বেশ, তাই হবে। সুধাকর উঠে দাঁড়াল। দু-চোখে ক্ষুধার্ত আগুন ছড়িয়ে বললে, সেই কথাই রইল। কিন্তু ছ-বছর তোমার জন্যে দিন গুনেছি আমি, আর আমার সইবে না। কাল যদি একটা হেস্তনেস্ত না হয়—তাহলে দুজনের একজন খুন হয়ে যাবে।
সুধাকর নাটমন্দিরের অধকারের মধ্যে সরে গেল। যেন মিলিয়ে গেল চোখের পলক পড়তে-না-পড়তে। রাধা বিস্ফারিত চোখ মেলে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ।
একটু পরেই বাইরে শব্দ উঠল–ধুপ ঝপাস!
এতক্ষণে ঘুম ভেঙে জড়ানো গলায় চেঁচিয়ে উঠল সর্দার বৈরাগী, কে? কে ওখানে? রাধার বুকের ভেতরটা যেন আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আর একজন কেউ জবাব দিলে, কী আর হবে! একটা খটাস কিংবা একটা ভাম হয়তো?
৪.
সকালে যখন সুধাকরের ঘুম ভাঙল, সূর্য তখন অনেকখানি উঠে বসেছে আকাশে। রোদে ধার লেগেছে, একটু পরেই এসে পড়বে এক্সপ্রেস স্টিমার। চকিতভাবে উঠে পড়ল সুধাকর। নৌকার খোলের ভেতর থেকে উদবেড়ালের ডাক আর মৃদু মৃদু আঁচড়ানোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। খিদে পেয়েছে ওর।
সুধাকর উদকে টেনে তুলল নৌকার ওপর। তারপর জল দেখিয়ে বললে, যা। সঙ্গে সঙ্গেই ছপাৎ করে শব্দ। উদ জলে পড়ল।
সুধাকর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল জলের ভেতর কীভাবে ওর ধূসর শরীরটা খেলে বেড়াচ্ছে।
এক মিনিট, দু-মিনিট, তিন মিনিট। তারপরেই উদ সাঁতরে এল নৌকার দিকে। বেশ বড়ো চেহারার একটা সরপুঁটি মাছ তার মুখে।
সুধাকরের পায়ের কাছে মাছটা এনে সে রাখল।
সদয় হাসিতে সুধাকর ইঙ্গিত করলে, খা।
বেশি বলবার দরকার ছিল না। সঙ্গে সঙ্গেই উদ তার সদব্যবহারে লেগে গেল। সু
ধাকর তাকিয়ে দেখল চারপাশে। অনেক নতুন নৌকার আমদানি হয়েছে—চেনা, অচেনা। অনেক নৌকা সওয়ারি নিয়ে চলে গেছে। মকবুলও।
কখন গেল কী জানি! যাওয়ার আগে হয়তো দু-চার বার ডেকেও ছিল তাকে। কিন্তু সুধাকর একেবারে জগদ্দল পাথরের মতো পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছে, একটা শব্দও তার কানে যায়নি।
নিজের মাথাটায় একটা ঝাঁকুনি দিলে সুধাকর। কালকের রাতটা কীভাবে কেটেছে তার? যা-কিছু হয়েছে সে কি স্বপ্ন? সব কি ঘটে গেছে ঘুমের ঘোরে? সেই ছ-বছর পরে দেখা রাধাকে, অসহ্য উত্তেজনায় মাঝরাতে সেই নাটমন্দিরে গিয়ে হাজির হওয়া, সেই আশ্চর্য আবিষ্কার, সর্দার বৈরাগীর কথা, রাধা—আরও সুন্দর হয়েছে, ফর্সা হয়েছে আরও…
কিন্তু কী করেই-বা বলা যাবে স্বপ্ন? ওই তো পর পর দুখানা ভাউলি নৌকা দাঁড়িয়ে। ঢপের নৌকা! ওই তো কে যেন একটা স্টিমারঘাটের কাঠের রেলিঙে বসে চড়াসুরে গান ধরেছে :
ওলো, মন-মজানো বিনোদিনী রাই লো,–
তোমার প্রেম-সায়রে ডুব দিয়েছি
তল তবু না পাই লো!
সুধাকরের মাথার ভেতরে চড়াৎ করে উঠল। আজ সন্ধ্যার পরে গান শেষ হলে মন্দিরের পেছনে নিথর কালো গাব গাছটার ছায়ায়। তারপর তারপর একটা খুন হয়ে যাবে, হয় সর্দার বৈরাগী, নইলে সে নিজেই। দুজনে একসঙ্গে পেতে পারে না রাধাকে।
মাঝি, কেরায়া যাবে?
দুজন ভদ্রলোক যাত্রী। বগলে সতরঞ্চি-জড়ানো বিছানা, হাতে চামড়ার সুটকেস।
কোথায় যাবেন? কত দূরে?
গৈলা।
গৈলা! সে তো অনেক দূর!
অনেক দূর বই কী! ভদ্রলোক যাত্রীরা প্রাকুটি করলেন, হেঁটে যেতে পারলে আর তোমার নৌকা ভাড়া করতে আসব কেন? যাবে কি না বল?
না, অত দূর যেতে পারব না।
ওরে বাপ রে, তোমরা দেখছি দস্তুরমতো বাবু হয়ে গেছ আজকাল। ঘাট হয়েছে বাপু, তোমাকে বিরক্ত করেছি। বসে বসে ঝিমুচ্ছিলে-ঝিমোও।
ঠাট্টা করে গেল বাবুরা! তা যাক। আজ কিছুতেই ঘাট ছেড়ে নড়বে না সুধাকর, কুড়ি টাকার কেরায়া পেলেও না। কাছাকাছির যাত্রী হলে তবু ভেবে দেখা যেত, সন্ধের আগেই যাতে সে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু আজ উৎসাহ নেই। আজ সারাদিন সে অপেক্ষা করবে, অপেক্ষা করবে দাঁতে দাঁত চেপে। অসহ্য প্রতীক্ষাটাকে মন্থন করবে নিজের রক্তের ভেতরে।
দূরে গম্ভীর বাঁশির আওয়াজ। স্টিমারঘাটে চাঞ্চল্যের স্পন্দন। এক্সপ্রেস স্টিমার আসছে। পুরো একটা দিন—চব্বিশ ঘণ্টা। কিন্তু এই একটা দিনের মধ্যেই যেন যুগযুগান্ত কাল-কালান্ত পার হয়ে গেছে সুধাকর। ছ-বছর ধরে বুকের মধ্যে সব ঝিমিয়ে এসেছিল, এখন খড়ের আগুনের মতো দপ দপ করে জ্বলছে।
স্টিমার এগিয়ে এল ঘাটের দিকে। সাড়া পড়েছে নৌকার মাঝিদের মধ্যে, ঘাটের কুলিদের ভেতরে। মাঝনদী থেকে বড়ো বড়ো ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে নৌকার গায়ে, কাদাভরা তীরের ওপর। ইটের পাঁজাটার ওপরে গোটা দুই মাছরাঙা বসেছিল, কর্কশ আওয়াজ করে আকাশে ডানা মেলল তারা।
স্টিমার ঘাটে এসে লাগল। আজকে লোক নামল আরও কম, মাত্র দু-চারটি যাত্রী। ঘাটের কাছাকাছি যে দু-চারটে নৌকা ছিল, যা হয় তারাই ভাড়া পেল।
যাক, নিশ্চিন্ত। সন্ধ্যা পর্যন্ত নিশ্চিন্ত প্রতীক্ষা।
কিন্তু ও কে! হঠাৎ খরশান হয়ে উঠল সুধাকরের দৃষ্টি।
দু-তিন জন বৈরাগী এসে ঘাটের রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছে—স্টিমার দেখতে এসেছে। তাদের মাঝের লোকটাকে দেখবামাত্র একটা অশুভ অনুমান বিদ্যুতের মতো চমকে গেল পা থেকে মাথা পর্যন্ত।
সর্দার বৈরাগী। নিঃসন্দেহ।
এতদূর থেকেও দেখা যাচ্ছে কালো কদাকার লোকটাকে। মাথার চুল ধূসর, মুখে বসন্তের গোটা কয়েক চিহ্নও আঁকা আছে বলে বোধ হল। বয়েস হয়েছে, একটু কুঁজোও হয়েছে। পিঠটা, তবু শরীরটা এখনও অসামান্য শক্তিমান। মুখে একরাশ বিশৃঙ্খল সাদা দাড়ি— হাওয়ায় উড়ছে সেগুলো। চেহারা দেখলেই মনে হয় রাধার কথা মিথ্যে নয়, লোকটা এককালে ডাকাতি করত।
