–আচ্ছা আর কোনও কথা বলব না। তুই বলে যা।
–মনে থাকে যেন হুঁ! এখন হয়েছে কী, জানিস? এক বুড়ির পান্তো তো চোরে হামেশা খেয়ে যাচ্ছে। বুড়িও গল্পের মতোই গোবর রাখল, শিঙিমাছ রাখল, ক্ষুর পাতল–কিন্তু চোরের কিচ্ছুটি হল না। সে হাঁড়ি থেকে শিঙিমাছটা নিয়ে গেল রান্না করে খাবে বলে, আর ক্ষুরটা নিয়ে গেল দাড়ি কামানোর জন্যে। আর যাওয়ার সময় বুড়ির ঘরের দোরে খড়ি দিয়ে লিখে গেল : আমাকে গল্পের সেই চোর পাও নাই যে ইচ্ছা করিলেই বোকা বানাইতে পারিবে।–কী রে, কেমন শুনছিস?
–বেড়ে।
–পান্তাবুড়ির গল্পের মতো লাগছে?
–না-না, কে বলে! কিন্তু তারপর?
–হুঁ, দাঁড়া না। নবাবী আমলের গল্প কিনা, অনেকদিন হয়ে গেছে, একটু ভেবে-চিন্তে বলি। হাঁ, মনে পড়েছে। বুড়ি তো রেগে-কেঁদে খুব দাপাদাপি করল, শাপশাপান্ত করল, কিন্তু তাতে চোরের কী আর হবে বল দিকি? শেষকালে বুড়ি নিরুপায় হয়ে, গিয়ে হাজির হল কাজী সাহেবের কাছে।
কাজী সাহেব?
–হ্যাঁ-হ্যাঁ, নবাবী আমলে ওঁরাই তো ছিলেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা–এসব ওঁরাই দেখাশুনো করতেন। তাই বুড়ি কাজীর কাছে গেল। বুদ্ধিমান আর দয়ালু বলে কাজী সাহেবের খুব নামডাক ছিল, তিনি পান্তো চোরের গল্প শুনলেন, অনেক বার বললেন, ওয়াহ-ওয়াহ, একবার বললেন, বহুত মসিব্বত, তারপর চোখ বুজে নিজের মেহেদী রাঙানো শাদা দাড়িতে হাত বুলাতে লাগলেন।
–এই, মুসিব্বত মানে কী রে?
–বোধহয়, ঝঞ্জাট। কিন্তু ও-সব নবাবী আমলের শব্দ, আমি অত-শত মানে জানব কী করে? তোরা বরং ইস্কুলের মৌলবী সাহেবকে জিজ্ঞেস করিস। যাই হোক, কাজী সাহেব মেহেদী রাঙানো দাড়িতে হাত বুলিয়ে কখনও বলতে লাগলেন, ইয়াহ, কখনও বললেন, ওয়াহ, একবার বললেন, বহুত পোঁচদাগী, আবার বললেন, জালিম, শেষে চোখ খুলে বললেন, ফতে!
ফতে? মানে?
–মানে ফিনিশ।
–কে ফিনিশ হল?
–আঃ, থাম না, সবটা শুনেই নে আগে। অত বকর বকর করিস কেন?
–আচ্ছা, মুখ বন্ধ করেছি। বলে যা।
কাজীসাহেব খুশি হয়ে বললেন, ওয়াহ ফতে। শোনো বুড়ি, কাল তোমার পান্তার হাঁড়ি আমার এখানে নিয়ে আসবে। আমি তাতে ওষুধ মিশিয়ে দেব। খোদা রহম করে বলে বুড়ি চলে গেল।
-বুঝেছি, আর বলতে হবে না। কাজীসাহেব পান্তো ভাতে বিষ মিশিয়ে দিলেন, আর তাই খেয়ে চোরটা
উঁহু, উঁহু! অর্ধেকটা কেবল বুঝেছিস। বুড়ির হাঁড়ি খেয়ে চোরটা অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, ধরাও পড়েছিল, কিন্তু কাজীসাহেব ওষুধ মেশাননি, কোনও বিষও নয়। সেই নবাবী আমলে মানুষ এত ছোটলোক ছিল না, তা জানিস?
–বিষ নয়, ওষুধ নয়, তবে চোরটা অজ্ঞান হল কী খেয়ে?
–কেন? পান্তোর সঙ্গে কাজীসাহেব মিশিয়ে দিয়েছিলেন এক মুঠো ঘি-চপচপে মোগলাই পোলাও। রাজা বাদশারা যা খেয়ে থাকে।
-সে তো অতি চমৎকার। তাই খেয়ে?
হুঁ, তাই খেয়ে। আরে, পান্তো-খাওয়া চোরের নাড়িতে মোগলাই জর্দা-পোলাও সহ্য হয় কখনও? মুখে দিয়েই চোরের মাথা ঘুরে গেছে, তিনদিন পরে তার জ্ঞান হয়। আনাড়িরা যদি জর্দা কিংবা দোক্তা খেতে যায়, তা হলে তার যা হয়, তাই।
যাঃ, বাজে কথা। গল্প তো নয়, স্রেফ গুল। –গুল? তবে শুনছিলি কেন বসেবসে? পালা পালা এক্ষুনি এখান থেকে গেট আউট!
নামরহস্য
আমার জ্ঞাতিভাই গজানন গাঙ্গুলী ফোঁত করে নাক দিয়ে আওয়াজ করলেন একটা। ঘোঁত-ঘোঁত করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ছাগলের কী-কী নাম হতে পারে হে প্যালারাম?
এমন একটা বেয়াড়া প্রশ্নে আমি ঘাবড়ে গেলুম। ছাগলের কী নাম হতে পারে এ-নিয়ে আমি কখনও ভাবিনি। পরীক্ষায় এরকম কোশ্চেন কোনওদিন আসেনি।
আমি ঘাড়-টাড় চুলকে বললাম, ছাগলের নাম কী আর হবে। যাঁরা বাঁদর নাচায়, তাদের সঙ্গে তো প্রায়ই একটা ছাগল থাকে দেখি। তারা তাকে গঙ্গারাম বলে ডাকে। আমার ধারণা, সব ছাগলেরই নাম গঙ্গারাম।
বিকট মুখ করে গজাননদা বললেন, তোমার মুণ্ডু। নিজের নাম প্যালারাম, তাই গঙ্গারাম ছাড়া আর কীই বা ভাববে তুমি? অথচ তুমি না পরীক্ষায় বাংলায় লেটার পেয়েছিলে?
বাংলায় লেটার পাওয়াটা খুব অন্যায় হয়ে গেছে আমার, স্বীকার করতে হল সেকথা। ছাগলের নাম কী কী হতে পারে, এ যার জানা নেই, তার লেটার পাওয়ার এক্তিয়ার নেই কোনও।
আমার খুব অপমানবোধ হল। বিরক্ত হয়ে বললুম, ছাগলের কী আবার নাম হবে? রুমকি, টুমকি, মেনি—
যেই মেনি বলেছি, গজাননদা অমনি ফ্যাঁচ করে উঠলেন।
মেনি? তোমার মাথা! মেনি তো একচেটে বেড়ালের নাম, ছাগলের হবে কী করে? বোর্ডের উচিত, তোমার লেটারটা কেটে দেওয়া।
এবার আমি চটে গিয়ে বললুম, তা হলে আপনিই বলুন না, ছাগলের কী কী নাম হয়?
আমিই যদি জানব, তাহলে তোমায় জিজ্ঞেস করব কেন হে? ভেবেছিলাম তোমার একটু বুদ্ধিশুদ্ধি আছে, হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছ, তুমি একটা বাতলে দিতে পারবে। এখন দেখছি, তোমার মাথায় স্রেফ ড্রায়েড কাউডাং-অর্থাৎ কিনা খুঁটে।
বৌদি বাড়ির ভেতরে তালের বড়া ভাজছেন, বাতাসে তার প্রাণকাড়া গন্ধ আসছে। বৌদি আবার বলে গেছেন, দুটো তালের বড়া খেয়ে যেয়ো প্যালারাম, তালক্ষীরও করে রেখেছি। এসব জটিল ব্যাপার না থাকলে অনেক আগেই উঠে পড়তুম আমি-ছাগলের নাম নিয়ে এ অপমান কে সহ্য করত এতক্ষণ!
আমি বললুম, আপনিই বা এ-নিয়ে এত ঘাবড়াচ্ছেন কেন? ছাগলের নাম যা-খুশি হোক না, আপনার তাতে কী! আপনি তো আর ছাগল পোষেন না।
