নিশির মুখে হাসি দেখা দিল। কথাটার অর্থ সে বোঝে। সিন্দুকটা খুলে ছোটো একটা নোটের তাড়া সে দারোগার দিকে এগিয়ে দিলে। আর প্রাপ্তিমাত্রেই দারোগা অত্যন্ত সহজভাবেই নোটগুলো নিয়ে পুরল পকেটে, কালো চাপদাড়িমন্ডিত মুখোনা খুশিতে ভরে উঠেছে তার। লোকটার শরীরে বোধ হয় কিছুটা পাঠানের রক্ত আছে, সবটা মিলিয়ে একটা অমার্জিত আদিমতার আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু কোন পাষন্ড বলে যে, আজকাল রাজভক্তি লোপ পেয়ে গেছে বঙ্গদেশ থেকে? স্বদেশিওয়ালারা যত লম্ফঝম্পই করুক-না কেন, ভারতবর্ষের প্রান্তে প্রান্তে নিশি কর্মকারের মতো বিবেচক আর বুদ্ধিমান লোক পাওয়া যাবে। এ নইলে আর পুলিশে চাকরি করে সুখ ছিল কী!
একখানা রুপোর ডিশে পান আর জর্দা নিয়ে ঘরে ঢুকল বিশাখা। আড়চোখে তার দিকে এক বার তাকিয়ে একমুঠি পান আর ছটাক খানিক জর্দা হাঙরের মতো প্রকান্ড হাঁয়ের মধ্যে চালিয়ে দিলে দারোগা। পান খেয়ে খেয়ে দারোগার মুখটা কী অস্বাভাবিক লাল! হঠাৎ দেখলে মনে হয় লোকটা রক্ত খায় বুঝি।
হ্যাঁ, আর একটা কথা। চাল তো পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। তোমার আড়তে কিছু আছে। না কি? ওপরে একটা রিপোর্ট দিতে হবে।
চাল! আমার আড়তে! নিশি বিস্ময়ে হতবাক। কোথায় চাল! জ্যৈষ্ঠী মাসেই সব সাবাড় করে দিয়েছি। নিজের জন্যে সামান্য যা আছে তাতেই তো নতুন ধান ওঠা পর্যন্ত চলবে না, টান পড়ে যাবে।
কালো চাপদাড়ির ফাঁকে দারোগার জন্তুর মতো মুখে জন্তুর হাসি দেখা দিলে।
তুমি বাবা একটি সাক্ষাৎ ঘোড়েল, ছুঁড়ো কুমির। তোমার আড়ত সার্চ করলে যে এখুনি পাঁচশো মন চাল সিজ করা যায়, সে-খবর আমি পাইনি ভাবছ?
নিশি প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, হরে কৃষ্ণ! আমার আড়ত! এমন শত্রুতা আমার সঙ্গে কে করলে! আমার কি ধর্মভয় নেই একটা! পরলোকে জবাবদিহি তো করতে হবে।
ইব্রাহিম দারোগা সবিদ্রূপে বললে, থাক থাক, এই সক্কাল বেলা একরাশ মিথ্যের সঙ্গে ধর্ম বেচারাকে আর জড়াচ্ছ কেন? বিসমিল্লা বলে আমার দরগাতেই মুরগি জবাই করে দিয়ে, আমি বহাল তবিয়তে থাকলে তোমাকে ছোঁয় কে!
সেই ভরসাতেই তো আছি হুজুর।
চলি তাহলে। দারোগা উঠে দাঁড়াল। তারপর বিশাখার মুখের ওপর দৃষ্টিভোজনের মতো দুটো ক্ষুধার্ত চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, আজ বড় ব্যস্ত, কাল আসব।
ঝরঝরে একটা হারকিউলিস সাইকেলের আওয়াজ জেলা বোর্ডের বন্ধুর পথ বেয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেল।
দারোগা চলে গেলে নিশিকান্ত স্তব্ধ হয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। চাল, তা চাল তার কিছু আছে বই কী। ব্যাবসাবাণিজ্য করতে গেলে কোনো ব্যাটাই ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির হতে পারে না। তুমি যদি পরকে না ঠকাও, তাহলে পরে তোমার মাথায় আছড়ে কাঁঠাল ভাঙবে এই হচ্ছে দুনিয়ার নিয়ম। তবে দারোগা খাঁটি খবরটা পায়নি, পাঁচশো নয়, আটশো মন। বারো টাকা দরে কেনা, বর্ষার বাজারে অন্তত চল্লিশে ছাড়া চলবেই। দু-চার জন লোক তো এর মধ্যেই আনাগোনা শুরু করেছে, মিলিটারির কনট্র্যাক্ট নাকি পেয়েছে তারা। টাকার জন্যে আটকাবে, একরাশ ঝকঝকে তকতকে নতুন নোট দিয়ে যেকোনো দরেই কিনে নিতে রাজি হয়েছে। তবু বাজারের হালচাল আরও একটু দেখেশুনে নেওয়াটাই ভালো।
আপনার কাছেই যে এলাম কর্মকারমশাই।
গোলপাড়া হাটের তিন জন মহামান্য মহাজন এসে দর্শন দিয়েছে। মধুসূদন কুন্ডু, নিত্যানন্দ পোদ্দার আর জগন্নাথ চক্রবর্তী।
এসো এসো, তামাক খাও ভায়ারা। তারপর সবাই মিলে? ব্যাপারটা কী?
ব্যাপার আর কিছু নয় দাদা, হরিসভায় একটা অষ্টপ্রহরের বন্দোবস্ত করছি। শুনছি সত্যযুগ আসছে, কল্কি অবতার নামবেন মর্তে মহাপাপীদের বিনাশ করতে। দেশের যা অবস্থা হচ্ছে, তাতে নামকেত্তনটা…
নিশ্চয়, নিশ্চয়! কলির কলুষ দূর করতে ওর মতো জিনিস কি আর কিছু আছে। কলৌনাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব…
কাল সন্ধেয় তা হলে যেয়ো দাদা। কিছু চাঁদা দিতে হবে।
হরিসভায় অষ্টপ্রহর কীর্তনের বিপুল আয়োজন। আট-দশটা কাটা কলা গাছের ওপর মোমবাতি বসিয়ে আর লণ্ঠন ঝুলিয়ে তৈরি করা হয়েছে আসর। তলায় ছেড়া মাদুর পাতা, তার ওপর গাঁজার কলকে সাজিয়ে নিয়ে গোলাপাড়া হাটের মহাজনেরা জমিয়ে বসেছে। গাঁজার কলকের একটা অসামান্য মহিমা আছে–নেশাটা কিঞ্চিৎ ঘনীভূত হলে যুগপাবন কল্কি প্রভুর অবতরণটা মনশ্চক্ষেই দেখা যায়। পাপীতাপীর এবার পরিত্রাণ নেই বটে, কিন্তু নাম এবং নেশার গুণে গোলাপাড়া হাটের মহাজনেরা যে সত্যযুগ অলংকৃত করতে চলেছে, কোনো পাষন্ডই এ ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করতে পারে না।
আশপাশ থেকে একদল বোষ্টম-বোষ্টমি জড়ো হয়েছে। অষ্টপ্রহরের পরে বৈষ্ণবভোজনের ব্যবস্থা আছে। নেশায় রক্তাক্ত তাদের চোখ, আর ব্যভিচারে ম্লান পাড়ুর মুখ। যে-আলোচনা তাদের মধ্যে চলেছে, তা আর যা-ই হোক আধিভৌতিক বা আধ্যাত্মিক কিছু নয়। ওদিকে একপাশে তিনটে বড়ো বড়ো কাঠের গুঁড়ি আগুনে রক্তাভ হয়ে জ্বলছে, থেকে থেকে একজন ধূপ ছড়াচ্ছে তাতে—অষ্টপ্রহরের ধুনি। একটু দূরেই বড় একটা হাঁড়িতে খিচুড়ি চাপানো হয়েছে, বৈষ্ণবদের চোখ থেকে থেকে সেদিক থেকে ঘুরে আসছিল।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে… আসরের চারদিকে ঘিরে ঘিরে চলেছে। অসংলগ্ন কীর্তন। অল্পবিস্তর পা টলছে দু-একজনের। শুধু গাঁজা নয়, ভাবের সাগরে নিঃশেষে তলিয়ে যাওয়ার জন্যে কেউ কেউ তাড়িও টেনে এসেছে। একজন এমনভাবে খোলের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে যে, দেখে মনে হয় ওটা সে যেমন করে তোক ভাঙবেই—এই তার স্থিরসংকল্প। আর একজন ঊর্ধ্ববাহু হয়ে তান্ডব তালে আকাশের দিকে লক্ষপ্রদান করছে, যেন ওপর থেকে কী-একটা পেড়ে নামাবে, বোধ হয় ভক্তিবৃক্ষের মুক্তিফল।
