সুধাকর ঝুপ করে লগিটা পুঁতে ফেলল। তারপর কচুরির ঝাঁকটাকে টেনে তুলল নৌকার ওপর। অনুমান নির্ভুল। প্রায় আধপো কুচো চিংড়ি আর গোটা কয়েক ডারকিনা মাছ ছটাং ছটাং করে লাফাতে লাগল চারদিকে।
নে জুয়ান, খা। তোর খিদে পেয়েছে নিশ্চই।
জুয়ানকে নিমন্ত্রণ করবার দরকার ছিল না। যেমন করে ছোটো ছেলেপুলে এক-একটা করে মুড়ি কুড়িয়ে খায়, তেমনিভাবেই সে মাছগুলোর সদগতিতে লেগে গেল।
আবার নৌকা ছাড়ল সুধাকর। মকবুল, রোকেয়া! গোলামের বাদশাজাদি পাওয়ার স্বপ্ন! কিন্তু সে নিজেও তো কিছুতেই তো ভোলা যাচ্ছে না রাধাকে। বারে বারে মনে পড়ছে, একটা দুঃসহ যন্ত্রণায় মনে পড়ে যাচ্ছে। সুধাকর ঠোঁট কামড়ে ধরল।
সেই রাত। সে তো শেষ রাত নয়। আঠারো বছরের সুধাকরকে রাধা বলেছিল, আবার
কিন্তু এখানে?
কোনো ভাবনা নেই। সন্ধ্যার পরে বাবুর আর সাড় থাকে না।
তা থাকে না। কিন্তু সেজন্যে ছোটো রায়কর্তার কোনো লজ্জা-সংকোচের প্রশ্ন নেই। তিনি নিজেই গর্বভরে অনেক বার বলেছেন, সন্ধের পরে কোনো ভদ্রলোক কী করে যে চোখ মেলে তাকায় আমি তো সেকথা ভেবেই পাইনে।
নিঃসন্দেহ! খাঁটি ভদ্রলোক হতে গেলে সন্ধের পরে কিছুতেই চোখ খুলে রাখা উচিত নয়। কিন্তু সুধাকর তো ভদ্রলোক নয়। তাই সন্ধ্যার অন্ধকার তার রক্তে একটা কীসের যেন ঘুম ভাঙায়, প্রত্যেকটা মুহূর্ত যেন তার বুকের মধ্যে মৃদঙ্গের আওয়াজের মতো ঘা দিতে থাকে। রাত্রির আড়ালে আড়ালে যারা শিকার খুঁজে বেড়ায়, তাদের মতোই কতগুলো খরধার নখদন্তের অস্তিত্ব নিজের মধ্যে অনুভব করতে থাকে সুধাকর। আঠারো বছরের বলিষ্ঠ হাতের মুঠো দুটো যেন থাবা হয়ে যায়, বনবেড়ালের চোখের মতো জ্বলতে থাকে দৃষ্টি।
সুধাকর ভদ্রলোক নয়, তাই রাত্রিই তার সময়।
প্রথম দিন রাধাই দাঁড়িয়ে ছিল দোরগোড়ায়, খিড়কির ধারে।
আপনি?
আবার আপনি? রাধা ধমক দিয়ে উঠেছিল, আমি কপালির মেয়ে। নাম ধরেই ডেকো আমাকে।
একবার তাকিয়ে দেখল সুধাকর। কানে সোনার দুল দুটো ঝকঝক করছে। কপালের উলকিটা যেন রাজটিকা। তবু রাজকন্যা নয়—রাধা।
রাত্রির নেশা তখন একটু একটু করে কাঁপছে রক্তে। আকাশে নক্ষত্ররা বিহ্বল। গাছের ডালে ডালে অতন্দ্র বনবেড়াল ঘুরছে শিকারের সন্ধানে। সেই বনবেড়ালের লুব্ধ পিঙ্গল চোখের মতোই জ্বলে উঠল সুধাকরের চোখ।
সেই মুহূর্তের প্রভাবে সুধাকর বলেছিল, বেশ তাই হবে। কিন্তু তুমি আমায় ডেকেছ কেন?
সেকথা তো এখানে বলা যাবে না। চলো ভেতরে।
ভেতরে? এক বারের জন্যে কুঁকড়ে গিয়েছিল সুধাকর। কিছুই বিশ্বাস নেই, কে জানে কোথায় অপেক্ষা করে আছে একটা বিপজ্জনক ফাঁদ! ছোটো রায়কর্তা যদি টের পান?
রাধা বলেছিল, কোনো ভয় নেই। আমি বলছি, তুমি এসো আমার সঙ্গে।
সত্যিই ভয় ছিল না। নেশায় বেঘোর হয়ে একটা জগদ্দল পাথরের মতো পড়ে আছেন রায়কর্তা। পড়ে আছেন উবুড় হয়ে মস্ত ফরাশের ওপর। রাধার পায়ের শব্দ শুনে জড়ানো গলায় কী যে বললেন সেটা বোঝা গেল না।
কী করে সেই রাতকে ভুলবে সুধাকর? কেমন করে ভুলবে সেই আশ্চর্য রূপকথা?
কত সহজে নিজের কথা বলেছিল রাধা! কত অবলীলাক্রমে কপালির মেয়ে নিজেকে মেলে ধরেছিল জেলের ছেলের কাছে!
সে-মুখ সুধাকর পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে এখনও। পদ্মফুলের ওপর দিয়ে গড়িয়ে চলেছে জলের বিন্দু।
আমি আসতে চাইনি, কক্ষনো আসতে চাইনি এখানে। একমুঠো টাকা নিয়ে আমার কাকা আমাকে তুলে দিয়ে গিয়েছিল জমিদারের বজরায়।
তারপর–
তারপর চার বছরের ইতিহাস। অন্ধকার আর অন্ধকার। টাকা-গয়না সব পেয়েছে রাধা, কিন্তু আর-কিছুই তো পায়নি। রায়কর্তার ঘরে আরও অনেক পুতুলের মতো তাকেও সাজিয়েই রাখা হয়েছে শুধু। আরও বহু মেয়ে এসেছে এর মধ্যে, একটার পর একটা শূন্য মাটির ভাঁড়ের মতো তাদের দূরে ছুড়ে দিয়েছে ছোটোকর্তা।
রাধা তার পাটরানি। তবু…
সেই বৃষ্টি-বোয়া পদ্মের মতো মুখোনা রাধা তুলে ধরেছিল সুধাকরের দিকে।
নিয়ে যাও আমাকে এখান থেকে, নিয়ে যাও। অনেক দূরে কোথাও নিয়ে ছেড়ে দাও। নতুন করে ঘর বাঁধতে না-পারি, ভিক্ষে করে খাব।
শিউরে উঠে পালিয়ে এসেছিল সুধাকর।
সেই শেষ নয়, তারপরে আরও আরও অনেক সন্ধ্যা। অনেক প্যাঁচার ডাক, ঝিমঝিম রাতের অনেক বুক দুড়দুড় প্রহর। সবশেষে রাধা সুধাকরের দু-হাত জড়িয়ে ধরেছিল।
নিয়ে যাও এখান থেকে, নিয়ে যাও আমাকে। অনেক সোনার গয়না আছে আমার, অনেক টাকা আছে। কোনো কষ্ট হবে না।
কিন্তু সেই মুহূর্তে সুধাকর বুঝেছিল, বড়ো বেশি এগিয়ে গেছে সে! পা দিয়েছে সাপের গর্তে।
রাধা বলেছিল, চলো শহরে যাই। তুমি বিড়ির দোকান করবে, আমি পান সেজে দেব। কোনো অভাব আমাদের থাকবে না। না না, এ শহরে নয়, কলকাতায়। আমি দেখেছি কলকাতা। কত বড়ো, কত লোক! সেখানে কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না।
ঠিক সেই সময় হঠাৎ শোনা গিয়েছিল চটির আওয়াজ। ছোটোকর্তা। আজ নেশাটা তাঁর মাঝপথে কেন চটে গিয়েছিল কে জানে!
পাঁচিল টপকে পালিয়েছিল সুধাকর।
সেই থেকে রাধাও মুছে গেল চিরদিনের মতো। আর রাধার কোনো খবর পায়নি সে। ছোটোকর্তার যে-মাঝিটা চুপি চুপি রাধার খবর নিয়ে আসত তার কাছে, সেও কোনো হদিশ। দিতে পারেনি আর।
কী হল রাধার?
কেউ ফিসফিস করে বলেছিল, ছোটোকর্তা তার গলা টিপে মেরেছে। কেউ বলে, কলকাতায় নিয়ে গিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছে কোথাও। কেউ-বা আন্দাজ করে—রাধা নিজেই পালিয়ে গেছে ছোটোকর্তার খপ্পর থেকে, কোনো মনের মানুষকে নিয়ে ভেসে পড়েছে যেদিকে চোখ যায়।
