কম্পিত গলায় নিশি বললে, হয়েছে, চল চল।
চৌকিদার বললে, লাশ দুটো কী হবে বাবু?
থানায় খবর দে, ওরা যা খুশি করুক। যত সব কর্মভোগ—হরে কৃষ্ণ!
আবার অন্ধকার, বাঁশঝাড়ের পথ, হাওয়ায় বাঁশবনের একটানা শব্দ ঘুণে-খাওয়া ছিদ্রপথে যেন পেতনির কান্না বাজছে। ভয়ে নিশি কর্মকারের কোনো দিকে চোখ তুলে চাইতে সাহস হল না। অসীম আতঙ্কে কেবলই মনে হতে লাগল সমস্ত বাঁশবনের পথজুড়ে অসংখ্য মড়া ছড়িয়ে রয়েছে, তাদের কালো কালো শুকনো পাগুলো যেন ভূতের পা। আর বাঁশের আগায় আগায় গলায় কাপড়ের ফাঁস পরিয়ে ঝুলে রয়েছে অগণ্য নারীদেহ। তাদের সম্পূর্ণ উলঙ্গ দেহগুলো একটা ভয়ানক দুঃস্বপ্ন। চারদিকে কি আজ মৃত্যুর সভা বসেছে।
উত্তপ্ত কপাল বেয়ে টপ টপ করে ঘাম পড়তে লাগল নিশির। এই মৃত্যু, এই অপঘাত, এদের জন্য দায়ী কে? দৈব?
হরিসভা পর্যন্ত এগিয়ে দেব বাবু?
চৌকিদারের প্রশ্নে একটা আকস্মিক প্রচন্ড কম্পন নিশির পা থেকে মাথা পর্যন্ত থরথর করে ঝাঁকুনি দিয়ে গেল। তারপর সামলে নিয়ে ওষ্ঠ লেহন করে সে বললে, না চল, বাড়িতেই পৌঁছে দিবি আমাকে। কাজ আছে।
হাটখোলা পেরিয়ে নিশি কর্মকারের বাড়ি। সামনে ছোটো একটা আমের বাগান, ভালো ভালো ফজলি আর ল্যাংড়া আমের কলম লাগিয়েছে সে। নিজের বাড়ি, চেনা পথ, তবুও নিশির ভয় করতে লাগল। আজকের রাত্রিটা বিচিত্র, আজ এই কৃষ্ণপক্ষের ঘন-অন্ধকারে সমস্ত পৃথিবীজুড়ে যেন মতি পালদের প্রেতমূর্তি উঠে এসেছে! আকাশ-বাতাস-অরণ্য যেন তাদের অশরীরী ভৌতিক নিশ্বাসে আকীর্ণ।
বাড়ির সামনে পৌঁছোতেই চোখে পড়ল দরজার গোড়ায় সেই ঝরঝরে হারকিউলিস সাইকেলটা। ইব্রাহিম দারোগা অভিসারে এসেছে। শোনা যায় দুটো বিবি আর তিনটে বাঁদি আছে লোকটার, কিন্তু আগুনে ঘৃতাহুতির মতোই তাতে তার নিবৃত্তি নেই—বিশ্বগ্রাসী লালসা যাকে বলে।
বিশাখার ঘরের দরজাটা বন্ধ, ভেতরে অন্ধকার। তার মাঝখান থেকে চাপা গলার ফিসফিস আওয়াজ কানে এল। ক্ষুব্ধ নিরাশ্বাসে একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল নিশির। তারও যৌবন একদিন ছিল…
নিজের ঘর থেকে লণ্ঠনটা বার করে সেটাকে সে জ্বালাল। তারপর লণ্ঠন হাতে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল তার গোলাঘরের দিকে। আটশো মন চাল সে মজুত করে রেখেছে। বর্ষার বাজারে চল্লিশ টাকা দরে এই চালটা ছেড়ে দিলে সে শুধু লাল নয়—রক্তের মতো টকটকে লাল হয়ে যাবে। যুদ্ধের দিনকাল—মন্বন্তর যাকে বলে। কিছু যদি করে নিতে হয় তো এই সুযোগ।
গোলাঘরের দরজাটা খুলতেই বাতির আলোয় আটশো মন চালের বিশাল শুভ্র স্থূপটা ঝকঝক করে উঠল। যেন একটা রুপোর পাহাড়। রুপোর পাহাড় বই কী। মনপ্রতি যদি আটাশ টাকা লাভ হয়, তাহলে আটশো মন—
হঠাৎ একটা পচা গন্ধ এল নাকে। এখানেও পচা গন্ধ!
ঘরের টিন দিয়ে চুইয়েছে বর্ষার জল। সেই জলের স্পর্শে ওপরের চালগুলো পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে—কী বীভৎস গন্ধ! মানুষের খাদ্য—ম জননীর শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ, কী বিশ্রী বিকৃত রূপ তার।
অন্তত পঞ্চাশ-ষাট মন যে ন দেবায় ন ধর্মায় গেল কোনো সন্দেহ নেই তাতে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কাতর একটা খেদোক্তি, এই দুর্বৎসরে এমন অপচয়! বর্ষা পর্যন্ত বোধ হয় রাখা চলবে না। কালই মিস্ত্রি ডেকে ঘরটা সারিয়ে ফেলতে হবে, আর পচা চালগুলোও ফেলে দিতে হবে বাইরে, নইলে ওগুলোর সংস্রবে সব চালই নষ্ট হয়ে যাবে। ভাগ্যে সময় থাকতে তার চোখে পড়েছিল ব্যাপারটা। হঠাৎ নিশির মনে হল, কেন কে জানে, অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবে মনে হল, ঠিক এইরকম একটা পচা গন্ধই সে পেয়েছিল আর একবার। শিবপুরের হাট থেকে সে ফিরছিল। চোখে পড়েছিল মাঠের মাঝখানে একটা গলিত গোরুর দেহ আগলে বসে আছে একটা ঘেয়ো কুকুর; চারদিক থেকে শকুনেরা উড়ে উড়ে সেই মড়াটাকে ঠোকর মারবার চেষ্টা করছে আর কুকুরটা অস্বাভাবিক প্রচন্ড চিৎকার করে ক্ষুধার্ত শকুনগুলোকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
নবাবী আমলের গল্প
–আজ কিসের গল্প শুনবি?
–চোরের
–কী রকম চোর?
-দারুণ। মানে যেরকম চোর আজকাল আর দেখা যায় না, যেরকম চুরি এখন আর কোথাও হয় না। বেশ আলাদা ধরনের কিছু চাই!
হুঁ, তাহলে তো দেখছি একেবারে নবাবী আমলে চলে যেতে হয়। আচ্ছা, তাই সই। কিন্তু কেবল চোরের গল্পই বলতে হবে? চোর ধরার কথা শুনতে চাসনে?
বারে! চোর যদি ধরাই না পড়ল, তবে আর চোরের গল্প কিসের?
–আচ্ছা, ঠিক আছে। শোন–এক যে ছিল পান্তা-চোর, তার জ্বালায় কেউ ঘরে পান্তা ভাত রাখতে পারত না। রান্নাঘরের দরজা যত শক্ত করেই বন্ধ থাক, খেয়ে সে যাবেই। আর জানিস তো, সেই নবাবী আমলে সবাই রাত্তিরে পান্তা ভিজিয়ে রাখত, আর সকালে হুসহাস করে নেবু আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে সেই ভাত খেত। এখন হয়েছে কি, এক বুড়ি–
–এই থাম, আর গল্প বলতে হবে না। রামোঃ, শেষে পান্তাবুড়ির গল্প আরম্ভ করলি? সেই ক্ষুর, গোবর, শিঙিমাছ
–মোটেই না, কে বলেছে পান্তাবুড়ির গল্প?
–তা ছাড়া আর কী! পান্তা-চোর এসেছে, বুড়ি এসেছে, পান্তাবুড়ির আর বাকি রইল কি?
-তাই বুঝি? তবে উঠে পড় এখান থেকে, কেটে পড় এক্ষুনি। তাদের মোটে গল্প বলবই না। বুড়ি আর পান্তো থাকলেই পান্তাবুড়ি? এতই যদি মগজ, তা হলে আমার কাছে কেন এসেছিস গল্প শুনতে?
