হিংস্রভাবেই নৌকার লগিটা মকবুল ছইয়ের ওপরে ছুড়ে দিলে।
কী হয়েছে খুলে বলো দেখি।
বলছি। মকবুল ঝুপ করে প্রায় একহাঁটু জলের মধ্যে নেমে পড়ল, অনেকখানি ভিজে গেল লুঙ্গিটা। তারপর ক্ষিপ্ত স্বরে বললে, শালার নৌকার তলা ফুটো করে ডুবিয়ে দেব মাঝগাঙে।
উঠে এসো, উঠে এসো এখানে। নিজের কথা ভুলে গিয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠল সুধাকর, সব খুলে বলো। নতুন কিছু করেছে নাকি ইদ্রিশ মিয়া?
মকবুল উঠে এল সুধাকরের নৌকায়। কান থেকে একটা বিড়ি নামাল ধরাবার জন্যে, তারপরেই সেটাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে নদীর জলে ছড়িয়ে দিতে লাগল। দুটো লাল টকটকে চোখ সুধাকরের মুখে ফেলে দিয়ে বললে, শালা গোলাম সর্দার এতদিন তামাশা করছিল আমাকে নিয়ে!
সে কী! মকবুল পৈশাচিক মুখে বলে যেতে লাগল, তলায় তলায় ঠিক ছিল সবই। হয়তো বান্দার খরচায় একটু মজা দেখবার জন্যেই ওকে লেলিয়ে দিয়েছিল শয়তান ইদ্রিশ মিয়া!
কী হয়েছে? অমন রেখে রেখে বলছ কেন? সুধাকর অধৈর্য হয়ে উঠল, খোলসা করো সব।
খোলসা কী করব আর? খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম ইদ্রিশ মিয়ার সঙ্গে রোকেয়ার বিয়ে হয়ে গেছে।
সুধাকর অস্ফুট আর্তনাদ করল একটা।
বিশ্বাস হচ্ছে না, না? মকবুল অদ্ভুত ধরনের হাসতে চেষ্টা করল, এই-ই দুনিয়া। তিনটে বিবি আছে ইদ্রিশ মিয়ার—চারটে বাঁদি। কিন্তু তবু আর একটা বিবি না-হলে শরিয়তি কানুনটা পাকা হয় না। তাই তিনশো নগদ টাকা দিয়েছে গোলাম আলি সর্দারকে—টিনের ঘর করে দেবে এরপরে। থুঃ–মকবুল জলের মধ্যে থুতু ফেলল।
অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সুধাকর। তারপর কিন্তু রোকেয়া বেগম? তার আশনাই?
মেয়েমানুষের আশনাই! ও শুধু কথার কথা! হাজার হাজার টাকা ইদ্রিশ মিয়ার, হাজার বিঘে ধানের জমি, গন্ডা গন্ডা গোরু-ছাগল-মুরগি পাঁচ-সাতটা খামার। রোকেয়া হবে লালবিবি–ইদ্রিশ মিয়ার চোখের সুর্মা হয়ে থাকবে। কোন দুঃখে ও আসবে ভাঙা গোলপাতার ঘরে? কেন খেতে যাবে খুদের জাউ আর পেঁয়াজের তরকারি!
কিন্তু দোস্ত, সুধাকর যেন বার কয়েক খাবি খেল, আমি ভেবেছিলাম রোকেয়া বিবি তোমাকে…
খুব পেয়ার করে, না? আবার সেই অদ্ভুত বিকৃত হাসিটা ভেসে উঠল মকবুলের মুখে, মেয়েমানুষ শুধু জোরকেই পেয়ার করে, হয় টাকার জোর নইলে গায়ের জোর। টাকার জোরে ইদ্রিশ মিয়া ওকে নিয়ে গেল, কিন্তু তার আগে আমি যদি ওকে গায়ের জোরে কেড়ে আনতাম, তাহলে এমন করে বুক চাপড়াতে হত না আমাকে।
মেয়েমানুষ শুধু জোরটাকেই পেয়ার করে। কথাটা যেন তিরের মতো এসে আঘাত করল সুধাকরকে। তাই বটে! সেই ভুল করেই সে এক বার হারিয়েছিল রাধাকে, আর আজ…
মকবুল কর্কশ গলায় বলে চলল, ইদ্রিশ মিয়ার বাড়িতে খুব খানাপিনা হচ্ছে। আমাকে বললে, বড়ো বড়ো মুরগি রান্না হচ্ছে, পোলাও হচ্ছে, মিঠাই এসেছে— খেয়ে যা। আমি ভাবছিলাম কোথাও যদি খানিক বিষ পাই তাহলে মিশিয়ে দিই ওই পোলাওয়ের সঙ্গে। ওই ইদ্রিশ মিয়া, ওই লালবিবি, ওই হারামি গোলাম আলি সর্দার একসঙ্গেই মিটে যায় সমস্ত!
যদি বিষ পাই! কিন্তু একথা কেন বলছে না মকবুল যে ইদ্রিশ মিয়াকে সে খুন করবে?
চলে যাব, শহরেই চলে যাব। আমার পক্ষে শহরও যা—নদীও তাই। মজুরের খেটে খাওয়াই সার—সে নদীতেই হোক আর শহরেই হোক।
হাঁটুতে থুতনি রেখে মকবুল বসে রইল। সুধাকরের মনে হল, অদ্ভুত রকমের ভাঙাচোরা যেন তার চেহারাটা। যেন প্রকান্ড একটা তাল গাছের মাথা থেকে আছড়ে পড়ে সম্পূর্ণ তালগোল পাকিয়ে গেছে সে।
সুধাকর আস্তে আস্তে বললে, তোমার সঙ্গে একটা পরামর্শ আছে মকবুল।
পরামর্শ! কীসের? মকবুল যেন কেমন চমকে উঠল।
মেয়েমানুষ সম্বন্ধেই।
মেয়েমানুষ? মকবুল গর্জে উঠল, না, ওর মধ্যে আমি আর নেই। কোনো কথা শুনতে চাই না আর।
কিন্তু শুনতে তোমাকে হবেই। সুধাকর মকবুলের কাঁধে হাত রাখল, তোমার রোকেয়া তোমায় ঠকিয়েছে, কিন্তু আমার রাধা আমায় ঠকাতে পারবে না। তোমাকে আমার দরকার।
মেয়েমানুষ! থুঃ। জলে আবার থুতু ফেলে মকবুল বললে, বলে যাও।
৫.
বারোয়ারিতলায় ঢপকীর্তন আজ শেষ হয়ে গেল।
গানটা আরও ভালো জমেছিল আজ। রাধাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন মাটির নয়,
আকাশ থেকে নেমে এসেছে। তার গলায় গন্ধর্বলোকের সুর।
রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর,
প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর!
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাঁদে–
পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বাঁধে—
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাঁদে। তেমনি নাটমন্দিরের বাইরে দরজার সামনে অসংখ্য চাষাভুসোর ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে গান শুনেছে সুধাকর। হিয়ার পরশের জন্যে হিয়া কাঁদে না —কথাটা ভুল। বুকের প্রত্যেকটা হাড়-পাঁজরা পুড়ে খাক হয়ে যেতে থাকে।
চারদিকে বার বার হাততালি পড়েছে আজ। সাহাবাবুদের বাড়ির ছেলেরা শহরের কায়দায় বলেছে, এনকোর—এনকোর। আর তারই তালে দুলে উঠেছে রাধার শরীর—যেন জোয়ারের ঢেউ দুলেছে উছল গাঙে। রামধন সাহা নিজে দাঁড়িয়ে উঠে বলেছেন, একটা সোনার মেডেল দেবেন রাধাকে। রাধা তাঁকে হাতজোড় করে নমস্কার করেছে। কিন্তু সুধাকর এসব দেখেছে নিছক ছায়াবাজির মতো, যেন স্বপ্ন দেখেছে। শুধু অপেক্ষা করেছে কখন শেষ হবে গান, কখন সেই অন্ধকার গাব গাছের নীচে…
