কিন্তু সাধনার সিদ্ধি আছেই। একখানা গাড়ি দেখা দেয় শেষপর্যন্ত। ফস করে একটা মশাল জ্বালিয়ে নেয় মদন, তারপর বিকট একটা চিৎকার করে ওরা আটকে দাঁড়ায় পথ। মশালের লাল আলোয় গোরুর বড়ো বড়ো চোখগুলো অদ্ভুত ভয়ার্ত মনে হয়। গাড়োয়ানটা লাফিয়ে পড়ে জঙ্গলের দিকে ছুটে পালায়, যাত্রীদের অসহায় কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে দিগদিগন্ত।
জোয়ানের কাজ! কথাটা যোগী ঠিক বুঝতে পারে না।
তার চেতনাকে সজাগ করে দিয়ে নিশি কর্মকার কথা কয়ে উঠল।
বারো ভরি রুপো।
আর সোনা? মদনের কণ্ঠস্বর উৎকণ্ঠিত শোনাল।
সোনা? সোনা কোথায়? কুড়িয়ে-বাড়িয়ে তিন ভরিও হবে না বোধ হয়।
বল কী? মদন চমকে উঠল, এই হার, চুড়ি…।
সব গিলটি।
গিলটি! মদন বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল নিশি কর্মকারের মুখের দিকে। সে-মুখের একটি পেশিও কাঁপছে না, কেবল কপালের রেখাগুলো সরীসৃপের মতো সর্পিল হয়ে উঠেছে। মাত্র। তার মুখ দেখে একটি কথারও পাঠোদ্ধার করা যাবে না, আবিষ্কার করা যাবে না তার মনোজগতের এতটুকুও সংবাদ। অরণ্যের মতোই তার মন দুর্গম আর রহস্যময়, শুধু নিকেল ফ্রেম দেওয়া পুরু কাচের চশমার ভেতর দিয়ে তার দৃষ্টি অসম্ভবরকম লোভাতুর হয়ে উঠেছে।
নিশি কর্মকার কুঞ্চিত করলে।
বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? তা হলে তোমাদের মাল তোমরাই নিয়ে যাও, বদনামের মধ্যে আমি নেই।
মুহূর্তে মুষড়ে গেল মদন। নিশি কর্মকার রাগ করলে উপায়ান্তর নেই তাদের। এসব কাজে এমন বিশ্বাসযোগ্য হুঁশিয়ার লোক আর পাওয়া যাবে না। গোলাপাড়া হাটের সে জাঁদরেল মহাজন; শুধু সোনাদানা নয়, ধান-চালের আড়ত, কাটা কাপড়ের ব্যাবসা। গোলাপাড়া ইউনিয়ন বোর্ডের সে প্রেসিডেন্ট, সদর থেকে ছাপানো সব সরকারি খাম আসে তার নামে। তা ছাড়া হবিবগঞ্জ থানার দারোগা ইব্রাহিম মিয়াকে সে যে কী মন্ত্রে বশ করেছে কে জানে, পুলিশের হাঙ্গামা থেকে অন্তত নিশ্চিন্ত।
না না, তা বলিনি। তবে…
এর মধ্যে তবে নেই আর। চশমাটা খুলে নিশি একটা টিনের খাপে পুরল।
অধর্ম আমি কখনো করিনে, পরকাল বলে একটা জিনিস আছে তো। পৌনে দু-শোর বেশি কিছুতেই হয় না, তা আমি পুরোপুরি দু-শো টাকাই ধরে দিচ্ছি, নিয়ে যাও। দু-শো! চার জনের স্বরেই নৈরাশ্য ফুটে বেরোল। কলাইগঞ্জের সাহাদের গাড়ি ধরেছিল তারা। ঐশ্বর্যের দিক থেকে সাহারা বিখ্যাত ব্যক্তি, তাদের বাড়ির মেয়েদের গা থেকে মাত্র দু-শো টাকার গয়না বেরোল! ব্যাপারটা বিশ্বাস করা কঠিন।
মদন একবার শেষ চেষ্টা করলে, অন্তত আড়াইশো…
আর এক পয়সাও পারব না। ইচ্ছে না হয় ঘুরিয়ে নিয়ে যাও, দেড়শোর বেশি যদি কেউ দিতে রাজি হয় তো আমার কান মলে দিয়ে।
তা কি হয়? অসহায় স্বরে মদন বললে, দাও, দুশোই দাও তবে।
এতক্ষণে নিশি কর্মকার হাসল। তার হাসিটা সস্নেহ এবং স্বর্গীয়।
কেন এত অবিশ্বাস বলো তো? তোমাদের এত কষ্টের রোজগার, মিথ্যে প্রবঞ্চনা যদি করি তাহলে তা কি ধর্মে সইবে কখনো? তা ছাড়া পরলোকে জবাবদিহিও তো করতে হবে। যথা ধর্ম তথা জয়, অধর্মের রোজগার গোমাংস আর গোরক্ত।
বিরস মুখে টাকাগুলো নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল ওরা। অন্ধকারে মদনের কালিমাখা ভূতুড়ে মুখটা আরও কালো আর ভয়ানক হয়ে উঠেছে। চাপা দাঁতগুলো একবার সশব্দে কড়মড় করে উঠল তার। নিশি কর্মকারের রুদ্ধ দরজার দিকে সে এক বার অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল।
বলে অধর্মের টাকা গোমাংস আর গোরক্ত! শালা বুড়ো শকুন কোথাকার! গিলটি আর আসল সোনা আমরা চিনতে পারি না। ইচ্ছে করছে লোহার বড়ো হাতুড়িটা তুলে মাথাটা ফাটিয়ে চৌচির করে দিই ওর। কিন্তু কী করব, ব্যাটা সরকারের পেয়ারের লোক, নইলে অ্যাদ্দিন…
মদনের কথার ভঙ্গিতে যোগীর হাসি এল। মদন বুনো ওল, কিন্তু নিশি বাঘা তেঁতুল।
আর ওরা বেরিয়ে গেলে আর এক বার লণ্ঠনের আলোটা চড়িয়ে দিয়ে নিশি কর্মকার গয়নাগুলোকে পরীক্ষা করলে। এখনও যেন নারীদেহের উত্তাপ আর স্কেদের গন্ধ সেগুলোতে জড়িয়ে রয়েছে। কম করেও হাজার টাকার জিনিস, সাহাদের নজরটা যে উঁচু আছে সেকথা মানতেই হবে। কিন্তু অধর্মের টাকা গোমাংস আর গোর। নিজের কথাটা মনে পড়তেই রেখাজটিল মুখে খানিকটা হাসি প্রকট হয়ে উঠল। অধর্মের সংজ্ঞা আলাদা বই কী। চোরের উপর বাটপাড়িকে কোনো আহাম্মকই অধর্ম বলবে না।
রাত্রে নিশির ভালো ঘুম হয় না। এই বহুবাঞ্ছিত অনিদ্রাটা অনেক আয়াস স্বীকার করে তবে আয়ত্ত করতে হয়েছে তাকে। বাতাসের সঙ্গে বাইরের গাছের পাতা খস খস করে নড়ে। আর বিছানার মধ্যে নিদ্রাহীন চোখ সজাগ হয়ে থাকে সন্দেহের প্রখরতায়। ঘাসবনের ভেতর দিয়ে সাপ চলে যায়, কান খাড়া করে সে অনুধাবন করে তার চলার ক্রমবিলীন শব্দটাকে। ঘরের মধ্যে তরল অন্ধকার, তবু তার ভেতর সে স্পষ্ট দেখতে পায় বড়ো লোহার সিন্দুকটার ঝকঝকে হাতল আর ভারী হবসের তালা দুটো সতর্ক প্রহরীর মতো জেগে রয়েছে। বুভুক্ষু ইঁদুরগুলো মখমলের মতো ছোটো ছোটো পা ফেলে ঘরময় ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু নিশি কর্মকারের ঘরে কুড়িয়ে খাওয়ার মতো এতটুকু উদবৃত্ত অপচয় খুঁজে পায় না তারা।
প্রহরে প্রহরে শিয়ালের জয়ধ্বনি চিহ্নিত করে রাত্রিকে। তারপর বাইরের অন্ধকার ফিকে হয়ে আসবার আগেই উঠে বসে নিশি কর্মকার। বৈষ্ণব মানুষ, মালা জপ শেষ করে জুড়ে দেয় বেসুরো গলায় কীর্তন। সমস্তটা দিন নানা বিষয়কর্মে সংসারের আবিলতার মধ্যে কাটাতে হয়, তাই ব্রাহ্মমুহূর্তে যতটুকু পারে পুণ্য অর্জন করে নেয় সে।
