দুজনে যখন পৌঁছাল তখন গান শুরু হবহব করছে। এর মধ্যেই বিস্তর লোক জড়ো হয়ে গেছে। মকবুলের চিন্তার কারণ ছিল না, ভেতরে ঢোকবার পথ এমনিতেই বন্ধ। আরও দশজন মাল্লা-মাঝি-গরিবের সঙ্গে সিংহদরজার বাইরেই দাঁড়াল তারা।
দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল উঁচু নাটমন্দিরের ওপর দুজন বৈরাগী অল্প অল্প খোলে চাঁটি দিচ্ছে, জন দুই ঝম ঝম করছে করতাল নিয়ে। রামধন সাহা গলায় সিল্কের চাদর জড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন, হাতজোড় করে কী যেন বললেনও সবাইকে। কিন্তু চারদিকে প্রচন্ড গোলমালে তার একটি বর্ণও শোনা বা বোঝা গেল না।
কিন্তু তারপরেই যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল সব। জনতার কোলাহলের ওপর দিয়ে তিরের মতো তীক্ষ্ণ সুরেলা গলায় ভেসে এল :
ছোড়ল আভরণ মুরলী-বিলাস,
পদতলে লুটই সো পীতবাস!
সখিরে, যাক দরশ বিনু ঝুরই নয়ান–
অব নাহি হেরসি তাকে বয়ান—
ঢপের প্রধান নায়িকা এসে দাঁড়িয়েছে আসরে। সাদা শাড়ির জরিপাড়টা চকচক করছে, মোটা একছড়া গোড়ের মালা দুলছে তার গলায়। এত দূর থেকে তাকে ভালো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু যতদূর অনুমান করা যাচ্ছে মেয়েটি সুন্দরী—রীতিমতো সুন্দরী।
মকবুল বললে, বেড়ে গাইছে না?
সুধাকর সংক্ষেপে বললে, হুঁ!
সুন্দরী তেজহ দারুণ মান–
পদতলে লুটই রসিক কান—
সভা স্তব্ধ। এতগুলো মানুষ নিঃশব্দ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মাথা দুলছে শুধু, কখনো-বা টান পড়ছে হাতের বিড়ি-সিগারেটে।
গাইতে গাইতে মেয়েটি মুখ ফেরাল। আর সঙ্গে সঙ্গেই যেন সাপের ছোবল খেল সুধাকর।
আর্তনাদের মতো চাপা একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল গলা দিয়ে।
কী হয়েছে? প্রশ্ন করল মকবুল। চারপাশের মানুষগুলো ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ফেলল সুধাকরের ওপর।
কিন্তু ততক্ষণে শরীরের সমস্ত রক্ত এসে জমেছে সুধাকরের মাথায়। বুকের ভেতরে পড়েছে হাতুড়ির ঘা। বিশ্বাস করা যায় না, তবুও মিথ্যে নয়! ওই মেয়েটি…
আর কেউ হতেই পারে না। রাধা!
পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সুধাকর। গানের একটি বর্ণও আর কানে আসছে। মাথার মধ্যে একরাশ কুয়াশা পাক খাচ্ছে। বুকের ভেতরে যেন এক্সপ্রেস স্টিমারটা চলছে, আর রক্তের ঢেউ আছড়ে পড়ছে মাথার খুলিতে।
সামনের পাঁচ-সাতশো মানুষরে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আর মাঝির ছেলে সুধাকরের সাধ্য কী এখন হাত বাড়ায় রাধার দিকে! আকাশের চাঁদের চাইতেও অনেক দূরে—ধরাছোঁয়ার সীমার বাইরে সরে গেছে রাধা।
মকবুল আবার উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। ফিসফিস করে বললে, খাসা চেহারা, খাসা গান!
সুধাকর বললে, হুঁ।
কিন্তু কতক্ষণ এভাবে থাকা যায় আর? একটা বনবেড়াল যেন হৃৎপিন্ডটাকে আঁচড়ে চলেছে সমানে। কপালের ওপরে খরখর বিঁধছে একরাশ তীক্ষ্ণধার কাঁটা। খানিক পরেই সুধাকর বললে, তুমি গান শোনো, আমি নৌকায় ফিরে যাই।
সে কী কথা! এই তো সবে জমে উঠেছে! মকবুলের বিস্ময়ের অন্ত রইল না।
আমার শরীর বড়ো খারাপ লাগছে, আর থাকতে পারছি না।
কিন্তু বড়ো ভালো গান হচ্ছে যে।
তা হোক।
মকবুল আর আপত্তি করল না। তার সারা মন পড়ে রয়েছে গানের দিকে। সমস্ত মানুষ যখন দু-কান ভরে রাধার গান শুনছে, তখন আসর থেকে একা বেরিয়ে এল। সুধাকর। বন্দরের অন্ধকার পথটাকে আরও কালো মনে হচ্ছে এখন। পায়ের নীচে মাটিটা কালাবদরের ঢেউয়ের মতো দুলছে। ছ-বছরের ক্ষুধার্ত জানোয়ারটা এখন আর এক মুহূর্ত প্রতীক্ষা করতেও রাজি নয়!
রাধা! এতদিন পরে যখন পেয়েছে, তখন আর ছাড়বে না। সেদিন আঠারো বছরের মন নিঃসংশয় হতে পারেনি, ছোটোবাবুর প্রেতমূর্তিটা সবসময় চোখের সামনে যেন ভেসে বেড়াত। কিন্তু এই ছ-বছরে অনেক গাং পাড়ি দিয়েছে সুধাকর, অনেক কালবৈশাখীর মুখে পাল তুলেছে মাতাল নদীতে। গত শীতকালে বল্লম দিয়ে চিতাবাঘও মেরেছে একটা। চব্বিশ বছরের সুধাকর এত সহজেই হাল ছাড়বে না।
মকবুল ঘাটে ফিরল রাত এগারোটার পরে। মুখে গুনগুন গান। অদ্ভুত পরিতৃপ্ত সমস্ত মন। এমনকী রোকেয়াবিবির ক্ষোভটাও ভুলে গেছে আপাতত।
কী দোস্ত, ঘুমিয়েছ?
ঘুমোবার সাধ্য কী সুধাকরের। অসহ্য যন্ত্রণা চমকে বেড়াচ্ছে সর্বশরীরে। ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে বেরিয়ে ডাকাতি-খুনোখুনি যাহোক একটা কিছু করে আসে!
কী মাঝির পো, ঘুমে বেঘোর নাকি?
আবার জিজ্ঞাসা এল মকবুলের। কিন্তু সুধাকর জবাব দিলে না, পড়ে রইল মুখ গুঁজে। কথা বলবার মতো কোনো উদ্যম তার অবশিষ্ট নেই। আর কীই-বা বলবার আছে? হয়তো মকবুলকে ব্যথার ব্যথী করা চলে, একটা উপদেশ চাওয়াও যাবে তার কাছে। কিন্তু সব কথা খুলে বলার মতো মানসিক প্রশান্তি এখন নেই সুধাকরের। তার চেয়ে চুপ করে থাকাই ভালো।
মকবুল আর ডাকল না। সুধাকর কান পেতে শুনতে লাগল তার সুরের গুঞ্জন। রাধার গানই নিশ্চয়! তারপরে লণ্ঠন জ্বালল, তামাক সাজল, অনেকক্ষণ ধরে তামাক খেল। কলকেটা নদীর জলে উবুড় করে ফেলার ছ্যাঁক ছ্যাঁক আওয়াজ পর্যন্ত কানে এল সুধাকরের।
মকবুল এবার গলা ছাড়ল :
মুখ তুলে চাও সজনি–
তোমারি নাম বাঁশিতে মোর
বাজে লো দিন-রজনি।
রাধার গান! একটা অদ্ভুত হিংস্রতায় সুধাকরের চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করল। থামো থামো। ও আমার রাধার গান, ওর ওপরে তোমাদের কারও কোনো দাবি নেই। কিন্তু সেকথা কিছুতেই বলা গেল না, দাঁতে দাঁত চেপে সুধাকর পড়ে রইল।
