্গে ধাওয়া করুন আর নাই করুন, মর্ত্যে যে তাঁর হাত থেকে কোথাও নিস্তার নেই, তার প্রমাণ পেতেও দেরি হল না।
গরমের সময় দিন-পনেরোর জন্যে দার্জিলিঙে বেড়াতে গিয়েছিল সুধীর। ফিরে এসেই পরের দিন সকালে সোজা আমার বাড়িতে।
কী রে, কেমন বেড়ালি? এই পনেরো দিনে ওজন-টোজন কিছু বাড়ল?
ধুত্তোর ওজন।–সুধীর একেবারে খ্যাঁচম্যাচ করে উঠল :এমন জানলে কে পয়সা নষ্ট করে যেত দার্জিলিঙে? সেই তুই যে বলেছিলি, মরলেও আমার নিস্তার নেই, নরক থেকে তেড়ে আসবে? ঠিক তাই।
তার মানে?
মানে বুঝিসনি? সেখানেও পুণ্ডরীক ভটচাজ।
অ্যাঁ।
হ্যাঁ। আদি আর অকৃত্রিম। সেই দাড়ি, সেই দাঁত, বাড়তির মধ্যে গলায় একটা হলদে মাফলার, ভালুকের মতো একটা কোট আর একটটা ধুসো চাদর।
বলিস কী! পুণ্ডরীকবাবুও বেড়াতে গিয়েছিলেন নাকি ওখানে?
খেপেছিস।–নিমপাতা খাওয়ার মতো মুখ করল সুধীর : পয়সা খরচ করে বেড়াতে যাবে, সেই পাত্তর কি না পুণ্ডরীক ভটচাজ। দার্জিলিঙে ওর এক মেয়ে-জামাই থাকে, তাদের ছেলের অন্নপ্রাশন, সেই জন্যে তারাই খরচ পাঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ওকে। বেশ পরস্মৈপদী বেড়ানো, খাওয়া-দাওয়া। আর নাতিকে বুড়ো অন্নপ্রাশনে কী দিয়েছে, জানিস? স্রেফ একখানা বর্ণপরিচয়–ছআনা দামের।
তোকে কে বললে, এসব?
নিজেই। বললে, অন্নপ্রাশনে সোনা-টোনা দেবার কোনও মানেই হয় না। বিদ্যের মতো, অমূল্য রত্ন আর কিছু নেই–তার ওপরে আবার বিদ্যাসাগরের বর্ণ-পরিচয়। এর চাইতে ভালো কী আর হতে পারে।
আমি বললুম, ডেনজারাস।
ডেনজারাস বলে ডেনজারাস! মরুক গে, বুড়ো তা নাতিকে যা-খুশি দিক, আমার কিছু আসে যায় না তাতে। বুঝলি, রোজ সকালে হোটেলে আমার ঘরে যেই ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেছে, অমনি দাড়ি আর দাঁত নিয়ে এসে হাজির। আর ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে বলে রুটি-মাখন, ডবল-ডিমের ওমলেট, কলা, আবার মিষ্টিও দেয়। বাঃ বাঃ। আমার মেয়ের বাড়িতে সকালে রুটি-মাখন ছাড়া আর কিছুই হয়-টয় না। রুটিগুলো তো খুব ভালো দেখছি, আর কী গন্ধই বেরিয়েছে ওমলেটের–বেড়ে।সুধীর দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল : তারপরে তো বুঝতেই পারছিস।
বিলক্ষণ।
বিকেলে জলখাবার খেতে দেবে, তখনও এসে হাজির। ওটা কী খাচ্ছ হে, কাটলেট? আমার মেয়ের ওখানে এসব দেয়-টেয় না! তা কাটলেটটা খেতে খুব ভালো তাই না? এখানকার মুরগিগুলো যা পুরুষ্ট!–সুধীর আবার দাঁত কিড়মিড় করল : মধ্যে-মধ্যে ইচ্ছে করত, পুণ্ডরীককে দিই একদিন পাহাড় থেকে ঠেলে নীচের ঝর্নাটার ভেতরে। সে তো আর পারা যায় না, তাই কলকাতায় চলে এসেছি। নইলে আরও কিছুদিন থাকতুম রে। ভারি চমৎকার সিজন এখন ওখানে বৃষ্টি নেই, রোজ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়।
তা হলে পুণ্ডরীকবাবু রয়ে গেলেন দার্জিলিঙে?
সেই বান্দা!-সুধীর বাঘাটে গলায় বললে, যেই শুনল আমি আসছি, সঙ্গে সঙ্গে বাক্স নিয়ে দার্জিলিঙ মেলে এসে উঠল। বললে, একসঙ্গে যাওয়া যাক। আর শিলিগুড়ি ইস্টিশনে বেশ করে আমার পয়সায়—
হুঁ!
সুধীর একটু চুপ করে থেকে বললে, শোন, এবারে নির্মম প্রতিশোধ নেব একটা।
কী রকম?–আমি বেশ উৎসাহ বোধ করলুম।
তোকে এখন সবটা বলব না সুধীরের চোখ জ্বলতে লাগল : কাল সন্ধেয় আসতে বলেছি পুণ্ডরীককে। লেটুস আর টোম্যাটো দিয়ে তৈরি ইতালিয়ান ওমলেট খাওয়াব বলে। তুইও অবশ্য আসবি।
লেটুস আর টোম্যাটোর ইতালিয়ান ওমলেট!–আমি খাবি খেলুম। শুনিনি তো কখনও।
এবারে শুনবি।–সুধীর উঠে দাঁড়াল : তা হলে কাল চলে আসিস আমার অফিসে। ঠিক ছটায়।
.
গিয়ে দেখি, আমার আগেই আজ এসে গেছেন পুণ্ডরীকবাবু। আজকে আর তাঁর রেডিয়োর দোকানে ওত পেতে বসে থাকতে হয়নি সুধীরই তাঁকে খেতে ডেকেছে। আনন্দে দাড়িসুদ্ধ চকচক করছে পুণ্ডরীকবাবুর।
আমাকে দেখেই একগাল, মানে, একদাড়ি হেসে বললেন, এই যে সুকুমারবাবু, ভালো আছেন? বেশ আনন্দে কটা দিন কাটানো গেল দার্জিলিঙে, সুধীরবাবুর সঙ্গে।
সুধীর ঘোঁত করে একটা আওয়াজ করল কেবল।
পুণ্ডরীক আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় দরজা ঠেলে ঢুকল রসনারঞ্জন রেস্তোরাঁর বেয়ারা। ব্যস, কথা বন্ধ–পুণ্ডরীক জুলজুল করে চেয়ে রইলেন ট্রের দিকে।
তিনটে প্লেটে তিনটে কোলবালিশের মতো মোটা-মোটা ওমলেট। কিন্তু তাদের রঙ ঘন সবুজ, তাতে লালের ছিটে। অমন ওমলেট আমি কখনও দেখিনি।
একটা নকশাকাটা বাহারে প্লেট তুলে নিয়ে সুধীরই এগিয়ে দিলে পুণ্ডরীকের সামনে।
কেমন সবুজ রঙ মুগ্ধ হয়ে বললেন পুণ্ডরীক।
সেদ্ধ লেটুসের পাতা বেটে দিয়েছে কিনা, তাই।
আবার লাল-লাল।
টোম্যাটোর কুচি।
তা হলে লেগে পড়া যাক– বলেই চামচে দিয়ে খানিক কেটে মুখে পুরলেন পুণ্ডরীক। আমিও একটু খেলুম। লেটুস পাতা আর টোম্যাটো মেশানো আছে বটে। খেতে অদ্ভুত, কিন্তু খুব ভালো লাগল না।
পুণ্ডরীক একটু খেয়ে বললেন, ঝালটা যেন একটু
আমি বলতে যাচ্ছিলুম : ঝাল আর কোথায় কিন্তু সুধীরের চোখের ইশারায় থেমে গেলুম। এদিকে পুণ্ডরীক বিদ্যুৎবেগে ওমলেটটা শেষ করলেন, আর করেই তার চেয়ে দ্রুতবেগে উঠে দাঁড়ালেন।
কী বলে ইতালিয়ান ইয়ে–উস উস–খেতে ভালোই–উস উস–তবে ঝালটা একটু বলতে বলতে যেন বাঘে তাড়া করেছে, এইভাবে ছুটে পালিয়ে গেলেন।
