সকাল বেলা একধামা খই আর একথাবা আখের গুড় নিয়ে এসে দেখা দেয় বিশাখা নিশির সেবাদাসী।
বিশাখা নামটা তারই দেওয়া। ভেক নেবার আগে বিশাখা ছিল হাড়ির মেয়ে, নাম ছিল কষ্টবালা। কিন্তু গলায় তুলসীর মালা পরিয়ে তার সমস্ত কষ্ট দূর করে দিয়েছে বৈষ্ণবতিলক নিশি কর্মকার। আপাতত সে শ্রীরাধার অনুচারিণী এবং নিশির বৃন্দাবনলীলার লীলাসঙ্গিনী।
আজও সকালে নিয়মমতো খইয়ের ধামা হাতে বিশাখার আবির্ভাব হল।
বহুদিন পরে নিশি এক বার চোখ তুলে তাকাল বিশাখার দিকে। আজ প্রায় পাঁচ বৎসর ধরে সে এমন করে ওর মুখের দিকে তাকাতে ভুলে গিয়েছে। বার্ধক্য এসে ওকে সরিয়ে নিয়েছে তার জীবন থেকে; কিন্তু এই সকালে বিশাখা সদ্য স্নানের পর চন্দন সেবা করে এসেছে, তেল আর চন্দনের চমৎকার সুগন্ধের সঙ্গে খানিকটা প্রথম সূর্যের আলো ওর মুখের ওপর পড়ে ঝলমল করে উঠল। তড়িৎচমকের মতো নিশির মনে হল, তারই বয়স বেড়েছে শুধু, তারই জীবনগ্রন্থির সমস্ত রস গেছে শুকিয়ে; কিন্তু যৌবনের ভরা লাবণ্যে বিশাখা এখনও টলমল করছে শতদল পদ্মের মতো। এত মধু, এত প্রচুর মাধুরী, আজ তার এ আস্বাদন করবার অধিকার নেই, সামর্থ্যও নেই। সিন্দুকের জমানো সোনার তালগুলোর মতো রূপের এই প্রতিমাকে সে পাহারাই দিয়ে চলেছে, রাজভান্ডারে সে প্রহরী মাত্র। হাত বাড়িয়ে খইয়ের ধামাটা নেবার কথা তার মনেই রইল না।
আজ তোকে ভারি চমৎকার দেখাচ্ছে সখী।
সখী মুখ ঘুরিয়ে নিলে। নিশির স্তুতিবাক্যে তার দেহমনে আর আলোড়ন জাগে না আজকাল। বললে, বুড়ো বয়সে রস তো খুব উথলে উঠছে দেখছি।
বুড়ো!
তা বটে। সমস্ত শরীর দিয়ে সে আজ অনুভব করে তার শিরা-স্নায়ুগুলোর নিরুপায় পঙ্গুতা। অথচ এককালে গ্রামের কোন সুন্দরী মেয়েটাকে অন্তত সে দু-দিনের জন্যে আয়ত্ত করেনি? আর এই মুহূর্তে তার নিজের বিশাখাই তার ক্ষমতার বাইরে। অথচ এখন কী অপূর্বই-না দেখাচ্ছে বিশাখাকে! হাড়ির মেয়ে হলেও রংটা তার ফর্সা, প্রৌঢ় যৌবনে মুখোনা আজকাল দিব্যি ভারী আর গোলগাল হয়ে উঠেছে; পাকা সিঁদুরে-আমের মতো তার গালের রং, পানের রসে পাতলা ঠোঁট দুটি টুকটুক করছে। কপালে ছোটো একটা উলকির দাগ সমস্ত মুখোনার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যেন। অদ্ভুত একটা উত্তেজনায় নিশির বুকের ঠাণ্ডা রক্ত যেন হঠাৎ শিউরে উঠল শিরশির করে।
এক বারটি কাছে আসবি বিশাখা?
বিশাখার চোখে সন্দেহের ছায়া পড়ল।
ব্যাপার কী, নেশাটেশা ধরেছ নাকি?
নেশা ধরিনি, নেশা লাগছে। নিশি বিগতযৌবনের মতো প্রগলভ হবার চেষ্টা করছে। কাল রাতে দু-ছড়া হার বাগিয়েছি। নিবি তার একগাছা?
বিশাখার চোখে সন্দেহ ঘনীভূত হল।
ওরে বাপ রে, এত কপাল! আমি বাঁচব তো?
কেন, কোনোদিন কিছু তোকে দিইনি বুঝি?
ক্রিং ক্রিং করে বাইরে সাইকেলের ঘণ্টা শোনা গেল, তারপরেই জুতোর মচ মচ শব্দ করতে করতে কে উঠে এল দাওয়ায়। ডাক শোনা গেল, কর্মকার বাড়ি আছ হে?
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো নিশি চমকে উঠল, ইব্রাহিম দারোগা এসেছে।
বিশাখার গৌর মুখে রঙিন আভা দেখা দিয়েছে। আচমকা হাওয়া লাগা দিঘির জলের মতো একটা চকিত-চাঞ্চল্য তার সর্বাঙ্গে লাবণ্যের ঢেউ খেলিয়ে গেল। ব্যাপারটা নতুন করে বোঝবার কিছু নেই, তবু একটা তীব্র ঈর্ষা এসে ক্ষণিকের জন্যে নিশিকে আচ্ছন্ন করে দিলে।
ওঃ তাই, আমি বুড়ো হয়ে গেছি! এই জন্যই আমাকে মনে ধরে না আর। নিশির মনের কথা বিশাখা বুঝতে পেরেছে। দরিদ্রের ব্যর্থ লোভ দেখে তার সহানুভূতি হয়। কিন্তু সহানুভূতি ছাড়া আর কী সম্ভব।
এত হিংসে কেন? এ নইলে আগেই যে হাতে দড়ি পড়ে যেত, সেটা খেয়াল নেই বুঝি?
সত্যি, খুব সত্যি কথা। ইব্রাহিম দারোগার মতো মদহস্তী এই বাঁধনেই তো এমনভাবে বাঁধা পড়েছে! হিংসা করে কোনো লাভ নেই, শুধু বুকের ভেতর থেকে ঠেলে মস্তবড় একটা দীর্ঘনিশ্বাস এল বেরিয়ে।
ততক্ষণে ঘর থেকে দ্রুতচরণে অদৃশ্য হয়ে গেছে বিশাখা। মহামান্য অতিথি এবং মূল্যবান প্রেমিক। বাইরে তাকে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখা চলে না। খানিকটা মিষ্টি হাসি উপহার দিতে হবে তাকে। এক কাপ চা, এক খিলি পান। মাঝে মাঝে দারোগা রাতটাও কাটিয়ে যায় নিশির বাড়িতেই। গ্রামের সবাই ব্যাপারটা জানে, কিন্তু একটা কথা বলবার সাহস নেই তাদের। জলে বসতি করে কুমিরের সঙ্গে বিরোধ না করার প্রাজ্ঞতাটুকু অন্তত আশা করা যায় তাদের কাছ থেকে। গোলাপাড়া হাটের সবচেয়ে বড়ো মহাজন নিশি কর্মকার আর দারোগার প্রতাপ সম্বন্ধে কিছু না ভাবাই ভালো। যুদ্ধ বাঁধবার পর থেকে ভারতরক্ষা আইনের অস্ত্রশস্ত্রে সে আপাদমস্তক মন্ডিত হয়ে আছে।
ইব্রাহিম দারোগাকে কিছুটা অপ্রসন্ন মনে হল আজকে। তিন-চারটে ডাকাতি হয়েছে তার এলাকায়, অথচ কোনোটারই কোনো কিনারা হয়নি। ওপর থেকে সুপারিন্টেণ্ডেন্টের কড়া অর্ডার এসেছে, এভাবে চললে ট্রান্সফার করে দেওয়া আশ্চর্য নয়।
হাতের বেতটাকে জুতোর ওপর টুক টুক করে ঠুকতে লাগল ইব্রাহিম দারোগা।
একটু সামলে চালাও কর্মকার। তোমার জন্যে কি আমার চাকরিটা যাবে?
নিশির শকুনের মতো চোখ দুটো বিনয়ে কাতলা মাছের মতো নির্বোধ হয়ে এল। হুজুরের যেমন কথা।
না না, সত্যি। ওপর থেকে বড্ড তাগিদ দিচ্ছে। ফস করে তোমার নামটা বেরিয়ে পড়লে আর আটকাতে পারব না। ইনস্পেকটর ব্যাটাকে তো জান? শালা স্রেফ রাঘববোয়াল। ওর মুখটা বন্ধ না করলে আর…
