আসর শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কালো ছায়ার তলায় নিশ্চল প্রতীক্ষা সুধাকরের। সময় বয়ে চলেছে। কই, রাধা তো আসছে না এখনও!
তবে কি আসবে না? তবে কি মিথ্যেই স্তোক দিয়েছে কাল? সুধাকরের চোখের সামনে একটা রক্তাক্ত ঘূর্ণি ঘুরছে যেন। যদি না আসে, তাহলে
শুকনো পাতার ওপর খরখর শব্দ একটা। সুধাকরের হৃৎপিন্ড যেন ফেটে বেরিয়ে যেতে চাইল। রাধাই বটে। অন্ধকারের মধ্যে একটা শ্বেতপদ্মের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে, চিকচিক করছে গলার সোনার হার। সুধাকর এগিয়ে এল। দুঃসহ উত্তেজনায় বললে, রাধা! দু-পা পিছিয়ে গেল রাধা। বললে, না।
আমার সঙ্গে চলো রাধা। নদীতে নয়—খালের ঘাটে নৌকা রেখে এসেছি। দুটো সুপুরিবন পার হলেই খাল। আঁধারে আঁধারে চলে যাব, কেউ দেখতে পাবে না।
আমি যাব না। পাথরের মতো শক্ত শোনাল রাধার স্বর।
সুধাকরের গায়ে যেন সাপের ছোবল লাগল।
রাধা?
আমি যাব না। কেন যাব? রাধার গলার স্বরে বিদ্রোহ ভেঙে পড়ল, কোন দুঃখে মরতে যাব তোমার সঙ্গে? ছ-বছর আগে তোমায় ভালো লেগেছিল, একটা মাতাল শয়তানের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে আসতে চেয়েছিলাম তোমার সঙ্গে। কিন্তু আজ তো আমার কোনো কষ্ট নেই। কত নাম হয়েছে আমার, গয়না হয়েছে, টাকা হয়েছে। সর্দার বৈরাগী আমার হাতের মুঠোয়। কেন যাব আমি?
সুধাকরের গলার স্বর যেন বন্ধ হয়ে আসতে চাইল।
রাধা, ছোটো রায়কর্তাও তোমাকে অনেক সোনাদানা দিয়েছিল।
দিয়েছিল বই কী। কিন্তু সেদিন আমার বয়স ছিল অল্প, তাই তার কদর বুঝতে পারিনি। কিন্তু আজ আমার চোখ খুলেছে। আমি জানি টাকাতেই সুখ। সে-টাকা আমি দু-হাতে রোজগার করতে পারব। মাঝি, তুমি ফিরে যাও।
রাধা!
তুমি ফিরেই যাও মাঝি, সেই ভালো হবে সবচেয়ে। সর্দার বৈরাগী টের পেয়ে যাবে এখনই। সে এলে আর তোমার রক্ষা থাকবে না। এককালে ডাকাতি করত সে, দরকার হলে এখনও খুন করতে পারে।
তাহলে সেই চেষ্টাই সে করুক। সুধাকর আর নিজের ধৈর্য রাখতে পারল না। দৃঢ় কঠিন বাহুতে হঠাৎ সে দু-হাতে রাধাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল।
কাল রাতের মতোই একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার তুলতে চাইল রাধা। কাল রাতের মতোই সুধাকর তার মুখ চেপে ধরল। তীব্র গোঙানি, প্রাণপণ ছটফটানি কিছুক্ষণ। কাঁধের গামছাটা সজোরে সুধাকর রাধার মুখের ভেতরে চালিয়ে দিলে। একটু পরেই নিঃসাড় হয়ে এলিয়ে পড়ল রাধা।
ঝোপের মধ্য থেকে এগিয়ে এল মকবুল।
দিব্যি হয়েছে খাসা। এই হল পাকা হাতের কাজ। পালাও এবার।
অন্ধকার সুপুরি বাগানের মধ্য দিয়ে পথ। মাঝরাতের চাঁদ উঠতে আরও দেরি আছে খানিকটা। রাধাকে কাঁধের ওপর তুলে নিয়ে কুঁজো হয়ে এগোতে লাগল সুধাকর। কিন্তু পিঠে অত বড়ো ভারটাকেও যথেষ্ট ভারী বলে মনে হচ্ছে না তার। শুধু রক্তের চাপে বুকের ভেতরটা যেন ফেটে যাওয়ার উপক্রম করছে। আর পেছনে পেছনে পাহারা দিতে দিতে আসছে মকবুল। ঠিকই বুঝেছিল সে। মেয়েদের পেতে গেলে জোর চাই। সে টাকার জোর হোক আর গায়ের জোরই হোক!
খালের ধারে যেখানে শ্মশান, আশেপাশে জনমানুষের চিহ্ন নেই যেখানে, সেইখানেই ভাঙা ঘাটলার আড়ালে সুধাকরের নৌকাটা লুকানো ছিল। রাধাকে নৌকায় নামিয়ে ছইয়ের ভেতরে তাকে ঠেলে দিলে সুধাকর। মড়ার মতো পড়ে রইল রাধা। তারপরে দুখানা দাঁড় ধরল দুজনে। তিরের মতো খালের কালো জল কেটে নৌকা এগিয়ে চলল। একটি কথা নেই কারোর মুখে।
প্রায় দশ মিনিট পরে নৌকা বড়ো গাঙে গিয়ে পড়ল। স্টিমারঘাট অনেকখানি বাঁ-দিকে পড়ে আছে, মিটমিট করছে ঘাটের কেরোসিনের আলোটা, জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে নৌকাগুলো। সেইদিকে তাকিয়ে একটা কথা মনে পড়ে গেল সুধাকরের।
দোস্ত, তোমার নৌকা যে পড়ে রইল!
নৌকা আমার নয়, ইদ্রিশ মিয়ার।
কিন্তু…
কেন মিছিমিছি নিয়ে আসতে যাব ওই বাঁদির বাচ্চার নৌকা? ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে যাব কোন দুঃখে? আমি তো শহরে চলেছি, খেটেই খাব সেখানে। ওর নৌকা থাক পড়ে। গরজ থাকে তো নিজেই নিয়ে যাবে খোঁজ করে।
আর কোনো কথা বলল না কেউ। দুখানা দাঁড়ের টানে নৌকা তরতর করে এগিয়ে চলল কালো অন্ধকারের স্রোত বেয়ে। তারপর আরও খানিকটা পরে যখন মাঝরাতের চাঁদ উঠল আকাশে, দুজনের মুখে পড়ল তার আলো, তখন আবার কথা কইল মকবুল।
মুখের গামছাটা খুলে দাও মেয়েটার। নইলে শেষে হয়তো দম আটকেই মরে যাবে।
রাত ভোর হয়ে গেছে। রাধা চোখ মেলল। স্তিমিত শান্ত আলোয় ঝিমন্ত চোখে বইঠা বাইছে সুধাকর। রাধা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। মাথাটা তার পরিষ্কার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ।
রাধা ডাকল, মাঝি?
সুধাকর চমকে উঠল। রাধা উঠে বসেছে। বসেছে গলুইয়ে হেলান দিয়ে।
আবার ডাকল, মাঝি?
সুধাকর বিবর্ণ হয়ে গেল। হঠাৎ যেন নিজের অপরাধটা একটা কালো ছায়ার মতো তার সামনে এসে দাঁড়াল। রাধাকে জোর করে ধরে এনেছে সে, কিন্তু রাধার মন যদি ধরা না দেয় তার কাছে? চোখ তুলে তাকানোর সাহসও সে খুঁজে পেল না, নতদৃষ্টিতে পান্ডুর জলের দিকে চেয়ে রইল।
রাধা বললে, অত শক্ত করে কি মুখ বাঁধে? একটু হলেই মরে যেতাম যে!
আমায় মাপ করো রাধা। একটা আবেগ ঠেলে এল সুধাকরের গলায়, ঝোঁকের মাথায় তোমাকে ধরে এনেছি, কিন্তু এখন দেখছি তাতে লাভ নেই। আমি তোমায় ফিরিয়েই দিয়ে আসব।
