গজাননদা থেমে থেকে একটা আধপোড়া দেশলাইয়ের কাঠি কুড়িয়ে নিয়ে চটপট বাঁ কানটা চুলকে নিলেন। তারপর মুখ বাঁকা করে বললেন, ঘাবড়াচ্ছি কেন? আরে–টু হান্ড্রেড অ্যান্ড ফিফটি রুপিজ।
অ্যাঁ!
অ্যাঁ আবার কী! আড়াইশো টাকা। ক্যাশ।
কার টাকা? কিসের ক্যাশ?–আমি কাকের মতো হাঁ করে চেয়ে রইলুম গজাননদার দিকে।
অমন জগদ্দল একটা হাঁ করেছ কী বলে?–গজাননদা এবার ডানদিকের কানটা চুলকোতে লাগলেন;–টাকা আমার ব্রহ্মময়ী-মাসিমার। তাঁরই ক্যাশ।
তালের বড়ার সঙ্গে বেশ উৎসাহ বোধ করতে করতে আমি ঘন হয়ে বসলুম।
কিছু বুঝতে পারছি না, খুলে বলুন।
ঘোঁত-ঘোঁত করতে করতে গজাননদা সবটা বিশদ করলেন।
মেসোমশাই অনেক টাকা রেখে অনেক দিন আগে স্বর্গে গেছেন। ব্রহ্মময়ী-মাসিমা সেই টাকা দিয়ে এতদিন তীর্থটীর্থ করছিলেন। মেসোমশাই নামকরা ব্রাহ্মণপণ্ডিত ছিলেন, অনেক শিষ্যও তাঁর ছিল। সেই শিষ্যদের একজন হালে মাসিমাকে একটা ছাগলছানা দিয়ে গেছেন প্রণামী হিসেবে।
এখন মাসিমার তো ছেলেপুলে নেই–এই ছাগলছানাটাকে ভীষণ ভালোবেসেছেন তিনি। এর জন্যে স্পেশ্যাল ছোলাকলা বরাদ্দ, মায় ছোট্ট একটা খাট–তাতে নেটের মশারি পর্যন্ত। কিন্তু মুস্কিল হল, এমন আদরের ছাগলের জন্যে কোনও নামই তিনি ঠিক করতে পারছেন না। এর এমন একটা নাম চাই যে, শুনলে কান জুড়িয়ে যাবে, প্রাণ ঠাণ্ডা হবে। তাই ব্ৰহ্মময়ী-মাসিমা ডিক্লেয়ার করেছেন, তাঁর ছাগলের জন্যে নাম যে ঠিক করে দেবে–তাকে তিনি আড়াইশো টাকা প্রাইজ দেবেন। ক্যাশ।
ছাগলের এই আপ্যায়ন শুনে পিত্তি জ্বলে গেল আমার। মনে-মনে ভাবলুম, শ্রীমান প্যালারাম না হয়ে ব্রহ্মময়ীর ছাগল হতে পারলে জম্মটা সার্থক হত।
গজাননদা বললেন, বুঝলে, সেই জন্যেই
বললুম, ওপন কম্পিটিশন গজাননদা?
উঁহু। ঠাণ্ডা জল ছিটিয়ে গজাননদা বললেন, তুমি যদি প্রাইজটা মেরে দেবার তালে থাকো, তা হলে সে গুড়ে বালি। কম্পিটিশন মাসিমার বোনপোদের মধ্যে স্ট্রিকটলি রেস্ট্রিকটেড। আর তাও কি কম নাকি? ব্ৰহ্মময়ী-মাসিমাকে ছেড়ে দিয়ে আমার মা আর বাকি পাঁচজনের ছেলেমেয়ে ফিট বত্রিশজন! জানো তো, আমার দুবোনের বিয়ে হয়ে গেছে, তাদের বলেছিলুম যে, তোরা পার্টিসিপেট করিসনি–তা হলে দুজন কম্পিটিটর কম হয়, তা তারা বললে, আড়াইশো টাকা যদি ফাঁকতালে পেয়ে যাই, ছাড়ব কেন? কী রকম মিননেস দেখেছ?
আমি বললুম, নিশ্চয়।
তা হলে প্যালারাম কাতর হয়ে গজাননদা বললেন, দাও না একটা নাম-টাম বলে। বাংলায় যখন লেটার পেয়েছ, তোমার অসাধ্য কী আছে? আর যদি পাই, বুঝেছ প্যালারাম, পঁচিশ টাকা কমিশন দেব তোমাকে।
একথা শুনে আমার মনটা নরম হল একটু। পঁচিশ টাকাই বা মন্দ কী! পাঁচ টাকাই বা কে দিচ্ছে আমাকে।
শুধু একটাই নাম পাঠাতে হবে?
না-সেরকম বাঁধাবাঁধি নেই কিছু।
তা হলে এক কাজ করা যাক। অনেকগুলো নাম পাঠিয়ে দিই। একটা লেগে যাবে নির্ঘাত।
সেকথা ভালো। আমি কাগজ-পেন্সিল নিয়ে আসি বরং।
গজাননদা কাগজ-পেন্সিল আনলে আমি বললুম, তা হলে প্রথম অ দিয়েই শুরু করা যাক।
অ?–গজানো আঁতকে উঠলেন : তোমার মতলব কী হে? গোটা স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ কপচাতে চাও নাকি?
আমি বললুম, ডিসটার্ব করবেন না। আমার মুড আসছে লিখে যান। প্রথমে লিখুন, অঞ্জনা।
অঞ্জনা? অঞ্জনা মানে কী?
অঞ্জন মানে কাজল। অঞ্জনা মানে কাজলের মতো যার রঙ, অর্থাৎ কিনা-কালো।
ধ্যুৎ!-গজাননদা আপত্তি করলেন : ছাগলটা মোটেই কালো নয়। লাল-সাদা কালো-হলদে এসব মিশিয়ে বেশ চিত্তির-বিচিত্তির চেহারা।
অ–চিত্তির-বিচিত্তির। তা হলে তা হলে–অপরূপা।
এটা বেশ হয়েছে– খুশি হয়ে গজাননদা বললেন, লেগে যেতে পারে। দিই পাঠিয়ে।
ব্যস্ত হবেন না–চানস নিয়ে লাভ কী? আরও লাগান গোটাকতক। এবারে আ। আ-আ-লিখুন আজীবনী।
আজীবনী। সে আবার কী?
মানে সারা জীবন বেঁচে থাকবে, এই আর কি! নামের ভিতর দিয়ে আশীর্বাদ করা হল ছাগলকে!
গজানননদা বললেন, সারাজীবন তো সবাই-ই বেঁচে থাকে, যখন মারা যায় তখন একবারেই মারা যায়! এ-নামের কোনও মানে হয় না।
আমি বিরক্ত হয়ে বললুম, আপনি তো বি-কম ফেল, সাহিত্যের কী বোঝেন? যা বলছি, লিখে যান। লিখুন আজীবনী।
আজীবনী লেখা হল।
এবারে ই। ই-ই-ই-ই-আচ্ছা, ইন্দ্রলুপ্তা হলে কেমন হয়?
ইন্দ্রলুপ্তা?–গজাননদা খাবি খেলেন : সে কাকে বলে? ও তো ইন্দ্রলুপ্ত মানে তো টাক। এ তুমি বলছ প্যালারাম! ছাগলের নাম টাক হলে মাসিমা আমায় প্রাইজ দেবেন?
তা হলে ওটা থাক। আচ্ছা ইন্দীবরী?
ইন্দীবরী?–গজাননদা ভুরু কোঁচকালেন।
ইন্দীবর মানে নীলপদ্ম।
নীলপদ্ম? বাঃ-বেড়ে।–গজাননদা বেশ ভাবুকের মতো হয়ে গেলেন : আহা, নীলপদ্ম, চোখ জুড়ায়, প্রাণ জুড়ায়। কিন্তু ছাগলটার রঙ তো নীল নয়।
তাতে কী হয়েছে? আমাদের নীলিমাদির রঙও তো নীল নয়, ফুটফুটে ফরসা। পাড়ার কাঞ্চনবাবুর রঙ মোটেই সোনার মতো নয়। স্রেফ কুচকুচে কালো। জানেন তো, কবি বলেছেন–নামে কিবা করে—
গজাননদা ফিল-আপ করলেন : ছাগলকে যে নামে ডাকো–ডাকে ব্যাব্যা করে। ঠিক, ইন্দীবরীও থাক।
বললুম, এবার উ। লিখুন-উপ-উপ-উপ—
হনুমানের মতো উপ-উপ করছ কেন?
উপেন্দ্ৰবজ্রা।–এই জাঁদরেল নাম শুনে গজাননদা বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন : ভীষণ কড়া নাম হে–উচ্চারণ করতেই হৃৎকম্প হয়। কাকে বলে?
