মনের মানুষ?
বুকের ভেতরে জ্বালা করে সুধাকরের। আঠারো থেকে চব্বিশ—এই ছ-বছরের পরেও সে-জ্বালা এখনও অনির্বাণ। আজও সে বিশ্বাস করে, রাধা যদি কারও খোঁজে বেরিয়ে পড়ে থাকে, তবে সে সুধাকর ছাড়া আর কেউ নয়। কিন্তু এখনও সে তাকে খুঁজে পায়নি। এক একটা বাঁকের মুখে পড়ে যেমন আনাড়ি মাঝির নৌকা বোঁ বোঁ করে ঘুরতে থাকে অথচ বেরিয়ে আসবার পথ পায় না, সে-দশা রাধারও। যদি বেঁচে থাকে, তবে আজও সে সুধাকরের জন্যেই বেঁচে আছে।
কয়েক বারই ভেবেছিল একদিন রাতে ধারালো একটা দা নিয়ে সে ঢেকে রায়কর্তার বাড়ি। নেশায় অচেতন ওই প্রকান্ড লাশটার বুকের ওপর চেপে বসে তারপর প্রশ্ন করে, বলে দাও কোথায় আছে রাধা! নইলে এই দা দিয়ে গলা দুখানা করে ফেলব তোমায়!
কিন্তু সে-আশাও সুধাকরের মেটেনি। আজ প্রায় চার বছর আগে কলকাতায় ছটফটিয়ে মরে গেছে ছোটোকর্তা। যকৃতে জল হয়েছিল তার।
সেজন্যে একবিন্দু দুঃখ নেই। শুধু এই ক্ষোভটাই সে কিছুতে ভুলতে পারছে না যে, মরে গিয়ে ছোটোকর্তা চিরদিনের মতোই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে রাধাকে—আর তাকে ফিরে পাওয়ার পথ নেই কোথাও।
তবু সুধাকর অপেক্ষা করবে।
ছ-বছর কেটে গেছে। আরও কতদিন যাবে জানা নেই। কিন্তু রাধাকে না পাওয়া পর্যন্ত তো সুধাকরের বুকের উপবাসী জন্তুটা তৃপ্তি মানবে না কিছুতেই। আর কাউকে তো সে ঠাঁই দিতে পারবে না মনের মধ্যে। আর কাউকে নিয়ে তো তার ঘর বাঁধবার উপায় নেই। তাতে যদি তার ঘর চিরদিন শূন্য থাকে তবে তাই থাক।
একটা বাঁক ঘুরে সুধাকরের নৌকা এবারে গাঙে এসে পড়ল। লাল আলো পড়েছে জলে, কেমন অদ্ভুত লাগছে দেখতে। জোয়ারের ঘোলাজলে দিনান্তের শেষ রং দেখে মনে হচ্ছে যেন মোষবলি হয়ে গেছে একটা, রক্তে আর কাদায় চারদিক একাকার।
সামনে গঞ্জ। নৌকার সারি এখনও তেমনি করে প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে। দুটি-চারটি সরেছে। বটে, কিন্তু জমেছে আরও বেশি। পুজোর পরে কেরায়া নৌকার মাঝিদের বড়ো দুঃসময় এখন।
তার মধ্যে মকবুলের নৌকা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক। ওর ভাড়াটে জোটেনি। জীবনের সব কিছুই ওর ফাঁকা, নৌকাও ফাঁকা পড়বে তাতে আর আশ্চর্য কী।
৩.
এলে? নৌকা লাগাতেই মকবুলের প্রশ্ন।
এলাম। পালটা উত্তর সুধাকরের।
মকবুলের পাশেই খালি জায়গা ছিল একটা। সুধাকর নৌকা ভেড়াল সেখানে।
এবেলাও ফাঁকা গেল তাহলে? প্রশ্নটা করার ইচ্ছে ছিল না, তবু সুধাকর সেটা থামাতে পারল না।
জিজ্ঞাসা করেই সে লজ্জা পেল।
আমার কী? ভাড়াটে জুটল না ইদ্রিশ মিয়ার, আমি কী করব? আমি চিনির বলদ, বোঝ টেনে চলেছি, টেনেই চলব। এক-আধটা দিন ছুটি পাই তো হাত-পা ছড়িয়ে বেঁচে যাই।
কিন্তু মাইনে কেটে নেবে যে!
নিক গে যাক। আমার তো এমনি উপোস অমনিও উপোস। একমুঠো আমানি ভাত না। জোটে মুড়ি চিবিয়েই পড়ে থাকব।
সুধাকর কিছুক্ষণ মকবুলের দিকে তাকিয়ে রইল। মকবুলের মুখ থেকে দুপুরের সেই ছায়াটা এখনও সরে যায়নি। রোকেয়া বিবি। এখনও ঘুণের মতো কুরে কুরে খাচ্ছে বুকের ভেতরে।
সুধাকর ছইয়ে বসল হেলান দিয়ে। একটা পোষা বেড়ালের মতো কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমুচ্ছে উদটা। সস্নেহে সুধাকর তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বেড়ালের ডাকের মতোই একটা গুরগুরে আওয়াজ বেরুতে লাগল তার গলা দিয়ে।
একটু দূরে দুখানা বড়ো ভাউলি নৌকা তখন এসে লেগেছে। সুধাকরের চোখ সেদিকে পড়তেই মকবুল জবাব জুগিয়ে দিলে।
গানের দল এসেছে আজ। ঢপ-কীর্তনের দল। বারোয়ারিতলায় গান হবে।
আজই? সুধাকর চকিত হয়ে উঠল।
তাই তো শুনেছি।
এক বার গেলে হত শুনতে! কখন লাগবে?
সন্ধের পরেই। তা যেতে চাও যাও-না।
তুমি যাবে?
আমি? মকবুল এক বার উদাস আর উদার দৃষ্টিতে সন্ধ্যার আকাশের দিকে তাকাল, কিন্তু আমি গিয়ে কী করব? আমি মুসলমান, আমাকে তো আর ভেতরে ঢুকতে দেবে না।
আর ভেতরে ঢুকলে আমাকেই বুঝি ফরাশে বসিয়ে তামাক খেতে দেবে? সুধাকর হাসল, সব গরিবেরই এক অবস্থা ভাই, হিন্দু-মুসলমান বলে কোনো কথা নেই। বেশ তো, দুজনেই নয় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব। গান শোনা নিয়ে কথা!
তবে চলো নিরাসক্ত উত্তরটা প্রায় নদীর বাতাসেই ছেড়ে দিলে মকবুল। রাত্রে আর রান্নার পাট করবার উৎসাহ নেই। সুধাকরের নয়—মকবুলেরও না। তাড়াতাড়ি চারটি চিড়ে চিবিয়ে নিলে দুজনে। সকালের একমুঠো ভাত আছে, আর আছে দুটো কুচো চিংড়ি। ওদের ওতেই কুলিয়ে যাবে।
তারপর রওনা হল গান শুনতে।
বন্দরের অবস্থা জমজমাট ছিল এককালে, এখন ভাঙনদশা। অর্ধেক নদীতে নিয়েছে, সে আমলের বনেদি বাড়িগুলো এখন নিশ্চিহ্ন। তা ছাড়া পাশাপাশি বড়ো হয়ে উঠেছে ঝালকাঠির বন্দর, এখানকার ঐশ্বর্য গিয়ে সংহত হয়েছে সেখানে। এর অর্ধেক এখন শূন্যপুরী। ধান চালের যে-কারবার এখানকার সব জায়গাতেই চলে, তারই কিছু কিছু অবশিষ্ট আছে এখন। আট-দশ ঘর বড়ো বড়ো সাহা আছে আর আছে দুটো ধানের কল। সেগুলো সরে গেলেই সব অন্ধকার।
বারোয়ারিতলা সেই অতীত আমলের। রাধাকৃষ্ণের মস্ত মন্দির আছে, আছে নাটমন্দির। তারাও ভাঙতে শুরু হয়েছে, কেউ বিশেষ হাত লাগায় না আর। যতদিন আছে ততদিনই চলবে, তারপর যেদিন ঝুপঝুপিয়ে ভেঙে পড়বে সেদিন একেবারেই মিটে যাবে সমস্ত।
তবু রামধন সাহার এক-আধটু নজর আছে এদিকে। তারই চেষ্টায় কিছু কিছু জমে আছে বারোয়ারিতলা। এই গানের ব্যবস্থাও তারই উদ্যোগে।
