রাত বাড়তে লাগল, কৃষ্ণপক্ষের রাত। বন্দর নিঝুম হয়ে গেল। স্টিমারঘাটের কাছে যে কেরোসিনের আলোটা জ্বলে সেটা নিবুনিবু হয়ে এল। পন্টুন থেকে কখন একটা লণ্ঠন হাতে নিয়ে বাড়ির দিকে চলে গেল ঘাটবাবু, কাল সকালের আগে আর সে আসবে না। নদীর অনেকটা দূর দিয়ে আবার একটা ডেসপ্যাঁচ চলে গেল। ঢেউ এসে নৌকাগুলোকে দোলাতে লাগল দোলনার মতো, পাড়ের ওপর উঠল আছড়ে-পড়া জলের ক্রুদ্ধ প্রতিবাদ।
আবার সব নিথর। স্টিমারঘাটের আলোটা নিভে গেছে এখন। শুধু জলের কলশব্দ। থমথমে রাত নেমে এসেছে চারদিকে। নদীটাকে কেমন আদি-অন্তহীন মনে হচ্ছে এখন। কেমন অদ্ভুত গুমোট রাত, কেমন ছাইরঙের অন্ধকার। হঠাৎ মনে হয় এরপরেই উঠবে একটা প্রচন্ড কাইতান-কার্তিকের ঝড়।
এইরকম এক-একটা রাত মাঝিদের বুকে ভয় ধরায়। এমনি এক-একটা থমথমে অন্ধকারে নদীর চাপা শব্দটা যেন একটা গোপন অর্থে ভরে ওঠে। হঠাৎ সন্দেহ হয় জলের মধ্যে কারা যেন ফিসফিস করে কথা কইছে। একটু কান পেতে শুনলেই সে-কথাগুলো স্পষ্ট বুঝতে পারা যাবে।
কারা কথা কইছে? কারা তারা? সুধাকর জানে, মকবুল জানে, এ অঞ্চলের সমস্ত মাঝিরাই জানে। নদী মা! জল দেয়, অন্ন দেয়। জ্যোৎস্নার রঙে, ভোরের আলোয় রূপসি হয়ে মন ভোলায়। কিন্তু… কিন্তু এইসব রাত্রে? তার অতল তলায় যারা আছে তাদের ঘুম ভাঙে। কত মানুষ ডুবে মরেছে এই নদীর জলে, দা-এর আর বল্লমের ঘায়ে কত লোককে খুন করে ডাকাতেরা এই সর্বনাশা জলেই ভাসিয়ে দিয়েছে, গলায় কলসি বেঁধে আত্মহত্যা করেছে কতজন, কতজনকে কুমিরে টেনে নিয়ে গেছে! এমনই এক-একটা নিশি-পাওয়া রাত্রেই তাদের ঘুম ভাঙে। তখন কুমিরের ভয়ে ডাঙার দিকে পালিয়ে আসে কামট, পাঙাশ আর ইলিশ মাছের দল আতঙ্কে নদীর তলায় কাদা কামড়ে পড়ে থাকে, একটা শুশুক পর্যন্ত ডিগবাজি খায় না। আর তখন…
তাদের যারা দেখে তারা শিবনেত্র হয়ে যায়। টকটকে লাল চোখে কোনো দৃষ্টি থাকে না, মুখ দিয়ে শুধু বেরিয়ে আসে বোবা গোঙানি। তারপর তিন দিনের দিন জ্বরবিকারে মরে যায়, নয়তো দু-ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় ওলাওঠায়। মরা মাঝির নৌকা স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে চলে যায় যেদিকে খুশি।
সুধাকরের বুকটা গুরগুর করে উঠল।
ভয় নয়, তার রক্তের তলা থেকেও অমনি একটা প্রেত উঠে আসতে চাইছে। কী অন্ধকার! কী বীভৎস অন্ধকার! পাতলা একটা মেঘের আস্তর ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে, যেন চিতার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে রাতটা।
এই রাত! এই রাত সবসময়ে আসে না। কিন্তু যেদিন আসে…
সুধাকর চোরের মতো উঠে পড়ল। জলের শব্দ, দূরে ব্যাঙের ডাক। দু-একটা বোয়াল মাছ ছলাৎ ছলাৎ করছে ইতস্তত। সুধাকর নৌকা থেকে নেমে গেল নিঃশব্দে।
বন্দরের অন্ধকার পথ দিয়ে নিঃসাড়ে চলল সুধাকর। একটা গোসাপ পালিয়ে গেল সামনে দিয়ে। দু-তিনটে শেয়াল জ্বলজ্বলে সবুজ চোখে তার দিকে তাকিয়ে পাশের ঝোপগুলোতে গা-ঢাকা দিলে। আচমকা হাওয়া দিল একটা, এদিক-ওদিকের সুপুরিবন থেকে দুটো-চারটে পাকা সুপুরি টুপ টুপ করে ঝরে পড়ল।
হঠাৎ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সুধাকর। একটু দূরেই একটা লণ্ঠন আসছে।
ঘুমের মানুষ, জাগো হ…
চৌকিদার। দেখতে পেলে এমনি ছাড়বে না, আধঘণ্টা ধরে কৈফিয়ত দিতে হবে, নইলে হয়তো টেনেই নিয়ে যাবে থানায়। কয়েকটা বন্য গাছের আড়ালে লুকিয়ে গেল সুধাকর।
ঘুমের মানুষ, জাগো হো…
ডাকতে ডাকতে সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল চৌকিদার। হাতের লাঠিটা ঠুকতে ঠুকতে অদৃশ্য হয়ে গেল বাঁক ঘুরে।
আরও খানিক নিঃসাড় হয়ে রইল সুধাকর। তারপরে আবার চোরের মতো এগোতে লাগল বন্দরের পথ ধরে। পায়ের কাছে ঝপাৎ করে কী পড়ল, দুরদুর করে উঠল বুক। নাঃ, ভয়ের কিছু নেই। কটায়-খাওয়া একটা শুকনো নারকেল খসে পড়েছে গাছ থেকে।
কিন্তু এইতো বারোয়ারিতলা। এখানেই আস্তানা নিয়েছে ঢপের দল।
সদরের বড়ো দরজাটা বন্ধ। ভেতরেও কোনো সাড়াশব্দ নেই। উঁচু উঁচু দেয়ালগুলো যেন ভূতুড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এক বারের জন্যে অনিশ্চিত হয়ে রইল সুধাকর। কিন্তু আর উপায় নেই। এত দূর যখন এসেছে, কোনো মতেই ফিরে যাওয়া চলে না। এই ভূতে-পাওয়া সর্বনেশে রাত্রে তাকেও যেন ভূতে পেয়েছে। যা হওয়ার হোক, একটা-কিছু সে করে যাবেই। যেমন করে তোক রাধার কাছে তাকে পৌঁছাতেই হবে।
কিন্তু! এই ছ-বছর পরে রাধা যদি তাকে চিনতে না পারে? যদি ছ-টা বছর নদীর জলের মতোই একেবারে মুছে গিয়ে থাকে তার মন থেকে? রাধার জীবনে হয়তো সুধাকরের মতো কত মানুষ এসেছে, আরও কত আদরে-সোহাগে ভরে দিয়েছে তাকে। সেখানে জেলের ছেলে সুধাকরকে সে মনে রাখতে পারে না। রাখবেই-বা কোন দুঃখে?
তা ছাড়া ওই মেয়েটিই যে রাধা তাই-বা কে বলতে পারে জোর করে? দূর থেকে যতটুকু দেখেছে তাতে তো ভুলও হতে পারে তার। একরকম চেহারার মানুষ কি দুজন থাকতে নেই সংসারে?
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের বুকের স্পন্দন শুনতে লাগল। কিন্তু আর অপেক্ষা করা যায় না। সন্দেহের শেষ কোথাও নেই। তাকে যতই বাড়িয়ে চলো, ততই সে ফেঁপে উঠতে থাকবে, থামতে সে জানে না।
তার চেয়ে যা হওয়ার তাই হোক। রাধাই হোক আর যেই হোক, এসেছে যখন আর ফেরা চলে না।
