নেশায় ঝুঁদ হয়ে আছেন ছোটোকর্তা। বেপরোয়া মেজাজের লোক। নেশায় সাক্ষাৎ বৃহস্পতি, চরিত্রে গুণের ঘাট নেই। পাড়ার ঝি-বউ সন্ত্রস্ত থাকে তাঁর ভয়ে। বিয়ে একটা করেছিলেন, কিন্তু স্ত্রী ছ-মাসের বেশি টিকতে পারেননি। শোনা যায় আফিং খেয়েছিলেন। ডাক্তার কবিরাজে তাঁকে বাঁচাল, কিন্তু ছোটোকর্তার সংসারে তিনি আর রইলেন না। কিছুদিন পরে বাপেরবাড়ির লোক এসে ছোটোগিন্নিকে উদ্ধার করে নিয়ে গেল। আর ফিরে আসেননি তারপরে।
কিন্তু ছোটোকর্তা নিরঙ্কুশ সেই থেকে।
রেসের মরশুমে কলকাতা যান, মাস কয়েক থাকেন। তারপরে আবার গ্রাম। দিনদুপুরেই পড়ে থাকেন মদে চুর হয়ে, নিজের রক্ষিতা নিয়ে বেড়াতে বেরোন খোলা নৌকায়।
আজও বিজয়ার দিনে বেরিয়েছিলেন রং চড়িয়েই।
তাঁরই বজরার মাঝিরা তুলে এনেছে সুধাকরকে।
চোখ মেলতেই সুধাকর দেখল গোলগাল ফর্সা একটি মুখ। পানের রসে রাঙানো টুকটুকে ঠোঁট। পরনে নীলাম্বরি শাড়ি-হাতে সোনার চুড়ির ঝলক।
একটু ভালো আছ এখন?
কথা তো নয়—যেন গানের সুর।
বজরার ভেতরে গ্যাসের আলো জ্বলছে। সেই আলোয় যেন মায়াপুরীর মতো মনে হল সমস্ত। পায়ের পাতায় টেটার অসহ্য যন্ত্রণা ভুলে গেল সুধাকর। তাকিয়ে রইল মুগ্ধদৃষ্টিতে।
একটা গম্ভীর গমগমে গলা এল এবার।
লোকটাকে এখন নামিয়ে দাও ডাঙায়। বাড়ি চলে যাক।
সেই ফর্সা সুন্দর মুখোনা ভরে উঠল করুণায়। দুটি কালো চোখ চকচক করে উঠল। না। দাঙ্গার পরে পুলিশে সব খুঁজে বেড়াচ্ছে। ওকে পেলে এখুনি নিয়ে যাবে থানায়।
তাহলে কী করা যায়! আবার সেই গম্ভীর জড়ানো গলাটা শুনতে পাওয়া গেল, কী করতে চাও একে নিয়ে?
সুধাকর তাকিয়ে দেখল। প্রকান্ড মুখ, কালিপড়া কোটরের ভেতরে রাঙা টকটকে চোখ। ছোটোবাবু।
সুন্দর মানুষটি বললে, আজ আমাদের ওখানেই নিয়ে চলো।
কী বলছ তুমি? একটা দাঙ্গার আসামিকে নিয়ে—
সে আমি বুঝব। তোমায় ভাবতে হবে না।
সেই মিষ্টি মুখের কথা। কিন্তু কথা নয়—আদেশ। ছোটোকর্তা বললেন, বেশ, তাই হবে।
তারপর…
তারপরের অভিজ্ঞতা কী করে ভুলবে সুধাকর? সে যেন স্বপ্নের ঘোরে পরির দেশের আশ্চর্য কাহিনি। বাইচের নৌকা থেকে রূপকথার রংমহলে।
সুধাকর আবার কখন যে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল কে জানে। যখন ঘোর ভাঙল তখন পিঠের নীচে দুধের মতো নরম বিছানা। সামনে ছোটো টেবিলে একটা কাচের গ্লাস-ভরতি গরম দুধ। আর— আর সেই স্বপ্নময়ী মেয়েটি। একটা চেয়ারে তারই মুখোমুখি বসে আছে।
আবার সেই গানের সুর শোনা গেল।
নাও, এই দুধ খাও।
সুধাকর চোখ কচলাল। ব্যাপারটা এখনও বাস্তব বলে মনে হচ্ছে না তার।
উঠে বসো, খেয়ে নাও দুধটা।
আদেশ। সুধাকরকে উঠে বসতে হল। পরনে ভিজে কাপড়টা নেই, একখানা মসৃণ ধুতি কে যেন জড়িয়ে দিয়েছে। পায়ে যেখানে টেটার ঘা লেগেছিল, সেখানে একটা পুরু ব্যাণ্ডেজ। যন্ত্রণা আছে, তবু আঠারো বছরের শরীরটা আবার শক্তি আর লঘুতায় ভরে উঠেছে।
দেখুন, এবার আমি যাই।
এখনি যাবে কোথায়? আজ রাতে বিশ্রাম করো এখানে। তোমার কোনো ভয় নেই, এবাড়িতে পুলিশ আসবে না।
দেখুন, আপনারা আমাকে…
মেয়েটি ভঙ্গি করলে। বিহ্বলতার নেশা লাগল সুধাকরের।
মেয়েটি বললে, আমাকে অত আপনি আপনি করছ কেন? আমি এবাড়ির গিন্নি নই।
তাহলে আপনি…
আমি কে পরে বলছি। তোমার নাম কী?
আমার নাম সুধাকর।
সুধাকর! বেশ নাম। মেয়েটি মনে মনে যেন আউড়ে নিলে একবার। কী জাত?
বলতে গিয়ে একটা ঢোঁক গিলল সুধাকর। এই ঘর, দুধের ফেনার মতো নরম বিছানা, সামনে বিচিত্র চেহারার ওই ঝাড়লণ্ঠনের আলো, আর এই আশ্চর্য মোহময় মেয়েটি। এখানে নিজের পরিচয় আরও একটু বুক ফুলিয়ে বলতে পারলে হত। ভালো হত আরও গর্বের সঙ্গে বলতে পারলে। কিন্তু কুঁকড়ে গিয়ে সুধাকর বললে, আমরা জাতে জেলে।
আমি কপালির মেয়ে। রাধা আমার নাম।
কপালির মেয়ে! চকিতে বিস্ময় চলকে পড়ল সুধাকরের চোখ থেকে। তাহলে–? তারপরেই লোকশ্রুতিতে শোনা ছোটোবাবুর কাহিনি মনে পড়ে গেল সুধাকরের। ছোটোকর্তা অত্যন্ত দুশ্চরিত্র লোক, নিজের স্ত্রীকে তাড়িয়ে দিয়েছে বাড়ি থেকে, রক্ষিতা নিয়ে থাকে।
সুধাকর শিউরে উঠল এক বার। রক্ষিতা! জেলের ছেলে সুধাকরেরও সর্বাঙ্গে একটা ঘৃণার ঢেউ বয়ে চলে গেল। এক বার মনে হল…
কিন্তু পরক্ষণেই রাধার দিকে চোখ তুলে চেয়ে দেখল সে। কাকে ঘৃণা করবে সে, কাকে ভাববে রক্ষিতা? বয়েসে তারই সমান হবে মেয়েটি, রূপ আর যৌবন ফেটে পড়ছে পাকা ডালিমের মতো। কপালির ঘরে এমন মেয়ে কোথা থেকে জন্মায়! কী করেই-বা জন্মায়।
রাধা বললে, কাজেই বুঝতে পারছ আমার কাছে তোমার লজ্জার কিছু নেই। আমাকে আপনি-আজ্ঞেও করতে হবে না। এখন এই দুধটা খেয়ে নাও।
এবার আর দুধের গ্লাস তুলে নিতে আপত্তি রইল না কোথাও।
আপন ডাইন, আপন ডাইন!
একটা তীব্র চিৎকার। সুধাকরের ঘোর ভেঙে গেলে। ক্ষিপ্র হাতে নৌকাকে সামলে নিলে সে। খালের বাঁক ঘুরে আর একখানা নৌকা যে আসছিল, তার সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে গেছে। ছইয়ের বাতাগুলো কট কট করে উঠল, ও-নৌকা থেকে একটা লগি ঝপাস করে পড়ে গেল জলের ভেতরে।
এই মাঝির পো, চোখ থাকে কোন দিকে? নৌকা বাইতে শেখনি এখনও? বিপরীতমুখী নৌকা থেকে ধমক এল।
লজ্জিত সুধাকর জবাব দিল না।
বেলা তিন প্রহর। আরও দুটো বাঁক সামনে। রোদের রং হলদে হয়ে আসছে। সুধাকরের মন ফিরে এসেছে বাস্তবের সীমায়। চোখে পড়ল পাশে একটা মস্ত কচুরিদামের ভেতরে কুচো চিংড়ি লাফাচ্ছে।
