আচমকা চিৎকার ওঠে, কালী মাইকি জয়।
ওদিক থেকে সমান উৎসাহে আসে তার প্রতিধ্বনি, আল্লা-হো-আকবর।
মনে হয় এখনই দাঙ্গা শুরু হল বুঝি। কিন্তু দু-দলই জানে এখনও সময় হয়নি। এ শুধু পরস্পরকে জানিয়ে দেওয়া চালাকি চলবে না, আমরাও সতর্ক আছি, আমরাও আছি প্রস্তুত হয়ে। শুধু দেখে যাচ্ছি, শুধু হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছি, যথাসময়ে দেখা যাবে কে কত বড়ো মরদ।
মুখোমুখি দু-দল–সমান সামরিক, সমান উৎসাহী। দু-চারটে খুনজখমে কোনো পক্ষেরই আপত্তি নেই। জমি নিয়ে, মেয়েমানুষ নিয়ে যা হামেশাই ঘটে থাকে, ধর্মের জন্যে তার চাইতে আরও কিছু বেশি মূল্য দিতেই রাজি আছে ওরা।
অমাবস্যা যত বেশি এগিয়ে আসছে, চিৎকারের মাত্রা বেড়ে উঠছে তত বেশি। দিনের বেলা পাঁয়তারা কষে সন্ধ্যা বেলায় ঘরে ফিরে যায় জগন্নাথ আর মন্তাই। দিনের দুই বীরপুরুষ নেতা সন্ধ্যা বেলায় আশ্চর্যভাবে অসহায়। এ এক প্রতিদ্বন্দ্বী, যার বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড়াবার সামর্থ্য নেই। শুধু পরাজয়কে মেনে নিতে হচ্ছে, স্বীকার করে নিতে হচ্ছে পৌরুষের মর্মান্তিক অপমানকে। মন্তাইয়ের বউ শাসায়, একদিন সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবে। ঘরের ভেতরে বিনিয়ে বিনিয়ে শোনা যায় জগন্নাথের বউয়ের কান্না, এবারে তার গলায় দড়ি না দিয়ে আর উপায় নেই।
গুম হয়ে দুজনেই বসে থাকে। দুজনের অবচেতন মনেই হিংস্র সাপের মতো একটা প্রচ্ছন্ন ইচ্ছা পাক খেয়ে ওঠে–কেমন হয় হাবিব মিয়াকে খুন করলে? কিন্তু শত্রুকে আঘাত করতে এখনও ওরা শেখেনি, যা শিখেছে তা শুধু আত্মঘাত।
সকাল বেলায় দলবল নিয়ে মন্তাই সবে হাবিব মিয়ার বাড়ির দিকে এগিয়েছে, এমন সময় বিশ্রী একটা কান্নার শব্দে পা আটকে গেল সকলের। কান্নাটা আসছে হাবিব মিয়ার বাড়ি থেকেই।
ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল সকলে!
সর্বনাশ ঘটে গেছে। কাল রাত্রে একটু ভালোরকম খানাপিনার ব্যবস্থা হয়েছিল, তৈরি হয়েছিল মাংস-পোলাও। কিন্তু সৈয়দি আমিরি খানার ঝাঁঝ হেলেচাষার মেয়ে লালবিবি বরদাস্ত করতে পারেনি। শেষরাত্রে বার কয়েক ভেদবমি করে তার হয়ে গেছে।
পাগলের মতো বুক চাপড়াচ্ছেন হাবিব মিয়া, তিন বিবি নাকিসুরে কাঁদবার পাল্লা দিচ্ছে। সমস্বরে। এই সুযোগ, এই কান্নার উৎকর্ষের ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে লালবিবির সৌভাগ্যটা জুটবে কার কপালে।
সমস্ত মুসলমান পাড়া বিমূঢ় আর আচ্ছন্ন হয়ে রইল। শোকটা প্রকাশ করতে না পারলে ভবিষ্যতে অসুবিধের সম্ভাবনা আছে। ঘন ঘন চোখ মুছতে লাগল, দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল সবাই। গত মন্বন্তরেও বুঝি দেশের এত বড়ো সর্বনাশ হয়নি।
মহাসমারোহে কবর খোঁড়া হল আল্লাতলিতে। তিন বিবি এসে মুর্দাগোসল করাল, পড়া হল জানাজার নামাজ। চমৎকার রঙিন শাড়ি আর ধবধবে চাদরে কাফন করা হল, হাবিব মিয়ার বড়ো আদরের লালবিবি ঘুমিয়ে রইল মাটির তলায়।
দূরে দাঁড়িয়ে হিন্দুরা বিমর্ষ মুখে এই শোকানুষ্ঠান দেখতে লাগল। মনে হল হাবিব মিয়ার শোকে তারাও অভিভূত হয়ে পড়েছে। তাদের গলায় একটি বারও কালীমায়ের জয়ধ্বনি শুনতে পাওয়া গেল না। হাজার হোক, ফুড কমিটির সেক্রেটারি হাবিব মিয়াকে চটানো চলে না।
কেলেঙ্কারিটা হল সেই রাত্রেই।
কে একজন বেশি রাত্রে বেরিয়েছিল ছাগল খুঁজতে। সে এসে চুপি চুপি খবর দিলে হাবিব মিয়াকে। বাঁধের ওপর থেকে দশমীর চাঁদের মেটে মেটে আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কারা যেন আল্লাতলিতে কবর খুঁড়ছে লালবিবির।
জিন? না, জিন নয়। নিশ্চয় মানুষ। জ্যোৎস্নায় তাদের ছায়া দেখতে পাওয়া গেছে, জিন হলে ছায়া পড়ত না।
এক হাতে দোনলা বন্দুক আর এক হাতে টর্চ নিলেন হাবিব মিয়া। ডেকে নিলেন দলবলকে। আমবাগানের ভেতর দিয়ে সতর্ক পায়ে এগিয়ে চলল দলটা।
সংবাদটা নির্ভুল। দুজন লোক। একজন শাবল মারছে আর একজন মাটি তুলছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার–কাফনের কাপড় চুরি করবে।
ধর, ধর শালাদের।
লোক দুটো পালাতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। কবরখানার উঁচু-নীচু মাটির ঢিবি আর গর্তে পা পড়ে দুজনেই ধরা পড়ে গেল। তখন দশমীর চাঁদের মেটে মেটে আলোটা এক টুকরো মেঘে ঢাকা পড়েছে, কাফন-চোরদের চিনতে পারা গেল না।
কোন শালা হারামির বাচ্চা মুর্দাকে বেপর্দা করতে চায়?
জোরালো টর্চের আলো ফেললেন হাবিব মিয়া।
শুধু লোক দুটো নয়, দলসুদ্ধ সবাই পাথর হয়ে গেছে। টর্চটা খসে গেল হাবিব মিয়ার হাত থেকে। একজন সাচ্চা মুসলমানের বেটা ধলা মন্তাই, আর একজন বামুনঠাকুর জগন্নাথ মুসলমানের মুর্দা ছুঁলে যাকে গঙ্গাস্নান করতে হয়। ধলা মাইয়ের হাতে শাবল, জগন্নাথের কনুই পর্যন্ত গোরের মাটি।
কয়েক মুহূর্ত পরে নিজেকে সামলে নিলেন হাবিব মিয়া। বিকৃত বিকট গলায় হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, মার মার, মেরে শালাদের তক্তা করে দে। দু-শালাই কাফের, ইবলিশের বাচ্চা!
কিন্তু লোকগুলো সব যেন পাথর হয়ে গেছে। মারবার জন্যে কারও হাত উঠল না, এমনকী আঙুলগুলো এতটুকু নড়ল না পর্যন্ত। শুধু সকলের বিস্মিত বিমূঢ় মনে একটা প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে—ফকির আর কালীর ভেতরে এত সহজে মিটমাট হয়ে গেল কেমন করে?
উত্তমপুরুষ
সামনে আরও পুরো দু-ক্রোশ রাস্তা।
মানিক সর্দারের পা আর চলতে চাইছিল না। ক্রমাগত মনে হচ্ছিল পেছন থেকে কে একটা শক্ত চাপ দিয়ে তার মেরুদন্ডটাকে বাঁকিয়ে দিতে চাইছে ধনুকের মতো হাঁটুর তলা থেকে পা দুটো আলগা হয়ে খসে পড়তে চাইছে। তৃষ্ণায় একরাশ কাঁকর খরখর করছে গলার ভেতরে।
