উঁচু পাঁচিলের চুন-সুরকি ঝরে গেছে, ইট বেরিয়ে পড়েছে এখানে-ওখানে। তাদের ওপর পা দিয়ে সতর্ক একটা জন্তুর মতো উঠতে লাগল সুধাকর। তারপর তিন মিনিটের মধ্যেই একেবারে প্রাচীরের মাথায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বড়ো বড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল সে, রাত্রির প্রেতের মতো চোখটা তীক্ষ্ণ করে দেখতে চাইল সবটা।
নাটমন্দিরেই পড়ে আছে সব। একরাশ মড়ার মতো নিস্তব্ধ। সারাদিনের ক্লান্তির পরে অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
দেয়ালের মাথাটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে যথাসম্ভব নিজের শরীরটাকে নীচে ঝুলিয়ে দিলে সে। তবু আরও দু-হাত তলায় মাটিটা। হাতটা ছেড়ে দিতেই সে নীচে পড়ল, ধুপ করে আওয়াজ উঠল একটা।
কয়েক মুহূর্ত নিথর হয়ে রইল সুধাকর, দাঁড়িয়ে রইল দেয়ালে পিঠ দিয়ে। কারোর কি ঘুম ভেঙে গেছে, টের পেয়ে গেছে কেউ? অসহ্য উৎকণ্ঠায় হাতুড়ি পড়তে লাগল বুকের মধ্যে। কান পেতে সে নিজের হৃৎস্পন্দন শুনতে লাগল।
না, কেউ নড়ে উঠল না। তেমনি নিঃসাড় নিস্পন্দ সব। একদল মড়ামানুষের মতো কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে। প্রাচীর ঘেঁষে ঘেঁষে ছায়ামূর্তির মতো সরতে লাগল সুধাকর। এর মধ্যে কোথায় সে খুঁজে পাবে রাধাকে?
সতর্ক পায়ে ঘুমন্ত মানুষগুলোর চতুর্দিক প্রদক্ষিণ করল সুধাকর। নানা অঙ্গভঙ্গিতে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমুচ্ছে সব। মাথার কাছে ছোটো-বড়ো পুটলি, হারমোনিয়াম, খোল, অন্ধকারে চকচকিয়ে ওঠা পেতলের করতাল। কিন্তু মেয়েরা কোথাও নেই।
আরে তাই তো, মেয়েরা কী করেই-বা থাকবে খোলা নাটমন্দিরে? নিশ্চয় আর কোথাও আছে তারা। কিন্তু কোথায় তা হতে পারে?
ভয়ের আড়াল ভেঙে সুধাকর ক্রমে দুঃসাহসী হয়ে উঠছিল। অন্ধকারে একটা রাত্রির প্রাণীর মতো সে নাটমন্দিরের চারদিক প্রদক্ষিণ করতে লাগল। তারপর ভোগের ঘরের কাছে আসতেই উৎকর্ণ হয়ে উঠল সে।
এককালে বারোয়ারিতলা যখন জমজমাট ছিল, তখন এই ঘরে বড়ো বড়ো হাঁড়ায় ভোগ রান্না হত। সে দশ বছর আগের কথা। এখন আর ও-ঘর কোনো কাজেই লাগে না। কবাটহীন দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকাতেই সুধাকরের নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল।
প্রায় দরজার পাশেই শুয়ে আছে রাধানিঃসন্দেহেই রাধা। ওদিকের জানালা দিয়ে হেলে-পড়া চাঁদের আলো তার মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। ছ-বছর আগেকার সেই মুখ, কপালে সেই উলকির চিহ্ন। আরও ভারী হয়েছে, আরও ফর্সা হয়েছে যেন। কয়েক মুহূর্ত নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের রক্তে করতাল শুনতে লাগল সুধাকর। তারপর লঘুভাবে স্পর্শ করে ডাকল, রাধা!
সঙ্গে সঙ্গে কান্ড হল একটা।
বিদ্যুদ্বেগে রাধা উঠে বসল। ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলে সুধাকরের গালে। চোখে যেন সর্ষের একরাশ ফুল দেখতে পেল সুধাকর।
তুমি আবার এসেছ বাবাজি? তোমার লজ্জা করে না? তোমাকে আমি হাজার বার বলিনি যে তেমন মেয়ে আমাকে তুমি পাওনি? সাপের গর্জনের মতো চাপা তীক্ষ্ণআওয়াজ উঠল রাধার গলায়।
বিহ্বলতা মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্যেই। তারপরেই সুধাকর বললে, বাবাজি নয় রাধা, আমি!
কে? কে তুমি? তারস্বরে রাধা চিৎকার করে উঠতে গেল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সুধাকরের হাত পড়ল তার মুখে। আত্মরক্ষার জৈবিক তাগিদে নিষ্ঠুরভাবে রাধার মুখ চেপে ধরে ফিসফিসে গলায় সুধাকর বললে, রাধা আমি—আমি! আমাকে চিনতে পারছ না? আমি জেলের ছেলে সুধাকর।
এতক্ষণ দু-হাতে রাধা সুধাকরের হাত সরাতে চাইছিল, গোঁ-গোঁ করে একটা চাপা আওয়াজ উঠছিল তার গলা থেকে, ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছিল তার চোখ। কিন্তু সুধাকরের নামটা কানে আসতেই তার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল থরথরিয়ে। ঝুলে পড়ল হাত দুটো–উদ্ভান্ত চঞ্চল চোখের তারা দুটো এক জায়গায় এসে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
সুধাকর মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিলে।
আমাকে এর মধ্যেই কি ভুলে গেলে তুমি?
রাধা আরও কিছুক্ষণ কথা কইতে পারল না। অদ্ভুত বিহ্বলচোখে সমানে তাকিয়ে রইল।
এই ছ-বছর ধরে আমি দিন গুনেছি শুধু তোমারই জন্যে। তুমি কি আমায় চিনতে পারছ না?
রাধা হঠাৎ যেন আত্মস্থ হয়ে উঠল। জড়িয়ে ধরল সুধাকরের দু-হাত।
কী করে এলে তুমি এখানে?
যেমন করে আসতে হয় প্রাচীর টপকে।
এখনি পালাও, পালিয়ে যাও এখান থেকে।
তোমাকে না-নিয়ে আমি আর যাব না।
সর্বনাশ, কী করে নেবে আমাকে?
যেমন করে নিজে এসেছি— প্রাচীর টপকে।
মাঝি, তুমি কি পাগল? এখনও ধরা পড়নি সে তোমার বিস্তর পুণ্যের ফল। কিন্তু বেশি দেরি করলে কী-যে হবে কিছুই বলা যায় না। এরা টের পেলে সঙ্গে সঙ্গেই তোমাকে পৌঁছে দেবে থানায়, দারোগা হাজতে ভরে দেবে চোর বলে। তুমি পালাও।
রাধা!
আমাকে তুমি পাবে না মাঝি। আমি ছাড়লে দল ভেঙে যাবে। সর্দার বৈরাগী বাঘের বাচ্চার মতো পাহারা দেয় আমাকে। আমি ইচ্ছেয় চলে যেতে চাইলেও ছাড়ান নেই তার হাত থেকে। আগে ডাকাতি করত, এখন বুড়ো হয়ে গেছে, খুঁতো হয়ে গেছে ডান হাত, তাই বৈরাগী সেজে ঢপের দল খুলে বসেছে। কিন্তু ইচ্ছে হলেই খুন করতে পারে এখনও।
আমিও খুন করতে পারি! সুধাকরের চোখ জ্বলজ্বল করতে লাগল।
তোমার হাত ধরছি মাঝি, আমার কথা রাখো। আজ তুমি পালাও। কাল সন্ধ্যায় যখন গান শেষ হয়ে যাবে, তখন মন্দিরের পেছনে বড়ো গাব গাছটার তলায় এসে দাঁড়িয়ে। আমার যা বলবার আছে সেই তখন বলব।
