জি, যদি ব্যবস্থা করতে পারেন…
তুমি খেপে গেলে মন্তাই? হাবিব মিয়ার বিস্ময় আর বাধা মানল না। সরকারি চালান যা এসেছিল সে তো ছ-মাস আগে লোপাট, একফালি কানি অবধি তার পড়ে নেই। আশমানের চাঁদ যদি চাও তাও টেনে নামিয়ে দিতে পারি, কিন্তু কাপড় নয়।
কিছুতেই কি উপায় হয় না, জনাব?
না, কোনো উপায় হয় না। হাবিব মিয়া মুখ বিকৃত করে বললেন, শালার কন্ট্রোল হয়ে সব সর্বনাশ করে দিয়েছে রে। সব গুনাহ আর সব না-পাক, দেশটা জাহান্নামে যাবে, বুঝলি?
কিন্তু দেশ জাহান্নামে যাক বা না যাক সেজন্যে মন্তাইকে খুব উৎকণ্ঠিত দেখা গেল না। একটা মস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে উঠে দাঁড়াল, তারপর আদাব জানিয়ে নেমে গেল অন্ধকারে।
হাবিব মিয়া আবার ঘুমোবার জন্যে চোখ বুজলেন। কিন্তু আর আমেজ এল না, নেশাটা বিলকুল চটিয়ে দিয়েছে লোকটা। তা হোক, তা হোক। ষাঁড়ের শত্রু বাঘে মারবে এইটেই লাভ। দোষের মধ্যে কাপড়ের জন্য বড় ঘ্যানঘ্যান করে। কাপড়। হাবিব মিয়া মৃদু হাসলেন, কাপড় আছে বই কী, কিন্তু জোড়া বত্রিশ টাকা, মন্তাইয়ের পক্ষে তা আকাশের চাঁদের চেয়েও দুরধিগম্য।
অন্ধকার ধানখেতের আল বেয়ে বেয়ে এগিয়ে চলেছে মন্তাই। সদর রাস্তা দিয়ে গেলে ঘুরতে হয় খানিকটা, এইটেই সোজা পথ। দু-পাশে ফলন্ত পাকা ধান পায়ের ওপরে পড়ছে লুটিয়ে লুটিয়ে। বাতাসে ধানের গন্ধ। ওই গন্ধে বুকটা ভরে যায়, কেমন শিরশির করে ওঠে রক্ত। আছে, সব আছে। এই ধান, খেতভরা এত মধুগন্ধী ধান একদিন ওদের সব দিত। দিত কাপড়, দিত মুখের ভাত, বউ-ঝিকে গড়িয়ে দিত রুপোর পৈঁছে। সে-ধান আছে, তেমনি মাতাল-করা গন্ধ আছে তার। আশ্চর্য, তবু কিছু নেই! বউ-বেটির পরনে কাপড় জোটে না, পেট ভরে না ভাত খেয়ে, কন্দ আর কচু খুঁড়ে বেড়াতে হয় শুয়োরের মতো। আল্লা…!
অন্ধকারে ধাক্কা লাগল একটা। আল থেকে হড়কে ধানখেতের ভেতরে নেমে পড়ল মন্তাই।
কে? চোখে দেখতে পাও না, রাতকানা নাকি?
অন্যদিক থেকে যে আসছিল সেও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
রাগ কোরো না ভাই, আঁধারে মালুম হয়নি।
আরে, জগন্নাথ ঠাকুর যে!
জগন্নাথ ঠাকুর চমকে উঠল। আঁতকে পিছিয়ে গেল তিন-পা। ঝড়ের সংকেতে থমথম করছে আকাশ, স্তব্ধ অন্ধকারের নির্জনতায় মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। মন্তাইয়ের আক্রমণের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলে জগন্নাথ সরকার।
বুঝতে পেরে এত দুঃখের ভেতরেও হেসে উঠল মন্তাই।
ভয় পাচ্ছ কেন ঠাকুর? এখানে তোমার সঙ্গে মারামারি করব না। যা কিছু লড়াই কাজিয়া তা হবে তোমাদেরই ওই কালীর থানে, তখন দেখা যাবে কার কলিজার জোর কত! তা এত রাত্রে চলেছ কোথায়?
জগন্নাথ ঠাকুরের গলায় স্বস্তির আভাস পাওয়া গেল, হাবিব মিয়ার কাছে।
হাবিব মিয়ার কাছে! আশ্চর্য হয়ে মন্তাই বললে, সেখানে কেন? মিটমাটের জন্যে?
মিটমাট? কীসের মিটমাট? জগন্নাথের গলার আওয়াজ উগ্র হয়ে উঠল, তোমরাও মরদ, আমরাও মরদ, লাঠিতেই মিটমাট হবে। সেজন্যে নয়, যাচ্ছি দু-খানা কাপড়ের জন্যে।
কাপড়?
হ্যাঁ, কাপড়! মানসম্মান আর রইল না মিয়া। বউ দু-দিন ঘর থেকে বেরুচ্ছে না। বলছে কাপড়ের জোগাড় না করলে গলায় দড়ি দেবে।
মন্তাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কাপড় পাবে না ভাই, তার চেয়ে বউকে গলায় দড়ি দিতে বলো। আমাকেও তাই করতে হবে।
মন্তাই আর দাঁড়াল না, হেঁটে চলে গেল হনহনিয়ে। ধানখেতের ভেতরে চুপ করে খানিকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল জগন্নাথ, কিছু-একটা বুঝতে চেষ্টা করছে যেন।
দিনের আলোয় দেখা গেল সমান উৎসাহে দু-দলই পাঁয়তারা কষছে।
কালী মাইকি জয়। আল্লা-হো-আকবর! রক্তপাত আসছে আসন্ন হয়ে। কোনো বার এ সময় ডাকাতে-কালীর থানে পুজো হয় না, কিন্তু এবার কী মানত আছে জগন্নাথ ঠাকুরের, তাই আগামী অমাবস্যায় পুজো তার না করলেই নয়। মূর্তি তৈরি হচ্ছে কুমোর পাড়াতে, সঙ্গে সঙ্গে শান পড়ছে টাঙ্গি-সড়কি-ল্যাজাতে। এবারে এসপার-ওসপার যাহোক কিছু হয়ে যাবে একটা।
এরা দাঁড়ায় ডাকাতে-কালীর থানের পাশে ঝুরি-নামা বট গাছের শান্ত স্যাঁতসেঁতে রহস্যঘন ছায়ায়। অন্ধকার কোটরে আগুনের ভাঁটার মতো ধকধক করে প্যাঁচার চোখ। এই নীলাভ বিচিত্র ছায়ায়, এই গা-ছমছম-করা অস্বস্তিভরা পরিবেশের ভেতরে দাঁড়িয়ে ওদের রক্তের আদিমতার সাড়া আসে। মনে পড়ে যায় অমাবস্যায় নরবলি হত এখানে, থকথকে রক্ত চাপ বেঁধে থাকত মাটিতে! এখনই আধ হাত জমি খুঁড়লে বেরিয়ে আসবে নরমুন্ডু, দেখা দেবে কবন্ধ-কঙ্কাল। ডাকাতে-কালী আজ আবার নতুন করে নরবলি চাইছেন।
ওপারে ফকিরের দরগার সামনে দাঁড়ায় ধলা মন্তাইয়ের দলবল। সমানে শানানো চলছে। ল্যাজা-সড়কিতে, বাঁশঝাড় উজাড় করে লাঠি কাটা হচ্ছে, তবে আপাতত শুধু ওদের লক্ষ করে যাওয়া। যত খুশি ঘরে বসে মূর্তি তৈরি করো, যত খুশি দল পাকাতে থাকো। কিন্তু থানে মূর্তি বসিয়ে ঢাকে একটা কাঠি দিলেই হয়, রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে। সব তৈরি আছে। ভেতরে ভেতরে।
চোখ শানিত করে দেখে ধলা মন্তাই, অন্যমনস্কভাবে থুতনির নীচে ছোটো দাড়িটা আঁচড়াতে থাকে। ওদিকে কুকুরছানার বেঁড়ে ল্যাজের মতো টিকিটা সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে ওঠে নমঃশূদ্রের ব্রাহ্মণ জগন্নাথ ঠাকুরের মাথায়।
