তার প্রতিদ্বন্দ্বী–বাঘ। শিকারের মতো আগলে বসে আছে। সহজে কেড়ে নেওয়া যাবে। এ ছোটো রায়কর্তা নয়, এর চোখ নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে না। অনেকখানি শক্তির পরীক্ষা দিয়েই এর কাছ থেকে কেড়ে নিতে হবে রাধাকে।
সুধাকর জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ।
ভুল হয়ে গেছে, মস্তবড়ো ভুল। সেদিন সে হাত বাড়িয়ে দিলেই রাধাকে কেড়ে নিতে পারত, ছিনিয়ে নিয়ে চলে যেতে পারত যেদিকে যতদূরে খুশি। সেদিনকার সেই সুযোগ সে হেলায় হারিয়েছে। আঠারো বছরের শরীরে উন্মাদনা ছিল, কিন্তু মনে সাহস ছিল না। তখনও অনেক ঝোড়ো নদী তার পাড়ি দেওয়া হয়নি, তখনও বল্লমে ফুড়ে চিতাবাঘ মারবার সাহস ছিল না তার। সেদিন সুযোগ হারিয়েছে, তাই আজ তারজন্যে ঢের বেশি দাম দিতে হবে।
চিতাবাঘ নয়, লড়তে হবে জাতবাঘের সঙ্গে।
তা হোক।
লোকগুলো বন্দরের দিকে ফিরে চলেছে। সুধাকরের ইচ্ছে হল এখনই গিয়ে দাঁড়ায় লোকটার সামনে, এই মুহূর্তেই যাহোক একটা-কিছুর চরম নিষ্পত্তি করে ফেলে।
কিন্তু কিন্তু এখনও সময় হয়নি। আজ রাত পর্যন্ত অপেক্ষাই করতে হবে তাকে।
দিন এগিয়ে চলল, বেড়ে চলল বেলা। আবার নদী উজ্জ্বল হয়ে উঠল রোদের খরধারে, খরশুলা মাছের ঝাঁক নৌকার আশেপাশে খেলে বেড়াতে লাগল। সুধাকরের মনে পড়ল রান্না চাপানো দরকার। কাল রাতে সে কিছুই খায়নি।
চাল আছে, আলু আছে, পেঁয়াজ আছে দু-চারটে। উদ নামালে এক-আধটা মাছও মিলতে পারে হয়তো। কিন্তু খাওয়ার জন্যে বিশেষ উৎসাহ হচ্ছে না। যা আছে চলে যাবে ওতেই।
ক্লান্তভাবে ভোলা উনুনটায় আগুন দিতে বসল সুধাকর।
আচ্ছা, ধরো যদি রাধাকে পাওয়া যায়–
বুকের নাড়িগুলো তারের বাজনার মতো ঝনঝন করে উঠল। যদি রাধাকে পাওয়া যায় কোথায় নিয়ে যাবে তাকে? ওই ঘরে—ওই গ্রামে? যেখানে পিসির কাছে তাকে জিম্ম করে রেখে আবার পরের সওয়ারি-বওয়া? নিজের ঘর ছেড়ে রাতের পর রাত এই খাল-বিল-নদী নালায় ভূতের মতো ঘুরে-বেড়ানো? তার নৌকায় উঠবে অল্পবয়সি স্বামী-স্ত্রী, সারারাত তারা
গুঞ্জন করবে জলের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সুর মিলিয়ে, আর তখন…
তখন দাঁতে দাঁত চেপে হয়তো-বা নৌকার লগি ঠেলে চলবে সুধাকর। ওরা যখন দুজনে ঘন হয়ে জড়িয়ে থাকবে, তখন তার মাথার ওপরে ঝরঝরিয়ে ঝরবে বৃষ্টির জল।
তা হয় না, কিছুতেই না।
আজ যদি কয়েক কাঠা ধানিজমি থাকত, থাকত একটুখানি খেতখামার, রাধাকে নিয়ে কী নিশ্চিন্ত আনন্দে তাহলে সংসার বাঁধত সে। সামনে ধানের খেত, ঘরে রাধার সোনামুখ, জানলা দিয়ে সোনার মতো চাঁদের আলো…
ধান! খেত! মাটি!
নদীর মতো দুলে ওঠে না, রাক্ষসী ক্ষুধায় থাকে না মুখ বাড়িয়ে। একটু অসতর্ক হও— সঙ্গে সঙ্গে আর কথা নেই! অমনি ডাইনির মতো হাজারটা হাত বাড়িয়ে একেবারে টেনে নেবে পেটের মধ্যে। মেঘের লক্ষণ দেখে যদি বুঝতে না পার, তাহলে অথৈ গাঙের ক্রোধ থেকে আর তোমার আত্মরক্ষা করবার কোনো আশাই নেই। আর তা ছাড়া…
তা ছাড়া যদি সেইরকম একটা রাত আসে? যে-রাতে জলের অতল থেকে উঠে আসে সেইসব অপঘাতের দল? যারা ডাকাতের হাতে প্রাণ দিয়েছে, যাদের নীচে টেনে নিয়েছে মানুষখেকো কুমির, গলায় কলশি বেঁধে আত্মহত্যা করেছে যারা, যদি কখনো তাদের হাতে তোমাকে পড়তে হয়? তারপরে কী হবে সেকথা ভেবে লাভ নেই।
তার চেয়ে ভালো মাটি। ঢের ভালো। সে স্থির, সে ভর সয়। জীবনকে আঁকড়ে রাখে দু হাতে। তার উপরে ফুল ফোটে, পাখি গান গায়, ফসল ফলে। তার উপরেই মানুষ ঘর বাঁধে। মাটি—একটুখানিও সে যদি পেত, তাহলে রাধাকে নিয়ে সোনার সংসার গড়ে তুলত সেখানে।
সুধাকর চমকে উঠল। ধক করে জ্বলে উঠেছে উনুনটা। একটু হলেই তার হাতে লাগত আগুনের ঝলক।
দিনটা কী অদ্ভুত বিলম্বিত! যেন নদীর স্রোতটা হঠাৎ থমকে গেছে, যেন সূর্যটা আর চলতে পারছে না। কোনোমতে একমুঠো ভাত গিলে, উদকে খাইয়ে, সুধাকর লম্বা হয়ে পড়ে রইল।
মাটি। ধানের খেত। নদীর স্রোতের মতো অস্থির অনিশ্চিত জীবন নয়।
যদি একটুখানি জমি থাকত তার, তবে কি এইভাবে ঘুরে বেড়াত সে? সুধাকর জানে— চব্বিশ বছর চিরদিন থাকবে না। তারপরে আসবে চল্লিশ, পঞ্চাশ। সেদিন আর এমন শক্তি থাকবে না শরীরে, সেদিন মাতলা নদী পার হওয়ার কল্পনাও করতে পারবে না সে। রাত্রির পাথুরে অন্ধকারে সে পথ দেখতে পাবে না। সেদিন?
এই মাটি নেই বলেই তো এমন করে নতুন বউকে ফেলে গাঙে গাঙে ঘুরে বেড়ায় মাঝিরা। মাটি নেই বলেই তো জীবনের মূল নেই কোথাও—স্রোতের কচুরিপানার মতো তাদের ভেসে বেড়াতে হয়। তাই মকবুল রাতদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর অভিশাপ দেয় ইদ্রিশ মিয়াকে, তাই রোকেয়া তার কাছে আশমানের চাঁদের চাইতেও সুদুর।
রাধা! রাধাকে নিয়ে থাকবার মতো একটু মাটি যদি সে পেত! পেত এক ফালি নিশ্চল মাটি!
ঘটাং ঘট—
একটা নৌকা এসে ধাক্কা দিলে সুধাকরের নৌকার গায়ে। ভয়ংকরভাবে দুলে উঠল সবটা।
বিরক্ত হয়ে উঠে বসল সুধাকর, গায়ের ওপর এমন করে এসে নাও ভিড়োয় কে? একটুও আক্কেল-পছন্দ নেই নাকি?
যার নৌকা, সে তখন হিংস্রভাবে লগি পুঁতছে নৌকার। বললে, মকবুল!
সওয়ারি নামিয়ে ফিরলে?
না। তিক্ত জ্বালাভরা গলায় মকবুল বললে, নিজের কবর দেখে এলাম।
কবর? কী বকছ দোস্ত? পাগল হলে নাকি?
