নিশি কর্মকারের চোখ নিদ্রিত। সমস্ত দেহে তার কদম্বকেশরের মতো রোমাঞ্চ, অষ্টসাত্ত্বিক ভাব একে একে প্রকট হয়ে উঠছে বুঝি। গোটা সভার উপর দিয়েই যেন ভাবের ঘোর লেগেছে। পোড়া মোমবাতি, গাঁজা, ধুনো, পোড়া কাঠ আর অর্ধসিদ্ধ খিচুড়ির একটা মিশ্রিত গন্ধে যেন নিশ্বাস আটকে আসে। মোমবাতির আলোগুলো দু-একটা করে নিবতে নিবতে ক্রমশ ম্লানতর হয়ে আসছে; ধুনির আগুনের লাল আভা বোষ্টম-বোষ্টমিদের ব্যভিচারচিহ্নিত অপরিচ্ছন্ন মুখগুলোকে অদ্ভুতভাবে একাকার করে দিয়েছে। পেটভরে যারা তাড়ি টেনে এসেছিল, তাদেরই একজন নাচতে নাচতে ধড়াস করে আছড়ে পড়ল, দশা লেগেছে নিশ্চয়। ঊর্ধ্ববাহু লোকটির লক্ষপ্ৰদান আরও উদ্দাম হয়ে উঠেছে, একটুর জন্যে ফসকে যাচ্ছে ফলটা।
বাবু, বাবু, প্রিসিডেন্টবাবু।
সুর কেটে গেল। সাক্ষাৎ ভগ্নদূতের মতো ইউনিয়ন বোর্ডের চৌকিদার এসে দেখা দিয়েছে, নিশ্চয় জরুরি ব্যাপার আছে কিছু। নাঃ, প্রেসিডেন্টগিরি করা আর পোষাল না। নির্বিঘ্নে একটু ধর্মকর্ম করবারও জো যদি থাকে।
বাবু, বাবু, প্রিসিডেন্টবাবু। উঠে আসতে হবে বাবু। সরকারি কাজ।
সরকারি কাজ। নিশি একবার ক্ষুব্ধ দৃষ্টিটা আসরের ওপর বুলিয়ে নিলে।
কীর্তন চলতে থাকুক আপনাদের। আমি ঘুরে আসছি একটু।
বাইরে এসে নিশি জাকুটি করলে, কী রে, তোদের আর সময়-অসময় নেই নাকি। এই রাত বারোটায় এত তাগিদ কীসের?
চৌকিদারের কন্ঠে উত্তেজনা, মতি পালের বউ গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে বাবু। একবার যেতে হবে।
আর মতি পাল?
সেটাও মরেছে।
আপদ গেছে। বিরক্তিতে নিশির মুখ কালো হয়ে উঠল। কিছু প্রাপ্তিযোগ আছে বটে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্যিই ঝকমারি। গ্রামে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কিংবা কেউ অপঘাতে মরলে ছুটতে হবে সেই মড়া দেখবার জন্যে, থানায় রিপোর্ট করতে হবে। এই রাত বারোটার সময় যখন কীর্তনের আসরে ভাবের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে, মহাপ্রভু গৌরাঙ্গ নিজে এসে ভর করেছেন ভক্তের ওপর, আর নামগানে কলির কলুষ ধুয়ে-মুছে নির্মল হয়ে যাচ্ছে, তখন কোথায় কে মতি পালের বউ গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে তাই দেখবার জন্য ঊর্ধ্বশ্বাসে ধাবমান হতে হবে! হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ।
বিরস মুখে নিশি বললে, চল তাহলে। কিন্তু বউটা নাহয় গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে, মতি পাল মরল কী করে?
বাঁচবে কী করে বাবু? সমবেদনা এবং ক্ষোভে চৌকিদারের স্বর রুদ্ধ হয়ে এল, না খেয়ে মরেছে। আগে ভিক্ষে করত, তিরিশ টাকা চালের বাজারে কে ভিক্ষে দেবে এখন? বউটাও আর পেটের জ্বালা সইতে পারেনি, তাই গলায় দড়ি দিয়েই ঝামেলা মিটিয়েছে।
হুঁ।
চৌকিদার উৎসাহিত হয়ে উঠল। শুধু এই একটা বাড়িই নয় বাবু। এরকম চললে দু-মাসে দেশ উজাড় হয়ে যাবে। যে-আগুন চারদিকে জ্বলছে, কারও রেহাই পাওয়ার জো আছে! দেখুন-না, দু-তিন দিনের মধ্যে আরও পাঁচ-সাতটা মরার খবর…
হয়েছে, থাম থাম। নিশি ধমকে থামিয়ে দিলে তাকে। এসব কথা ভালো লাগে না শুনতে। যারা মরছে, মরুক তারা। কাল পূর্ণ হলে মানুষকে মরতেই হবে, কেউ তো আর লোহা দিয়ে মাথা বাঁধিয়ে আসে না। না খেয়ে মরেছে, সে তত কৃতকর্মের ফল। পূর্বজন্মের দুষ্কৃতির দেনা এ জন্মে শোধ করতেই হবে—হুঁহুঁ, বিধাতার রাজ্যে অবিচার হওয়ার জো নেই।
কালো অন্ধকারে আচ্ছন্ন পথ। দু-ধারে বাঁশের ঝাড় বাতাসে শব্দ করছে। সেই শব্দে নিশি চমকে গেল। মনে হল, সেই বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে এখুনি বেরিয়ে আসবে মাংস-চর্মহীন অস্থিময় কতগুলো ছায়ামূর্তি, তিলে তিলে যারা না খেয়ে শুকিয়ে মরেছে তাদের প্রেতদেহ। আচমকা একটা ভয়ে নিশ্বাস আটকে এল তার। মনে হল সেই মূর্তিগুলো আর্তনাদ করে উঠবে— আমাদের খাদ্য, আমাদের জীবন নিয়ে লোভের ভান্ডারে জমা করেছ তুমি। তোমার ক্ষমতা, তোমার খত, তোমার আইন আমাদের প্রতিহিংসার হাত থেকে বাঁচিয়েছে তোমাকে। কিন্তু এখন? এখন? এখন?
নিশি প্রাণপণে জপ করতে লাগল, হরের্নামৈব হরের্নামৈব হরের্নামৈব কেবলম, কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব…
মতি পালের বাড়ি। চারিদিকে নানা জাতের আবর্জনা। বৃষ্টির এক পশলা জল পড়ে সে আবর্জনাগুলো আরও কদর্য হয়ে উঠেছে। ভাঙা চাল, বাঁশ খুঁটি খসে-পড়া দাওয়া। সারা বাড়ি ভরে একটা গুমোট ভ্যাপসা আবহাওয়া, তার মাঝখানে যেন ঘন হয়ে রয়েছে বাসি মড়ার গন্ধ। নাকে কাপড় চেপে ধরে নিশি সন্তর্পণে এগোতে লাগল। কোথায় অষ্টপ্রহরের আসর, আর কোথায়…
মতি পাল বারান্দাতেই পড়ে আছে। পেটের জ্বালায় দাওয়া থেকে বুঝি খানিকটা মাটি কামড়ে খেয়েছিল, একরাশ কর্দমাক্ত বমি গালের দু-পাশে জমে রয়েছে। পুরো বত্রিশটা দাঁতই তার বেরিয়ে আছে, মরবার আগে কী-একটা অসীম কৌতুকে খানিকটা পৈশাচিক হাসি হেসেছিল বলে মনে হতে পারে। পেটটা লেপটে রয়েছে পিঠের সঙ্গে, কালো নগ্ন পা-দুটোকে দেখাচ্ছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ—যেন ভূতের পা। আর সবচাইতে অমানুষিক তার চোখ, যেন ভেতর থেকে একটা প্রচন্ড ঠেলা লেগে বাইরে বেরিয়ে এসেছে তারা। একটা চোখের অর্ধেকটা খাওয়া, নিশ্চয়ই ইঁদুরে খেয়ে ফেলেছে।
সামনেই ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা। আর তার মধ্যে…
চৌকিদারের লণ্ঠনের আলোটা সেখানে পড়বার অপেক্ষা মাত্র। অবর্ণনীয় একটা আতঙ্কে দাওয়া থেকে সোজা লাফ দিয়ে নিশি একেবারে হুড়মুড় করে চৌকিদারের ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল। মতি পালের বউ গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে। শেষ সম্বল ছিন্ন লজ্জাবাস দিয়েই গলায় ফাঁস পরিয়েছে। লণ্ঠনের আলোয় সেই সম্পূর্ণ উলঙ্গ অস্বাভাবিক নারীদেহটা একটা দানবীয় বিভীষিকা যেন।
