রাধা হাসল। করুণ, ক্লান্ত হাসি। ফিরেই যদি যাব, তাহলে কাল কেন দেখা করতে আসব তোমার সঙ্গে?
হঠাৎ নৌকাটা দুলে উঠল, যেন একদিকে হেলে গেল এক বার। রাধা বললে, কী করছ? ডুবিয়ে দেবে নাকি নৌকা? জোর করে ধরে এনে শেষে ডুবিয়ে মারবে নদীতে?
বিহ্বল বিস্ময়ে সুধাকর বললে, তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি না।
রাধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর চোখ তুলল আকাশের দিকে। পুবের দিগন্ত রাঙা হয়ে আসছে, সাদা মেঘের মাথায় সিঁদুর পড়ছে একটু একটু করে। তারই একটুখানি আভা এসে যেন রাধার সিঁথিতেও পড়ল, অন্তত সেইরকমই মনে হল সুধাকরের।
রাধা গম্ভীর গলায় বললে, কী যে হয়েছে সে কি আমিই বুঝতে পারছি? আমি খাঁচার পাখির মতো। খাঁচা আমার সয়ে গেছে—দাঁড়ে বসে নিশ্চিন্তে দিন কাটাতে আমার ভালো লাগে। কিন্তু কেউ যদি খাঁচার বাইরে এনে আমায় ছেড়ে দেয়, তাহলেই কি ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে পারি আমি?
আর একটু স্পষ্ট করে বললা রাধা! আকুল গলায় জানতে চাইল সুধাকর।
কী স্পষ্ট করে বলব এর চেয়ে? সিঁদুরে আলোটা এবার শুধু রাধার সিঁথিতেই নয়, তার সারা কপালেও ছড়িয়ে পড়ল। ছোটো রায়কর্তার ঘর থেকে পালাতে পারতাম অনেক দিন আগেই, তবু এত দেরি হল কেন পালাতে? খাঁচার নেশা আমার সহজে কাটতে চায় না। ভেবেছিলাম বোষ্টমি হয়ে বৃন্দাবনে চলে যাব, তোমাকেও ভুলে যাব। পারলাম কই? পদ্মার ওপারে শ্রীপাট খেতুরের মেলায় গিয়ে পড়লাম সর্দার বৈরাগীর হাতে, ভিড়লাম ঢপের দলে। সর্দার বৈরাগী আমাকে সেবাদাসী করে নিতে চাইল—লোভ সামলাতে পারলাম না। আবার চলে এলাম খাঁচায়। তারপর কাল রাতে তুমি এলে। মন এক বার দুলে উঠল, তারপরেই মনে হল–আর নয়, এই বেশ আছি। কিন্তু থাকতে তো পারলাম না। চলে এলাম তোমার সঙ্গে দেখা করতে। আর তুমিও কী করবে সেও আমি জানতাম। তোমার চোখ দেখেই আগের রাতে সে আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
তবে কেন মিথ্যে করে আমায় বাধা দিলে?
মিথ্যে করে বাধা দিইনি মাঝি, সেও সত্যি। জোর করে না আনলে আমায় তুমি পেতে, সর্দার বৈরাগীই তার জোরে আমায় ধরে রাখত।
ভোরের আলো এবার সোনা হয়ে রাধার চোখ-মুখ আলো করে তুলল। সুধাকর এবার সোজা হয়ে বসল। আঠারো বছরের চঞ্চলতা ফিরে এসেছে শরীরে—এসেছে চব্বিশ বছরের অভিজ্ঞতা। হাতের পেশিতে সমস্ত শক্তি এনে জোর করে বইঠায় টান দিলে সুধাকর। বললে, এবার আমার জোরেই তোমায় ধরে রাখব রাধা।
রাধা হাসল। সূর্যের প্রথম আলোয় মন-ভোলানো অপরূপ হাসি।
পারবে?
পারব।
কোথায় নিয়ে চলেছ আমাকে? শহরে?
না, শহরে নয়। এবার সুধাকরও হাসল, সেখানে অনেক ছোটো রায়কর্তা আছে, অনেক সর্দার বৈরাগী আছে। তাদের সকলের সঙ্গে জোরে আমি পেরে উঠব না। আমি তোমায় দক্ষিণে নিয়ে যাব।
দক্ষিণে?
হ্যাঁ। নতুন চরে নতুন মাটি উঠেছে সেখানে। বিনা পয়সায় পত্তনি পাওয়া যায় শুনেছি। নোনা কাটিয়ে ফসল ফলাব আগে, তারপরে দেব খাজনা। আর সেইখানে ঘর বাঁধব তোমার নিয়ে।
রাধা স্মিতমুখে তাকিয়ে রইল। আর ঠিক সেই সময় কাঠের পাঠাতনের তলা থেকে একলাফে সুধাকরের কোলের কাছে লাফিয়ে উঠল জুয়ান। রাধা চমকে উঠে চাপা আর্তনাদ করল একটা। সুধাকর হা-হা করে হেসে উঠল।
ভয় নেই, আমার উদ, জুয়ান ওর নাম। দুজন বন্ধু আমার, একজন জুয়ান আর একজন মকবুল।
জুয়ান তখন সুধাকরের হাঁটুতে মাথা ঘষছে। এক হাতে সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলোতে লাগল সুধাকর। কৌতুকভরা চোখে রাধা দেখতে লাগল। তারপর শুধাল, মকবুল কে?
সে না থাকলে কী করে আনতাম তোমাকে? সে-ই তো ভরসা দিয়েছিল। তাকিয়ে দ্যাখো, পেছনের গলুইয়ে সে ঘুমুচ্ছে।
রাধা ফিরে তাকাল, কই পেছনের গলুইয়ে তো কেউ নেই!
নেই! সুধাকর চকিত হয়ে উঠে দাঁড়াল, নেই! তাই তো, তবে কোথায় গেল মকবুল? পান্ডুর বিবর্ণমুখে বললে, তবে কি জলে পড়ে গেল? অনেকক্ষণ আগে নৌকাটা এক বার দুলে উঠেছিল বটে-ঝুপ করে একটা আওয়াজও হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম শুশুকের
সঙ্গে ধাক্কা লাগল বোধ হয়। তবে কি মকবুল ঘুমোতে ঘুমোতে…
কিন্তু মকবুল তো ঘুমোতে ঘুমোতে জলে পড়ে যায়নি। একটা চরের পাশ দিয়ে যখন নৌকা চলেছে, তখন নিজেই সে টুপ করে নেমে পড়েছিল তা থেকে। কারণ রোকেয়াকে সে পায়নি, কিন্তু দেখেছে রাধাকে কী করে পেয়েছে সুধাকর। আরও দেখেছে রাধার রূপ, নিজের বুকের মধ্যে শুনেছে উচ্ছ্বসিত কলধ্বনি। যদি নিজের মনের পশুটা তার বাগ না মানে? যদি ওইভাবেই সেও সুধাকরের কাছ থেকে রাধাকে কেড়ে নেওয়ার কথা ভাবে? যদি শয়তান তার মাথার ভেতরেই সব কিছু ওলটপালট করে দেয়? তার চেয়ে… প্রথম সূর্যের আলোয় একটা নির্জন চরের একবুক বেনাঘাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে মকবুল ভাবতে লাগল–তার চেয়ে আর এক বার ফিরে যাবে গ্রামে। আর এক বার নতুনভাবে চেষ্টা করে দেখবে রোকেয়াকে সত্যিই ফিরে পাওয়া যায় কি না।
নক্ৰচরিত
দরজায় ঠক ঠক করে তিন-চারটে টোকা পড়ল। খেয়োপাতায় কষ-কালির আঁচড় টানতে টানতে কুঞ্চিত করে মুখ তুলে তাকাল নিশিকান্ত কর্মকার। শব্দটার অর্থ সে বুঝতে পেরেছে।
বাইরে কালো রাত, তারস্বরে ঝিঝি ডাকছে আর ঘরে মিট মিট করে জ্বলছে কেরোসিনের আলো। বেশি তেল পুড়বার ভয়ে নিশি কখনো আলোটাকে বাড়াতে চায় না। আধা-অন্ধকারে কাজ করতে করতে শকুনের চাইতেও সুতীক্ষ্ণহয়ে উঠেছে তার চোখের দৃষ্টি। খেরোখাতায় কষ-কালির লেখাগুলাকে সে পিঁপড়ের সারির মতো সাজিয়ে চলেছে—আজকের দিনের জমাখরচ।
