চব্বিশ বছরের সুধাকর ছ-বছর পেছনে ফিরে তাকাল। মুরাদপুরের সওয়ারি নামিয়ে ভাটার টানে নৌকাটা ভাসিয়ে দিয়ে আচ্ছন্ন চোখ মেলে তাকাল সুধাকর।
ছ-বছর আগেকার সুধাকর। আঠারো বছর বয়েস তখন। বুকের মধ্যে টগবগ করে ওঠে, সবসময়ে নিজেকে আশ্চর্য শক্তিমান মনে হয়। মনে হয়—ইচ্ছে করলে এখন সে লড়তে পারে ডোরাদার বাঘের সঙ্গে, তুফানের মুখে সাঁতার দিতে পারে কালাবদরের জলে, মানুষখেকো কুমিরের মুখ দু-হাতে ধরে ছিঁড়ে আলাদা করে দিতে পারে। সেই আঠারো বছর বয়েস, যখন মেয়েদের দিকে তাকালে মন একটা নতুন অর্থে গুঞ্জন করে ওঠে, তাদের চলার ছন্দে রক্তের ভেতর কী যেন ঝিনঝিন করে বাজতে থাকে।
সেই সময় বাইচ খেলা হচ্ছিল রায়মহলে।
বিজয়া দশমী–-প্রতিমা বিসর্জনের দিন। গাঁয়ের বাইচের নৌকায় সুধাকরও এসেছিল। নামকরা বাইচের দল তাদের। এর আগে অনেক বার তারা বাইচ জিতেছে, পাঁচ পাঁচ টাকা করে বকশিশ পেয়েছে প্রত্যেক দাঁড়ি, পেয়েছে একখানা করে কাপড়। বড়ো রায়কর্তা বলেছেন টাকা তো দেবেনই, তা ছাড়া একটা করে রুপোর মেডেলও দেওয়া হবে সকলকে।
তাই জোর পাল্লা হবে এবার।
হলও।
সে কী উত্তেজনা! দু-পাড় থেকে ঢাক বাজছে, নদীতে নৌকায় নৌকায় উঠছে ঢাকের আওয়াজ। ধূপধুনোর সঙ্গে যেন ঘন কুয়াশা জমেছে নদীর ওপরে। হুস হুস করে সাপের মতন আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে উড়নতুবড়ি। দাঁড়ের তালে তালে হালের মাঝি দমাদম পা ঠুকছে গলুইয়ের উপর।
দুখানা নৌকা পাশাপাশি চলেছে সমানে সমানে। বাকিগুলো হাল ছেড়ে দিয়েছে, পিছিয়ে পড়েছে তারা। সুধাকরদের নৌকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে রায়মহল বাজারের নৌকা।
হঠাৎ রায়মহলের নৌকা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে অনেকখানি সরে এল এদিকে। ধাক্কা লাগল সুধাকরদের নৌকার গলুইয়ে, সঙ্গে সঙ্গে ওদের নৌকা প্রায় তিন হাত পিছিয়ে সরে গেল।
এটা বেআইনি, মারাত্মক অপরাধ। এ অপরাধে বাইচের নৌকায় খুনোখুনি হয়ে যায়, এর আগে হয়ে গেছে অনেক বার।
মার শালাদের…
বিশাল বাবরি দুলিয়ে পা ঠুকল হালের মাঝি। গোঁয়ার ধরন, গায়ে অসুরের মতো শক্তি, তার ওপর মদ খেয়ে এসেছে লোকটা। বলেই ফস করে গলুইয়ের তলা থেকে একখানা রামদা বের করে ঘোরাতে লাগল মাথার ওপর, পৈশাচিক গলায় চিৎকার করে উঠল, মার শালাদের…
নদীর দু-ধার থেকে লোকে হইহই করে উঠল, কিন্তু অবস্থা তখন আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে। মার মার শব্দে দু-নৌকাতেই দাঁড়িয়ে উঠল আটচল্লিশ জন লোক। বেরুল রামদা, বেরোল সড়কি, বেরোল টেটা। তারপর সুধাকর একটা বল্লম ছুড়ে দিলে রায়মহলের নৌকায়। কারও গায়ে লাগল না, একটা লোকের কানের পাশ দিয়ে সোজা গিয়ে পড়ল নদীর জলে। সঙ্গে সঙ্গে একটা টেটা এসে সুধাকরের হাঁটুতে বিঁধল শতমুখী ফলায়। অসহ্য যন্ত্রণায় টলে উঠল সুধাকর। ঝপ করে পড়ে গেল নদীতে।
সেই অবস্থাতেই টেটাটাকে পা থেকে খুলে নৌকায় ওঠবার চেষ্টা করল সুধাকর, কিন্তু তাকে পেছনে ফেলে নৌকা অনেকখানি এগিয়ে গেছে তখন। আর তার ওপরে লক্ষও ছিল ও-নৌকার, মাথা তুলতে ঝপাং করে একটা বল্লম একেবারে সামনে এসে পড়ল।
নদীর ওপর তখন অন্ধকার নামছে, কালো হয়ে গেছে জল, আবছা আবছা দেখাচ্ছে সমস্ত। কয়েকটা ভেসে-যাওয়া কচুরিপানার সঙ্গে আত্মগোপন করে সাঁতরে চলল সুধাকর পাড়ে উঠতে পারলে হয়। কিন্তু শরীরে আর বইছে না। ডান পা-টা ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে, শতমুখী ক্ষতে নোনতা জল লেগে একটা দুর্বিষহ যন্ত্রণার চমক বইছে। সুধাকর বুঝতে পারছিল, আর বেশিক্ষণ এভাবে চলবে না। তার আঠারো বছরের লোহায়-গড়া শরীরেও এই মুহূর্তে ভাঙন ধরেছে, বড়ো বেশি দপ দপ করছে হৃৎপিন্ড। হয়তো…
হয়তো? মুহূর্তের মধ্যে সুধাকর অনুভব করতে পারল সে নিঃশেষিত হয়ে আসছে, মৃত্যু এসে ছায়ার মতো নামছে তার মাথার ওপরে। আর এক মিনিট কিংবা দু মিনিট কিংবা হয়তো আরও কম-তার মধ্যেই সে তলিয়ে যাবে জলের মধ্যে। যে-জলটা একসময় পাখির পাখার মতো তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত, সেই জলই এখন এক মন ওজনের একটা গুরুভার বোঝার মতো তাকে আকর্ষণ করছে নীচের দিকে।
শুধু তাই নয়, এ অঞ্চলের জলের সঙ্গে পরিচিত সুধাকর স্পষ্ট একটা অভ্যস্ত শব্দ শুনল পেছনে। ছলাৎ করে একটা আওয়াজ—আরও একটা তারপরে। মুখ ফিরিয়ে চকিতের জন্যে সুধাকর দেখতে পেল একটা প্রকান্ড রাঘববোয়ালের মতো বিরাট উজ্জ্বল মাছ ক্রমাগত জলের ওপর লাফিয়ে উঠছে।
কামট! রক্তের গন্ধ পেয়েছে।
একটা আর্তচিৎকার বেরিয়ে এল সুধাকরের গলা দিয়ে। কিন্তু কেউ শুনতে পেল না— শোনবার উপায়ও নেই। বাইরের নৌকায় তখনও মারামারি চলছে, দু-ধার থেকে সমান কোলাহল উঠছে আকাশ ফাটিয়ে। তার মধ্যে নদীর কালোজলে কোথায় মৃত্যুর মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে সুধাকর-কে তার খবর রাখে?
ছলাৎ করে শব্দটা আরও কাছে। কামটটা এবার অনেক কাছে এসে পড়েছে। পালাবার উপায় নেই। রক্তের গন্ধ অনিবার্যভাবে আকর্ষণ করে আনছে তাকে।
সুধাকর চোখ বুজল। সব অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। উড়নতুবড়ির ফুলঝুরিগুলো শেষ বারের জন্যে চোখের সামনে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল।
সেই তখন—
একটা কী তাকে আঁকড়ে ধরল, কিন্তু সে কামটের দাঁত নয়, মানুষের হাত। তারপর সুধাকর যখন চোখ মেলল তখন সে রায়মহলের ছোটোকর্তার বজরায়।
