ঠক ঠক ঠক। শব্দটা চেনা, তবু তবু কে জানে! নিশি কর্মকারের শকুনের মতো চোখ দুটোর ওপর সংশয়ের ছায়া এল ঘনিয়ে, কপালে দেখা দিল এলোমেলো সরীসৃপ রেখা। বাতির অস্পষ্ট আলোয় ঘরের কোণে বিলিতি লোহার সিন্দুকটার হাতল আর ভারী হবসের তালা দুটো ঝকঝক করে জ্বলছে। কাঁচা সোনায়, গয়নাতে, নোটে এবং নগদে প্রায় বিশ হাজার টাকা অলংকৃত করেছে ওই সিন্দুকটার জঠর।
কলম রেখে নিশি উঠে দাঁড়াল। লোকটা কুঁজো; বয়সের চাপে নয়, খাতা আর হাতুড়ির সংস্রবেই অকালে তার পিঠটা বেঁকে গিয়েছে ধনুকের মতো। অত্যন্ত সতর্ক হাতে দরজার ভারী খিলটা সরিয়ে দিলে সে।
ঘরে ঢুকল চার জন লোক। মুখ চেনা না থাকলে নিশি আকাশ ফাটিয়ে আর্তনাদ করে উঠত। তাদের কারও চেহারাই উজ্জ্বল দিবালোকে দেখবার বা দেখাবার মতো নয়। মালকোঁচা আটা, মুখের উপর চুন আর ভুসা কালির বর্ণবিন্যাস চালিয়ে বিকট চেহারাকে বিকটতর করে তুলেছে তারা। হাঁটু পর্যন্ত কাদা। হাতে তাদের তেলপাকানো বাঁশের লাঠি, ক্ষুরের মতো ধারালো চকচকে দীর্ঘ হাঁসুয়া। একজনের মাথায় ভারী একটা টিনের ট্রাঙ্ক, আর একজনের হাতে একটা পুঁটলি শাড়ি দিয়ে বাঁধা।
নিঃশব্দে পেছনের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
ট্রাঙ্ক আর পুঁটলি সামনে নামিয়ে তারা শ্রান্তভাবে বসে পড়ল। চার মাইল পথ ছুটে আসতে হয়েছে, ক্লান্তিতে ভারী ভারী নিশ্বাস পড়ছে তাদের। আট-দশটা হাটের গাড়ি তাদের পিছনে পিছনে আসছিল, একটু হলেই ধরা পড়ে যাওয়া আশ্চর্য ছিল না। যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত করে একজন পায়ের দিকে তাকাল। ইটের ঘা লেগে বেমালুম নখ উড়ে গেছে একটা। মাটি মেশানো কালো রক্ত সেখান থেকে টপ টপ করে ঝরে পড়ছিল।
নিশি কর্মকার জিজ্ঞাসু চোখে এক বার ট্রাঙ্ক আর এক বার পুঁটলির দিকে তাকাল। আজকের শিকার?
হুঁ।
সোনাদানা মিলেছে?
খুলে দ্যাখো-না। গয়না যা পাওয়া গেছে তা ওই পুঁটলিটাতেই। আলোটা চড়িয়ে দিয়ে নিশি পুঁটলি খুলল। একরাশ সোনা-রুপোর গয়না চকিত আলোর স্পর্শে ভয়াতুর চোখের মতো উঠল ঝিলিক দিয়ে। রুপোর মল, চুড়ি, ভারী টোড়া একছড়া, সোনার দু-ছড়া হার, বালা, আংটি একটা। পাথর-বসানো কানের দুল এক জোড়া, সেটা
স্পর্শ করেই নিশি চমকে হাত সরিয়ে নিলে। নরম একটা মাংসের টুকরো এখনও লেগে রয়েছে তাতে, আর সেইসঙ্গে আঠার মতো রক্ত। সময় সংক্ষেপ করবার জন্য কানসুদ্ধই দুল জোড়াকে ছিঁড়ে এনেছে ওরা।
ইস! খুন হয়েছে নাকি?
সবচাইতে যে মোটা আর জোয়ান সে-ই জবাব দিলে। কেউ না বলে দিলেও বুঝতে পারা যায় স্বতঃসিদ্ধ নিয়মমতোই সে এদের দলপতি। মোঙ্গলসুলভ খর্ব নাকের নীচে বিড়ালের মতো অল্প কয়েক গাছা লালচে গোঁফ খাড়া হয়ে রয়েছে, চোখ দুটো এত ঘোলাটে আর নিষ্প্রভ যে হলুদ-মাখানো বলে মনে হয়। সমস্ত শরীরটা তার গাঁটে গাঁটে পাকানো, যেন পেশি দিয়েই তৈরি সেটা। নাম তার মদন।
মদন তিনটে উঁচু উঁচু বেটপ আর নোংরা দাঁত বের করে হাসল।
না, খুন হয়নি। দিতে চায়নি, তাই কেড়ে আনতে হয়েছে।
দলের মধ্যে সবচাইতে ছোটো যোগী চুপ করে বসে ছিল। রাহাজানির কাজে এই বছরই সে হাতেখড়ি দিয়েছে। অন্ধকার রাত্রিতে অসহায় পথিকের আর্তনাদ এখনও তার বুকের মধ্যে ঢেউ জাগিয়ে তোলে। হাঁসুয়ার কোপ যখন হিংস্র একটা হাসির মতো মাথার ওপর ঝকমক করে ওঠে, তখন মৃত্যুভীতের বিস্ফারিত দৃষ্টি সে সহ্য করতে পারে না। তার স্নায়ু এখনও এই নিশাচরের জীবনটাকে সহজভাবে আয়ত্ত করে নিতে পারেনি।
যোগী বললে, উঃ, কীরকম কাঁদছিল মেয়েটা! ওভাবে কেড়ে না নিলেই…
মদন হো-হো করে হেসে উঠল।
এসব তোর কাজ নয়। ভুইমালীর নাম ডুবিয়েছিস তুই। কাল থেকে ঘরে চলে যা, ধামা কুলো তৈরি কর গে বরং। মেয়েমানুষের মন নিয়ে এসব জোয়ানের কাজ করা যায় না।
অপ্রতিভ যোগী নীরব হয়েই রইল। সে ভয় পায়নি, কিন্তু সংশয় দেখা দিয়েছে তার মনে। জোয়ানের কাজ। জোয়ানের কাজ কি এইরকম! কৃষ্ণপক্ষের চন্দ্রহীন রাত ঘুটঘুট করছে চারদিকে। ফাঁকা মাঠের এখানে-ওখানে মিশকালো শ্যাওড়ার জঙ্গল, তার সর্বাঙ্গে অজস্র জোনাকি জ্বলছে ভূতের চোখের মতো। তারই মাঝখান দিয়ে গোরুর গাড়ির লিক, মাঝে মাঝে জল আর কাদা জমে রয়েছে তাতে। আর শ্যাওড়া গাছের ছায়ার নীচে নিজেদের প্রায় মিশিয়ে দিয়ে ওরা বসে আছে আকুল প্রতীক্ষায়, কখন একখানা সওয়ারি গাড়ি আসবে সেই পথ দিয়ে এগিয়ে। দূরে মাঠের মাঝখানে বড়ো একটা আলো দেখা দেয়, ওদের উদগ্র ধমনিতে নামে চঞ্চলতার জোয়ার। মদন সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায়। অন্ধকারের মধ্যেও যোগী দেখতে পায় তার চোখ বাঘের মতো পিঙ্গল লুব্ধ আলোয় ঝকে উঠেছে, আর হাতের মুঠোয় কাঁপছে হাঁসুয়ার ফলাটা। আলোটা আশাপ্রদভাবে দপ দপ করে খানিকটা এগিয়ে আসে, তারপরেই মরীচিকার বিভ্রম জাগিয়ে অন্ধকারের অথই সমুদ্রে তলিয়ে যায় কালো একটা বুদবুদের মতো। নাঃ, আলেয়া।
হতাশায় বেঢপ দাঁতগুলো দিয়ে নীচের ঠোঁটটাকে হিংস্রভাবে কামড়ে ধরে মদন। একটা অশ্রাব্য গালাগালি বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে।
আজ রাত্তিরটাই বৃথা গেল, এক শালা গাড়িরও কি আসতে নেই রে! ভগবানের এ কী অবিচার বল দেখি?
সত্যিই তো, ভগবানের এ কী অবিচার। যোগী বিস্মিত হয়ে ভাবে। আরও একটু বিবেচনা থাকা উচিত ছিল ভগবানের তরফ থেকে। এই যে সারাটা রাত তারা শিকারের সন্ধানে অতন্দ্র হয়ে বসে আছে, মাঠের যত মশা সুযোগ পেয়ে চারপাশ থেকে প্রাণপণে এসে ঘেঁকে ধরেছে তাদের, এত কষ্ট আর পরিশ্রমের কোনো পুরস্কারই কি নেই? ভারী ভারী গহনাপরা তিন চারটে মেয়েমানুষসুদ্ধ দু-একখানা গাড়ি এই রাত দেড়টার সময় তিনি তো ইচ্ছে করলেই পাঠিয়ে দিতে পারেন। জীব সৃষ্টি করেছেন অথচ তাদের আহার জোগাবার বেলায় এত কার্পণ্য কেন?
